মোবাইলে লেনদেন

২০১১ সালের মার্চ মাসে দেশে প্রথমবারের মতো মোবাইল ব্যাংকিং শুরু করে ডাচ-বাংলা ব্যাংক। এরপর গত দুই বছরে এ সেবা চালু করেছে আরো ১৭টি ব্যাংক। প্রতিদিন গড় লেনদেন ৩৩ কোটি টাকা। দ্রুত জনপ্রিmobile_banking_1য়তা পাওয়া ডিজিটাল এই সেবা সম্পর্কে জানাচ্ছেন শেখ শাফায়াত হোসেন ও তানজিল আহমেদ জনি

ঢাকায় চাকরি করেন গিয়াস উদ্দিন। মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সবাই থাকেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী। প্রতি মাসেই বাড়িতে টাকা পাঠান তিনি। কিন্তু তিনি যে ব্যাংকে লেনদেন করেন, তার কোনো শাখা নেই গোদাগাড়ীতে। বৃদ্ধ বাবাকে তাই টাকা তুলতে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় রাজশাহী শহরে! এভাবেই চলেছে এত দিন। তিন বছর হলো বদলে গেছে এই চিত্র। তিনি এখন মোবাইলে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠান। রাজশাহী শহর নয়, বাড়ির পাশের গোদাগাড়ী বাজার থেকেই টাকা তোলেন। এই সেবা ব্যবহার করে গ্রাহকরা মোবাইল ফোনে টাকা লেনদেন করতে পারছেন।

 দেশে মোবাইল ব্যাংকিং
দুই মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংক ও সিটিসেলের সহায়তায় ২০১১ সালের মার্চ মাসে ডাচ&-বাংলা ব্যাংক দেশে প্রথম এই সেবা চালু করে। কিছুদিন পরই ‘বিকাশ’ নামে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে আসে বর্্যাক ব্যাংক। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের ৩০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ১৭টি ব্যাংক সেবাটি চালু করতে সক্ষম হয়েছে। আরো ছয়টি ব্যাংক এই সেবা চালু করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছে। যে ব্যাংকগুলো এই সেবা চালু করেছে সেগুলো হলো ট্রাস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সাউথ-ইস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক।

মোবাইল ব্যাংকিং নীতিমালা
মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অন্যতম অনুষঙ্গ মোবাইল ফোন। দেশে কার্যরত সব মোবাইল অপারেটর ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যেৌথভাবে এই সেবা দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সেবার ফি বা মাসুলের একটি অংশ পাচ্ছে মোবাইল অপারেটর। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানায়, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ১০০ টাকা লেনদেনে এক টাকা হারে চার্জ পাবে অপারেটর। তবে ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে কী হারে সেবা মাসুল আদায় করবে, এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক দাশগুপ্ত অসীম কুমার কালের কণ্ঠকে বলেন, Èকেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এখন আর আমানতের সুদহার বা সেবা ফি নির্ধারণ করে দেয় না। তাই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও আমরা কোনো সেবা ফি বা মাসুল আরোপ করছি না।’ তুলনামূলক খরচ যাচাই করে গ্রাহকই ঠিক করবেন তিনি কোন ব্যাংকের সেবা গ্রহণ করবেন। ফলে ব্যাংকগুলোও একটি প্রতিযোগিতামূলক সেবা ফি নির্ধারণ করতে বাধ্য হবে।

যেভাবে সেবা পাওয়া যাবে
বিকাশ : বিকাশ সেবা পেতে হলে গ্রাহকের প্রয়োজন পড়বে মোবাইল সংযোগ, দুই কপি ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অন্য যেকোনো ছবিসংবলিত গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র। নিবন্ধন করতে কোনো ফি লাগবে না। বিকাশ মনোনীত এজেন্টকে আপনার মোবাইল নম্বর দিলেই সে নিবন্ধন করে দেবে। এরপর মোবাইল ফোন থেকে *২৪৭# ডায়াল করে এর বিকাশের সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে। টাকা জমা করতে এজেন্ট পয়েন্টে গিয়ে ফোন নম্বর ও টাকা দিলে আপনার মোবাইলে একটি এসএমএস আসবে। এরপর এজেন্টের কাছে থাকা জমা বইয়ে স্বাক্ষর করলেই কাজ শেষ।

