তথ্যপ্রযুক্তির উপত্যকায়

মুহম্মদ খান

অতিথি লেখক, টেক শহর

‘আর আধমাইল যাওয়ার পর ডানে মোড় নিয়ে ৩ নম্বর লেন ধরে আরো আধমাইল গেলেই ১৬০০ মাউন্টেন ভিউ, গুগলের প্রধান কার্যালয়।’ না, স্থানীয় কোনো পথচারী নয়, আমাদের পথ চিনিয়ে দিচ্ছিল আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টসের (এএবিইএ) সিলিকন ভ্যালি শাখার সভাপতি সাখাওয়াত হোসেনের গাড়ির জিপিএসের যান্ত্রিক অথচ মধুর নারী কণ্ঠ।

Silicon-Valley-640

ভাবছিলাম, যেই ‘গুগল ম্যাপ’-এর নির্দেশনা নিয়ে বিশ্বের প্রায় কয়েক শ কোটি মানুষকে পথ চেনাচ্ছে জিপিএস, সেই ম্যাপের জন্মস্থান ‘গুগল হেডকোয়ার্টার’-এ পৌঁছে যাব কয়েক মিনিটেই! শুধু ‘গুগল’ই নয়, আমরা আরো যাব প্রযুক্তির উপত্যকার বড় সব অংশীদার ‘ইন্টেল’, ‘ফেইসবুক’, ‘টেকগুরু’ স্টিভ জবসের গড়া প্রযুক্তির পাঠশালা ‘অ্যাপল’ হেডকোয়ার্টারেও!

গুগলে
গুগল শব্দের যথার্থতা রাখতেই যেন আঁকাবাঁকা পথে গুগলি বলের মতো অনেক ‘ঘূর্ণন’ খেতে খেতে পৌঁছলাম গুগল কমপ্লেক্সের (গুগলপ্লেক্স) ৪৩ নম্বর ভবনে। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান্তাক্লারা এলাকার মাউন্টেন ভিউ শহরে পাহাড়ের কোলে ১৯৯৮ সালে তৈরি হয় গুগল সদর দপ্তর, ‘গুগলপ্লেক্স’। এখানে কাজ করেন প্রায় ১০ হাজার কর্মী।

২৬ একরের এই কমপ্লেক্সে রয়েছে ২২টি অফিস ভবন। আর পাঁচ একর জায়গাজুড়ে আছে পার্ক, গাড়ি রাখার জায়গা, খেলার মাঠ, সুইমিং পুল, ব্যায়ামাগার ইত্যাদি। এখানে ৯টা-৫টা অফিসের কোনো বালাই নেই। অফিস সময়েই কেউ খেলছেন, কেউ ল্যাপটপ নিয়ে পার্কে বসে কাজ করছেন, কেউ বা গুগল সাইকেল নিয়ে ঘুরছেন ইতিউতি।

সাখাওয়াত ভাই জানালেন, ‘গুগলকর্মীদের যেমন নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই, তেমনি নেই কোনো নির্দিষ্ট কাজের টেবিলও। যে কেউ যেকোনো সময় অফিসে আসতে পারেন, যে কেউ তাঁর পছন্দমতো জায়গায় বসে কাজ করতে পারেন। একেকটি প্রকল্প নিয়ে একেকটি দল কাজ করে। প্রকল্প শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা বাঁধা আছে। কর্মীরা কখনোই এই সময়সীমা অতিক্রম করেন না।

গুগল বিশ্বাস করে, ভালো কাজের জন্য স্বাধীনতাটাই খুব জরুরি। তাই তো তাদের অফিসে এমনটাই নিয়ম। কাজে লেগেছে গুগলের এ পন্থা। গুগল এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।

ইন্টেল মিউজিয়ামে
সান্তাক্লারার ৩৬০০ জুলিয়েট লেনে ইন্টেলের হেডকোয়ার্টার। এখানে কাজ করেন প্রায় ১০ হাজার কর্মী। এর মধ্যে বাংলাদেশি প্রকৌশলী আছেন দুই শতাধিক। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কার্যালয় মিলে ইন্টেলের কর্মীর সংখ্যা এক লাখের বেশি। ‘ইন্টেল মিউজিয়াম’-এর সংগ্রহশালা ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে এসব তথ্য জানালেন বাংলাদেশি এস এম আলিমুল হক।

প্ল্যাটফর্ম আর্কিটেক্ট হিসেবে তিনি ইন্টেলে কাজ করছেন এক যুগেরও বেশি সময়। ইন্টেল মিউজিয়ামে তিনি দেখালেন ইন্টেল প্রসেসর ব্যবহৃত আইবিএমের তৈরি বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার। মজার বিষয়, এই কম্পিউটারে কোনো মনিটর ছিল না। বাক্সর মতো একটি যন্ত্রের শরীরে কয়েকটা মাত্র বাটন বসানো, ব্যস।

এসব বাটন টিপেই নাকি করা হতো গণনার কাজ। প্রথম মনিটরসহ কম্পিউটারটিও আছে এই জাদুঘরে। দেখলাম সিলিকা বালি (সিলিকন) থেকে চিপ তৈরির পদ্ধতি। বালি থেকে তৈরি এই চিপে ভর করেই কি না নিজেদের ক্যারিশমা দেখিয়ে চলেছে আজব আর আধুনিক সব যন্ত্র!

