Maintance

বেসিস নির্বাচন, অতীত ছাড়িয়েছে যে লড়াই

প্রকাশঃ ১২:১৩ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১২:১৩ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর ইতিহাসে ২০১৬ সাল অন্যতম আলোচনায় থাকবে সব সময়। আর তার কারণ সংগঠনটির ২০১৬-২০১৯ সেশনের নির্বাচন। এমন নির্বাচনী ডামাডোল সংগঠনটির নির্বাচনী ইতিহাসে আর দেখা যায়নি।

সংশোধিত গঠনতন্ত্রে প্রথম নির্বাচন, নতুন প্রার্থীর চমক, প্রার্থীর দুয়ারে-দুয়ারে আর ফেইসবুকে সরগরম প্রচারণা, উন্নয়নের বৈচিত্রময় প্রতিশ্রুতি, প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুমুল সমালোচনার লড়াই, এমনকি প্রার্থীদের কাফনের কাপড়ে মৃত্যু হুমকির মত ঘটনা এবারই প্রথম দেখেছে সংগঠনটির সদস্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা।

তফসিল ঘোষণা : ৫ এপ্রিল ঘোষিত তফসিলে ২৫ জুন ২০১৬-২০১৯ সেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়।

সংশোধিত গঠনতন্ত্র : কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ বাড়িয়ে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে এটি বেসিসের প্রথম নির্বাচন। নতুন সংশোধনীতে কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন প্রতি এক বছর পরপর করার কথা বলা হয়। তবে এতে কমিটির মেয়াদ থাকবে তিন বছর। প্রতি বছর নির্বাচিত কমিটি থেকে তিনজন ডিরেক্টর সমঝোতা বা লটারির মাধ্যমে পদত্যাগ করবেন। আর সাধারণ নির্বাচন হবে এই তিনটি পদেই। বিলুপ্ত করা হয় মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব ও ট্রেজারার পদগুলো। একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ বাড়ানো হয়।

প্রথম চমক : বেসিস নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেয় মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) সোনিয়া বশির কবির। এটি সংগঠনির নিবাচর্নী আলোচনায় ছিল বড় চমক। কারণ সদস্যরা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা ভাবনাতেই আনেননি যে সোনিয়া বশির কবির বেসিস নির্বাচন করবেন।

BASIS-TECHSHO HOR

চমকের পর চমক : সংগঠনটির তখনকার সভাপতি শামীম আহসান নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হচ্ছেন এমন গুঞ্জনই ছিল জোড়ালোভাবে। বেসিসের সদস্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা শামীম আহসান নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন এমনটা ধরেই আলোচনা করছিলেন। কিন্তু ২১ মে শামীম আহসান জানিয়ে দেন প্রার্থী হচ্ছেন না তিনি। যেখানে একই দিন বিকালে সোনিয়া বশির কবির নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে বসেন।

এবার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার : বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এর চারবারের সভাপতি এবার বেসিস নির্বাচন করবেন ! যিনি বিসিএস নেতা হিসেবেই বেশি সাংগঠনিকভাবে সুপরিচিত। যদিও বেসিসের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ও পরিচালক ছিলেন তিনি। বেসিসকে নতুনভাবে গড়বেন বলে ২৫ জুন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে বসেন কম্পিউটারে বাংলা লেখার সফটওয়্যারের উদ্ভাবক মোস্তফা জব্বার।

সোনিয়া বশিরকে হুমকি : নির্বাচন হতে সরে দাঁড়াতে ২৯ মে সন্ধ্যায় হুমকি পান সোনিয়া বশির কবির। অজ্ঞাত এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে এ হুমকি দেয়।

প্যানেল ডিজিটাল ব্রিগেড : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারের নেতৃত্বে ঘোষিত হয় ডিজিটাল বিগ্রেড প্যানেল। যেখানে সাধারণ সদস্য ক্যাটাগরিতে ছিলেন, প্যানেল প্রধান মোস্তাফা জব্বার (আনন্দ কম্পিউটার্স), ফারহানা এ. রহমান (ইউ ওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড), রাসেল টি আহমেদ (টিম ক্রিয়েটিভ), এম রাশিদুল হাসান (সিস্টেক ডিজিটাল লিমিটেড), মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল (অ্যাডভান্স ই আর পি (বিডি) লিমিটেড), এ কে এম আহমেদুল ইসলাম (এটম এপি লিমিটেড), রিয়াদ এস এ হুসেইন (ম্যাগনিটো ডিজিটাল), দেলোয়ার হোসেন ফারুক (র্যা ডিসন ডিজিটাল টেকনলজিস লিমিটেড)। আর সহযোগী সদস্য ক্যাটাগরিতে উত্তম কুমার পাল (বেস্ট বিজনেস বন্ড লিমিটেড)।

