নামমাত্র মূল্যে স্পেকট্রাম লাইসেন্স পাচ্ছে ওলো

অনন্য ইসলাম, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : বর্তমান মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে নামমাত্র মূল্যে একটি কোম্পানিকে স্পেকট্রাম লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। জানা গেছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সোমবার এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে। এতে কোম্পানিটির ওয়াইম্যাক্স ও এলটিই লাইসেন্স পাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ান কোম্পানি মাল্টিনেটের মালিকানাধীন বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ লিমিটেডকে (ব্র্যান্ড নেম ওলো) এ লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। ২৫১০-৩০ আপলিংক এবং ২৬৩০-৫০ ডাউন লিংকের ২০ মেগাহার্ডজসহ ওয়াইম্যাক্স এবং এলটিইর এ লাইসেন্সের জন্য কোম্পানিটি সরকারকে দেবে মাত্র ২৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ মেগাহার্ডজের স্পেকট্রামের বাজার মূল্য বর্তমানে নূন্যতম ৩ হাজার ৪২৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বলে টেলিকম বিশেষজ্ঞদের দাবি।

ollo_bd_wimax_Tech Shohor

তাদের মতে, থ্রিজির ২১০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রামের চেয়ে ২৬০০ ব্যান্ডের এ স্পেকট্রাম অনেক বেশী শক্তিশালী। এ কারণে এর দামও অনেক বেশি হওয়া উচিত। তারা জানান, এ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম দিয়ে উচ্চগতির এলটিই সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ওলো পাবে মোবাইল অপারেটরদের মতো ভয়েস সার্ভিস দেওয়ার সুযোগও।
বিশেষজ্ঞরা জানান, গত সেপ্টেম্বরে থ্রিজির স্পেকট্রামের নিলামে একই ক্যাটাগরির প্রতি মেগাহার্ডজ স্পেকট্রাম দুই কোটি ১০ লাখ ডলারের কিনেছে মোবাইল অপারেটররা। সে হিসাব ২০ মেগাহার্ডজ স্পেকট্রামের বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৪২ কোটি ডলার। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ৩ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার বেশি।

জানা গেছে, বেশ কিছু দিনে থেকেই কোম্পানিটিকে নামমাত্র মূল্যে এ লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে চেষ্টা চলছিল। তবে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তার আপত্তির কারণে তা এতদিন আটকে ছিল। তবে শেষ দিকে সরকারের প্রভাবশালী মহলের চাপে তাদের চেষ্টা কাজে আসেনি। গত সোমবার ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এ বিষয়ক ফাইলে স্বাক্ষর করেন।

জানা গেছে, চলতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ (বিআইইএল) ওয়াইম্যাক্সের জন্য আবেদন করে। তবে তার আগেই বিটিআরসির অনুমোদন নিয়ে তারা এলটিই যন্ত্রাংশ আমদানি করে সেবা দিতে শুরু করে। বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউলিয়া আকসুটিনা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

এর চেয়েও বড় তথ্য হল এ কোম্পানিটি ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ওয়াইম্যাক্সের নিলামে অংশ নেয়। নিলামে ১৬০ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করে পঞ্চম অবস্থানে ছিল তারা। তখন ২১৫ কোটি টাকায় লাইসেন্স পায় বাংলালায়ন। ব্র্যাক বিডি মেইল দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও পরে তারা লাইসেন্স নিতে অপরাগতা প্রকাশ করে। তৃতীয় স্থানে থাকা কিউবি (অজের বাংলাদেশ লিঃ) পায় আরেকটি লাইসেন্স।

এ কোম্পানিগুলোকে দেওয়া হয় আনপেয়ার্ড ৩৫ মেগাহার্ডজের টিডিডি স্পেকট্রাম। যেটি গোটা বিশ্বে খুবই অপ্রচলিত এবং এর সঙ্গে ভয়েসের সেবা নেই। ফলে এ স্পেকট্রামের মূল্য ২৬০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রামের মূল্যের এক শতাংশও নয় বলে টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মত।

ওই নিলামের পর ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ জামানতের টাকাও তুলে নেয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটির বাংলাদেশি মালিকানা চলে যায় রাশিয়ান কোম্পানি মাল্টিনেটের হাতে। তারাই এখন এ সেবা পরিচালনা করছেন।

এর আগে বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ নামে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর সময় মাল্টিনেট নিউ জেনারেশন গ্রাফিক্স লিমিটেড নামের অপর একটি কোম্পানিও কিনে নেয়। পরে কোম্পানি দুটি জয়েন্ট ভেঞ্চারে ওলো ব্র্যান্ডের আওতায় ওয়াইম্যাক্স সেবা দেওয়া শুরু করে।

ব্যারিস্টার তানজিম উল আলম বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জের লাইসেন্স পাওয়া বিষয়ে বলেন, এটি আইনের সম্পূর্ণ খেলাপ। জামানাতের টাকা তুলে নেওয়ায় এ কোম্পানি কোনো অবস্থায় আর লাইসেন্সের জন্যে বিবেচিত হতে পার না। এটিকে লাইসেন্স দিতে হলে নতুন করে নিলাম করতে হবে।

একই কথা বলেছেন, মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ খান। তিনি বলেন ২০০৮ সালের ওই নিলামের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই নিলাম তাদের জন্যে মৃত। তবে সরকারের শেষ সময়ে এসে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

জানা গেছে, প্রথম দিকে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি ২১৫ কোটি টাকায় বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জকে লাইসেন্স এবং ২০ মেগাহার্ডজ স্পেকট্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে তারা এর মূল্য আরও ৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে। এখানে যুক্তি দেখানো হয়েছে, যেহেতু ২০ মেগাহার্ডজ আপলিংকে এবং আরও ২০ মেগাহর্ডজ ডাউন লিংকের জন্যে দেওয়া হয়েছে সে কারণে এটি আসলে ৪০ মেগাহার্ডজ। আর ওই হিসেব করেই ৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পেকট্রামের এমন মূল্য নির্ধারণ মস্তবড় ভুল। এটি এক ধরনের অনিয়মও বলে তারা মনে করেন। এর কারণ থ্রিজির নিলামে বা টুজির লাইসেন্স নবায়নেও এমন হিসাব করা হয়নি। পৃথিবীর কোথাও এমন হিসাব করা হয় না বলে দাবি করেন আবু সাইদ খান।

Related posts

*

*

Top