আলিমুল হক আরো জানালেন, ইন্টেল এখন বিশ্বের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির প্রতিষ্ঠান। তাঁদের তৈরি ‘এক্স৮৬’ সিরিজের মাইক্রোপ্রসেসরটিই বিশ্বের বেশির ভাগ পারসোনাল বা ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ব্যবহার করা হয়। শুধু প্রসেসর নয়, এখানে তৈরি হয় মাদারবোর্ড চিপসেট, নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কনট্রোলার, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, ফ্ল্যাশ মেমোরি, গ্রাফিকস কার্ডও।

এখন মোবাইল প্রযুক্তির দিকেও নজর দিয়েছে ইন্টেল। মোবাইলের জন্য চমকপ্রদ কিছু সরঞ্জাম উপহার দিতে ইন্টেল এরই মধ্যে বেশ কিছু গবেষণা শুরু করেছে বলেও জানালেন আলিমুল হক।

ফেইসবুকে
১৬০১ উইলো আরডি, ম্যানলো পার্ক ফেইসবুকের নতুন হেডকোয়ার্টার। সামাজিক যোগাযোগের বিশ্বসেরা সাইট হলেও তাদের প্রধান কার্যালয়ে অতিথি প্রবেশে যথেষ্ট ‘অসামাজিক’ ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অজুহাতে ফেইসবুকের প্রধান কার্যালয়ে ঢোকা এক রকম অসাধ্যই। এমন ধারণা আগের দিনই পেয়েছিলাম সাখাওয়াত হোসেনের কাছে।

একমাত্র উপায়, ফেইসবুকে পরিচিত কোনো কর্মী থাকলে। তাও অভ্যর্থনাকক্ষ থেকে সশরীরে এসে নিজের অতিথিটিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে সেই কর্মীকে। আমাদের অবশ্য এত জটিলতায় পড়তে হয়নি। আমরা পৌঁছার আগেই অভ্যর্থনাকক্ষে অপেক্ষা করছিলেন ফেইসবুককর্মী মেহেদি বখত।

তিনি ফেইসবুকে কর্মরত একমাত্র বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে পিএইচডি করেছেন এই যুক্তরাষ্ট্র থেকেই। এর পরই যোগ দিয়েছেন ফেইসবুকে। তিনি জানালেন, ফেইসবুকে আরো তিনজন বাংলাদেশি কর্মী আছেন।

তবে তাঁরা কাজ করেন মানবসম্পদ ও অন্যান্য দাপ্তরিক বিভাগে। অভ্যর্থনাকক্ষের নিরাপত্তা তল্লাশি পেরোলেই চোখের সামনে চলে এলো পুরো ক্যাম্পাস। মনোরম পরিবেশ দেখে মনে হলো, যেন কোনো অবকাশযাপন কেন্দ্রে বেড়াতে এসেছি। মেহেদি জানালেন, আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা সিসকোর কাছ থেকে জমি কিনে এ কার্যালয় বানানো হয়েছে।

পুরো কাজ শেষ হতে ২০১৫ সাল লেগে যাবে। কর্মীদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই নদীর এই মনোরম এলাকা বেছে নেওয়া। জানালেন, এখানে চাকরি করেন প্রায় ৯০০ কর্মী। তাঁদের অনেকে ফেইসবুককে পৃথিবীর ৭০টি ভাষায় রূপান্তরের কাজ করে থাকেন। গুগলের মতো এখানেও নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই।

কর্মীরা কাজ করতে করতে যাতে বিরক্ত না হন সে জন্য রয়েছে ভিডিও গেইম রুম, দাবা খেলার ঘর, টেনিস খেলার কোর্ট প্রভৃতি। রয়েছে ১৫টি রেস্টুরেন্ট, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা। সবই ফ্রি। সভাকক্ষ ছাড়া উচ্চপদস্থ কারো জন্য বিশেষ রুম নেই। এমনকি প্রধান ব্যক্তি মার্ক জাকারবার্গেরও না।

তিনি সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে বসেই কাজ করেন। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, বাংলাদেশে কি কখনো এমন পরিবেশে অফিস করতে পেরেছে কেউ?

