আমির হোসেনের জ্বালানিবিহীন গাড়ি

তেল-গ্যাস ছাড়াই চলে, আধুনিক সুবিধাসহ এমন গাড়ি তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বগুড়ার যন্ত্রকেৌশলী আমির হোসেন। পরিবেশবান্ধব এই গাড়ির কয়েকটি মডেল এখন চলছে বগুড়া ও সিলেট শহরে।

রানি ভিক্টোরিয়া, রানি এলিজাবেথ, হিটলারের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তির নামে গাড়ি তৈরি করে অনেক আগে থেকেই আলোচনায় ছিলেন আমির হোসেন। আবার তিনি আলোচনায়। এবার উদ্ভাবন করেছেন জ্বালানিবিহীন গাড়ি। নাম দিয়েছেন Èরফ-রফ তাহিয়া’, অর্থ হলো Èসুন্দর ও দ্রুততম যান’। দেশে জ্বালানিসাশ্রয় ও বায়ুদূষণ রোধে যানটি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তঁার। মাত্র এক বছরের চষ্টোয় ২০১২ সালে পুরোপুরি সফল হন তিনি। পঁাচ আসনের ২৫০ কেজি ওজনের গাড়িটি চলতে তেল-মবিল লাগে না। প্রয়োজন নেই সিএনজিরও। পরিবেশবান্ধব গাড়িটি আরোহীদের নিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে।

২৫ টাকায় ৮ ঘণ্টা
গাড়িটির গতিশক্তির উত্স ৬০ ভোল্টের একটি ইলেকট্রিক টারবাইন মোটর। মোটরটি চলে একটি দেড় বাই দুই ইঞ্চির কার্বন দিয়ে। টানা আট ঘণ্টা চলার পর এই কার্বন ক্ষয় হয়ে যায়। তখন এটি পরিবর্তন করে নতুন আরেকটি লাগিয়ে নিলেই হলো। পরিবর্তন করতে সময়ও লাগে খুব কম, মাত্র দুই মিনিট। কার্বনটির দাম মাত্র ২৫ টাকা। ধঁোয়াবিহীন হওয়ায় গাড়িটিকে বলা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব।

গাড়ির অটোপুশে চাপ দিলেই ঘুরতে থাকে গিয়ার হুইল। গতি পায় এর সঙ্গে লাগানো চাকাগুলো। এরপর এক্সিলারেটর ও ব্রেক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় গতি। চালকের সামনে রয়েছে একটি মনিটর। এই মনিটরে গাড়ির গতি ও অন্যান্য বিষয় দেখা যায়।

গাড়ির বিভিন্ন ইলেকট্রনিক লাইনে বিদু্যত্ সরবরাহ করার জন্য আছে ডায়নামো নিয়নি্ত্রত একটি ব্যাটারি। হেডলাইট, ব্যাকলাইট ও ব্রেকলাইটও শক্তি পায় এ ব্যাটারি থেকেই। প্রচলিত মোটরযানের মতো রফ-রফ তাহিয়ায় জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফাংশন নেই বলে এটা ঝুঁকিমুক্ত। যানি্ত্রক কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

এই গাড়ির মডেল বানানো হয়েছে তিনটি। এগুলোর মধ্যে দুটি কার ও একটি বাস। এখন বগুড়া ও সিলেটে চলছে ছয়টি রফ-রফ তাহিয়া। প্রচলিত পঁাচ আসনের বিদেশি গাড়ির দাম যেখানে কমপক্ষে ১০ লাখ, সেখানে রফ-রফ তাহিয়া কিনতে খরচ হবে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা।

একজন আমির হোসেন
স্কুল-কলেজে পড়ালেখার ফঁাকে আমির হোসেন কারিগরি শিক্ষা নিয়েছেন তঁার বাবার ওয়ার্কশপে। বাবা ধলু মেকারকে এক নামেই চিনত বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের মানুষ। ১৯৮৮ সালের নভেম্বর মাসে ধলু মেকার মারা যাওয়ার পর রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের দায়িত্ব পড়ে আমিরের কঁাধে। এর পর থেকে হালকা ও মাঝারি ধরনের কৃষিজ যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করে আলোচনায় আসেন আমির হোসেন। পরে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ প্রকেৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রকেৌশল বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। গাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখতেন তখন থেকেই। সে সময় প্রথম তৈরি করেন ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার নামে একটি গাড়ি। সেটি বগুড়ার একাধিক কৃষিপ্রযুক্তি মেলায় উপস্থাপনের পর দেশ-বিদেশের অনেকে এর প্রশংসা করেন।

এই উদ্ভাবন দেখে ২০০৮ সালের শেষ দিকে ভারতের মোটর কম্পানি টিভিএসের প্রকেৌশলীরা তঁাকে গাড়ি তৈরির প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমির হোসেন দেশীয় প্রযুক্তিতে কম দামে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তঁার উদ্ভাবন পঁেৌছে দিতে ফিরিয়ে দেন সেই প্রস্তাব।

আরো কিছু গাড়ি
আমির হোসেন ১০০ বছর আগের রানি ভিক্টোরিয়ার এবং ১৯৩৭ সালের হিটলারের ব্যবহূত গাড়ির আদলেও গাড়ি বানান। ১৪০০ সিসির এই গাড়ি দুটির গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। এতে ব্যবহূত চেসিস, ফরহেন, এক্সেল, চাকার রিং, ড্যাশবোর্ড∏সব কিছুই আন্তর্জাতিক মানের। ৭০০ কেজি ওজনের প্রতিটি গাড়ির দাম প্রাথমিকভাবে তিন লাখ টাকা ধরা হয়। এর দাম আরো কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি। তঁার তৈরি অন্যান্য গাড়ির মধ্যে এ-সিক্স ৩৪, এলটি ৬২১৬, এলএম ৩০২১ উলে্লখযোগ্য।

ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা
বাংলাদেশের মফস্বল শহরেও যে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন গাড়ি তৈরি সম্ভব, সেটা প্রমাণ করতেই আমির হোসেনের এই চষ্টো। এখন কাজ করছেন চার সিলিন্ডারবিশষ্টি ৪৫০ সিসির সিএনজি মোটরসাইকেল নিয়ে। সরকারি সহযোগিতার অভাব জানিয়ে আমির বলেন, এই উদ্ভাবনের পরও ব্যাংক থেকে তঁাকে সহযোগিতা করা হয় না। সহযোগিতা পেলে দেশের সামনে বগুড়াকে তিনি নতুন করে উপস্থাপন করতে পারবেন।

*

*

Top