টাকা তুলতে প্রথমে এজেন্ট পয়েন্টে গিয়ে এজেন্টের অ্যাকাউন্ট নম্বর জেনে নিতে হবে। এরপর *২৪৭# ডায়াল করে ঈধংয ঙঁঃ নির্বাচন করতে হবে। এবার এজেন্টের নম্বর, টাকার পরিমাণ, পিন দিলে দুজনই ফিরতি এসএমএস পাবেন। এসএমএস ঠিক থাকলেই এজেন্ট আপনাকে টাকা দেবে। এজেন্ট ও যেকোনো শাখায় টাকা জমা এবং ওঠানোর পাশাপাশি রয়েছে নিজের মোবাইল দিয়েই মোবাইলে টাকা রিচার্জ করার সুবিধা।

ডিবিবিএল : এই ব্যাংক মনোনীত এজেন্ট ও ব্যাংকের শাখায় টাকা জমা দেওয়া ও ওঠানোর সুবিধা পাবেন মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহক। টাকা জমা দেওয়ার পর গ্রাহক এজেন্টের কাছ থেকে একটি জমা রসিদ পাবেন। নিরাপত্তা ও সঠিক লেনদেনের জন্য গ্রাহক এসএমএস প্রেরকের নম্বর ও টাকার পরিমাণ নিরীক্ষা করবেন। তবে টাকার পরিমাণ ঠিক না থাকলে বা এসএমএস অন্য নম্বর থেকে পাঠানো হলে তা সঠিক হিসেবে বিবেচ্য হবে না। গ্রাহকরা টাকা ওঠানোর জন্য এজেন্টকে চেক ডিজিটসহ তার মোবাইল অ্যাকাউন্ট নম্বর ও টাকার পরিমাণ জানাবেন। এরপর গ্রাহকরা ডিবিবিএল সিস্টেম থেকে একটি ইউএসএসডি ফ্ল্যাশ বার্তা বা আইভিআর পাবেন, যেখানে গ্রাহক জানতে পারবেন তিনি কত টাকা তুলেছেন।

ট্রাস্ট ব্যাংক : ট্রাস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা এবং পে পয়েন্টগুলো থেকে মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে টাকা তোলা যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করতে চাইলে মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখতে হবে ঞত্ঁংঃগগ, এরপর চধু লিখে স্পেস দিয়ে যে ব্যক্তিকে টাকা পাঠাতে চান, তার ফোন নম্বর, এরপর স্পেস দিয়ে অর্থের পরিমাণ, স্পেস দিয়ে পিন নম্বর লিখে পাঠাতে হবে ১৬২০১ নম্বরে। উদাহরণ : ঞত্ঁংঃগগ চধু ৮৮০১৬৭১৯৯৯৯৯৯ ১০০ ৮৮৮৮

আর ব্যাংকের ব্যালান্স দেখতে চাইলে ঞত্ঁংঃ গগ ইঅখ ১৬২০১ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে।

ঢাকা ব্যাংক : এই ব্যাংকের সেবা পেতে প্রথমে ব্যাংকে গিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এরপর তঁার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি গোপন পিন নম্বর সরবরাহ করা হবে। মেসেজ অপশনে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটি পেতে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক গ্রাহকরা ২৩২৫ নম্বরে মেসেজ পাঠালেই পাবেন ঢাকা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা।

এবি ব্যাংক : এবি ব্যাংকের এই সেবা পাওয়ার জন্য নিজের মোবাইল নম্বরটি এবি ব্যাংকের শাখা থেকে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর মেসেজ অপশনে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটির কিওয়ার্ড লিখে একটি স্পেস দিয়ে ৪ ডিজিটের গোপনীয় পিন নম্বরটি লেখার পর পাঠিয়ে দিতে হবে ১৬২০৭ নম্বরে।