অ্যাপল কার্যালয়ে
বিশ্বের অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের চেয়ে অনেকটাই আলাদা অ্যাপলের সব পণ্য। কার্যালয় ও কর্মপরিবেশের ক্ষেত্রেও স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে তারা। অ্যাপল অফিস চলে ঘড়ি ধরে। বিশেষ করে বিকেল ৫টার পর এখানে অতিথিদের প্রবেশ একেবারে নিষেধ।

সিলিকন ভ্যালির একদম মাঝখানে ১-৬ ইনফিনিট লুপ, কুপারটিনো, ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাপলের সদর দপ্তরে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন ৫টা বেজে ৫ মিনিট। তাই আর ভেতরে যাওয়া হলো না। অভ্যর্থনাকক্ষ থেকে জানাল, চাইলে তাদের প্রধান অ্যাপল স্টোরটা ঘুরে দেখতে পারি। এ সুযোগটুকুও হারানো ঠিক হবে না ভেবে সোজা ঢুকে পড়লাম সেখানে।

ওখানেই দেখা হলো বাংলাদেশি প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর দেওয়ানের সঙ্গে। তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে এইচপি, এরিকসন, সিসকোসহ সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। জানালেন, অ্যাপলের কোনো পণ্য উদ্ভাবনের পর প্রথম এই স্টোরেই প্রদর্শন করা হয়। আমরা অ্যাপলের সর্বশেষ উদ্ভাবন ‘আইপ্যাড মিনি’ দেখলাম। বাংলাদেশে তখনো ওটা এসে পৌঁছেনি।

দীর্ঘদিন সিলিকন ভ্যালিতে থাকায় এখানকার অনেক তথ্যই জাহাঙ্গীর দেওয়ানের জানা। জানালেন, অ্যাপলের এই প্রধান কার্যালয়ে মোট ছয়টি ভবন রয়েছে। এখানে ১৩ হাজার কর্মী কাজ করেন। আর সারা বিশ্বে অ্যাপলের রয়েছেন ৮০ হাজার কর্মী। পরের দিন আমাকে নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিলেন জাহাঙ্গীর দেওয়ান।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে পরের দিন আমার সঙ্গী হলেন প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর দেওয়ান। সান হোজে শহর থেকে আমাদের যেতে হবে ৩২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের শহর পালো আল্টোতে। এখানেই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

পথে যেতে যেতে জাহাঙ্গীর দেওয়ান জানালেন, গত শতকের আশির দশকে বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন রাজশাহী প্রকৌশল কলেজ) কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। এরপর কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন চাকরি শেষে ১৭ বছর আগেই থিতু হয়েছেন সিলিকন ভ্যালিতে।

এখন এখানেই তিনি একটি সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানের মালিক। পাশাপাশি বিনিয়োগ করছেন তরুণদের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগেও। জানালেন, এখানে বিশ্বখ্যাত অনেক প্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় থাকলেও সিলিকন ভ্যালি আসলে তরুণ উদ্ভাবকদের স্বর্গভূমি। এখানে কয়েক শ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কাজই হচ্ছে তরুণদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া।

এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই বলা হয় ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট’ বা ‘ভিসি’। ভিসিরা মূলত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের কাছ থেকেই বিভিন্ন প্রকল্প পেয়ে থাকেন। আর এ কারণে মূলত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই গড়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালি। কথা বলতে বলতে আমরা পৌঁছে গেলাম স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

স্মার্টফোনে উইকিপিডিয়া সার্চ করে ততক্ষণে জেনে গেছি ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর লিল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড ও তাঁর স্ত্রী জেন স্ট্যানফোর্ড ১৮৯১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান ১৬ বছর বয়সে টাইফয়েডে অকালমৃত লিল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড জুনিয়রের নামে এই বিদ্যাপীঠের নামকরণ।

বিশ্ববিদ্যালয়টি লিল্যান্ডের ঘোড়ার খামারের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই আজও স্থানীয়রা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যরা একে ‘দ্য ফার্ম’ নামে ডাকেন। জাহাঙ্গীর দেওয়ান জানালেন, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে অনেক নোবেল ও পুলিৎজার বিজয়ী আছেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থীর তালিকায় আছেন ফ্রেডরিক টারম্যান (যিনি প্রথম সিলিকন ভ্যালির ধারণা দেন), হিউলেট প্যাকার্ড বা এইচপির দুই প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম হিউলেট ও ডেভিড প্যাকার্ড, আধুনিক ইন্টারনেটের অন্যতম জনক ভিন্টন সার্ফ, গুগলের দুই সহপ্রতিষ্ঠাতা সার্জি ব্রিন ও ল্যারি পেইজসহ অনেকে। আর যেখানে এসব অদম্য মেধাবীর উত্থান সেখানে সিলিকন ভ্যালির মতো একটি সার্থক প্রযুক্তি উপত্যকা প্রতিষ্ঠা হবে সেটাই স্বাভাবিক।

টি মতামত

*

*

Top