প্যানেল চেইঞ্জ মেকার্স : মাইক্রোসফট এমডি এবং জাতিসংঘের টেকনোলজি ব্যাংকের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সোনিয়া বশির কবিরের নেতৃত্বে প্যানেল চেইঞ্জ মেকার্সে যোগ দেন মোস্তফা রফিকুল ইসলাম (ফ্লোরা টেলিকম লিমিটেড), সৈয়দ আলমাস কবির (মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেড), সুফি ফারুক ইবনে আবু বকর (ইভাটিক্স), আজমল হক আজিম (ডিজিকন গ্লোবাল সার্ভিস লিমিটেড), নাজমুল করিম চৌধুরী (গননা টেকনোলজিস লিমিটেড), সাব্বির রহমান তানিম (থার্ডবেল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড) ও সাইদুল ইসলাম মজুমদার (মজুমদার আইটি লিমিটেড) ও জামান খান (জামান আইটি)।

স্বতন্ত্র চার প্রার্থী : দুই প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েন চার প্রার্থী। এরা হলেন, খন্দকার আবদুল হাফিজ ( আই সফটওয়্যার লিমিটেড), আবদুল মতিন ভুঁইয়া (এবিসিও ওভারসিজ কর্পোরেশন লিমিটেড), রাশাদ কবির (ড্রিম৭১ বাংলাদেশ লিমিটেড), এনামুল হক (এসটিএম ভিশন ইনফোটিকস লিমিটেড)।

দুই প্যানেলের ভার্চুয়াল যুদ্ধ : প্যানেল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা, নিজেদের তুলে ধরা, নানা প্রতিশ্রুতি, পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা তু্ঙ্গে উঠে আসে। যার অধিকাংশই চলে ফেইসবুকে। মোস্তাফা জব্বারের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের ‘ডিজিটাল ব্রিগেড’ এবং সোনিয়া বশির কবিরের নেতৃত্বাধীন ‘দ্য চেইঞ্জ মেকার’ এর ফেইসবুক পেইজে শোভা পায় নিজ নিজ প্রার্থীদের পরিচিতি ও প্যানেলের পরিচিতি।

পেইজে দেয়া হতে থাকে প্রত্যেক সমর্থকদের কৌশলগত স্ট্যাটাসের শেয়ার, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রার্থীদের ইন্টারভিউ, বেসিস নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের লিংক শেয়ার।

পেইগুলোতে চাওয়া হয় ভোটারদের সহযোগিতা ও সমর্থন। প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নিজ নিজ ফেইসবুক আইডিতে চালাচ্ছেন প্রচারণা। দিচ্ছেন নির্বাচনে জিতলে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।

এর পাশাপাশি বেসিস ইলেকশন-২০১৬, আপনার বেসিস টিম, কেমন বেসিস চাইসহ অসংখ্য ফেইসবুক পেইজ খোলা হয় ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে ভোটার, সদস্য ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা নানা বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নিতে থাকেন।

প্রার্থীদের বাসায় কাফনের কাপড় : নির্বাচনের দুই দিন আগে ২৩ জুন কাফনের কাপড় পাঠিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকেও মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়। একদিন পর ২৪ জুন এ কাফনের কাপড়ে এ হুমকি পান সোনিয়া বশির কবিরও। নির্বাচনকে সামনে রেখে দুটি প্যানেল প্রধানকে এমন হুমকির ঘটনায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতা নিয়ে বিস্মিত হন সবাই।

ভোট ছাপিয়ে হুমকি-ধামকিই যখন আলোচনায় : নির্বাচনের আগের দিন হতে সংগঠনটির এই নির্বাচনে ভোট উৎসবের পরিবর্তে প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি ও ভোটারদের নিরাপত্তাই আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভোটকেন্দ্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নির্বাচন বোর্ড। নির্বাচন কেন্রের বেসিসের ক্যামেরার পাশাপাশ ২০টি বাড়তি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। ভোটকেন্দ্র কাওরানবাজারস্থ বিডিবিএল ভবনের পঞ্চম তলায় বেসিস কার্যালয় হতে শুরু করে ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত এসব ক্যামেরা লাগানো হয়। পুরো পরিস্থিতি কয়েকটি মনিটরে মনিটরিং করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। একটি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে প্রায় ১০ জন নিরাপত্তা কর্মীও নিয়োজিত করা হয়।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেলেন মোস্তাফা জব্বার : ২৫ জুন নির্বাচন শেষে ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পান মোস্তাফা জব্বার। নির্বাচন হওয়া কার্যনির্বাহী ৯টি পদের মধ্যে ৭টিতেই জেতে ডিজিটাল ব্রিগেড। অন্যদিকে দ্যা চেইঞ্জ মেকার্সের প্যানেল প্রধান সোনিয়া বশির কবির এক সদস্যসহ জয়লাভ করেন।

নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৫১৬টি। যার মধ্যে সাধারণ ভোটার ৩৬৮ এবং অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরিতে ভোটার ১৪৮ জন।
ভোট পড়ে ৪১২টি। এর মধ্যে সাধারণ ক্যাটাগরিতে ৩০৫ ভোট এবং অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরিতে ১০৭টি ভোট।

 বলার অপেক্ষার রাখে না, স্বাভাবিকভাবেই বিজয়ী প্যানেল প্রধান হিসেবে পদবন্টনের নির্বাচনে সভাপতি হন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার।

*

*

Related posts/