প্রিমিয়ার ব্যাংক : প্রিমিয়ার ব্যাংকের এসএমএস ব্যাকিং সেবা পাওয়ার জন্য বিনা মূল্যের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শেষে গ্রাহকের ব্যক্তিগত গোপনীয় পিন নম্বর বা পাসওয়ার্ড পঁেৌছে যাবে গ্রাহকের মুঠোফোনে। এরপর কাঙ্ক্ষিত সেবাটি পেতে গ্রাহককে তঁার পিন নম্বর ব্যবহার করে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নির্ধারিত ০১৭১৪০৪৭৭৯৯ নম্বরে মেসেজ পাঠাতে হবে। তবে এর জন্য ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করতে হবে একটি আবেদনপত্র। এতে অ্যাকাউন্ট নাম, মোবাইল নম্বর ও ১৫ ডিজিটের অ্যাকাইন্ট নম্বর প্রদানের মাধ্যমে উপভোগ করতে পারবেন এই সেবা।

এনসিসি ব্যাংক : প্রথমে বিনা মূল্যের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শেষে গ্রাহককে তঁার মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে এনসিসি লিখে একটি স্পেস দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটির কিওয়ার্ড লিখে আবারও একটি স্পেস দিয়ে পিন নম্বরটি লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে যেকোনো মোবাইল অপারেটর থেকে ৬৯৬৯ নম্বরে।

ইসলামী ব্যাংক : প্রথমে বিনা মূল্যের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শেষে কাঙ্ক্ষিত সেবাটি পেতে হলে গ্রাহককে তঁার মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে আইবিবি লিখে একটি স্পেস দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটির কিওয়ার্ড লিখে আবারও একটি স্পেস দিয়ে পিন নম্বরটি লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে যেকোনো মোবাইল অপারেটর থেকে ৬৯৬৯ নম্বরে।

ব্যাংক এশিয়া : বিনা মূল্যের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শেষে কাঙ্ক্ষিত সেবাটি পেতে হলে গ্রাহককে তঁার মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে বিএ লিখে একটি স্পেস দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটির কিওয়ার্ড লিখে আবারও একটি স্পেস দিয়ে পিন নম্বরটি লিখে আবারও স্পেস দিয়ে অ্যাকাউন্টের শেষ চারটি নম্বর লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে রবি ছাড়া যেকোনো মোবাইল অপারেটর থেকে ৬৯৬৯ নম্বরে। আর রবির গ্রাহকরা সেবাটি পেতে মেসেজ করবেন ২৯২৯ নম্বরে।

ইউসিবি : আগ্রহী গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিন দিনের মধ্যেই সেবাটি উপভোগের সুযোগ পান আবেদনকারীরা। সেবাটি পেতে হলে গ্রাহককে তঁার মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে ঁ লেখার পর নিবন্ধন আইডি লিখে স্পেস দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবাটির কিওয়ার্ড লিখে আবারও একটি স্পেস দিয়ে টাকার কোড বা স্টেটমেন্ট ডেট লিখে গ্রামীণফোন গ্রাহকরা ২২৭৩ এবং রবি গ্রাহকদের ০১৮১৯২৩৯৯৬৬ নম্বরে পাঠাতে হবে। তবে এই সেবার জন্য নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা।

 আসছে আরো কিছু ব্যাংক
মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের বিষয়ে মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও পদক্ষেপ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানা গেছে, বেশির ভাগ মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এজেন্টের মাধ্যমে কোনো ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ করে দিচ্ছে। এ বিষয়টি নিরুত্সাহ করতে শিগগিরই একটি নির্দেশনা আসতে পারে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে। আরো ছয়টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করার বিষয়ে জোর তত্পরতা চালাচ্ছে বলেও জানা গেছে। ব্যাংকগুলো হলো শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ& ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড।

*

*

Top