দেশে ফ্রিল্যান্সারদের পথ দেখাচ্ছে ইল্যান্স

শীর্ষস্থানীয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। দেশে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের বর্তমান অবস্থা, ফ্রিল্যান্সারদের মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন ইল্যান্সের কান্ট্রি ম্যানেজার সাইদুর মামুন খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তুহিন মাহমুদ

ইল্যান্স (www.elance.com) হচ্ছে একটি জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস। এখান থেকে ফ্রিল্যান্সারা কাজ পেয়ে থাকেন এবং গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস সবচেয়ে পুরনো এবং অগ্রণী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ১৭০টি দেশে ৮ লাখ গ্রাহক এবং ৩১ লাখ ফ্রিল্যান্সার এ মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে।

Saidur Mamun Khan_elance-TechShohor

বর্তমানে এ মার্কেটপ্লেসের বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন সাইদুর মামুন খান। এ দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি একটি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে এবং ফ্রিল্যান্স প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ এবং বিপণন বিভাগ থেকে।

টেক শহর : ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ইল্যান্স সম্পর্কে একটু বলুন।

মামুন : ইল্যান্স হলো বিশ্বের প্রথম সারির একটি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস, যা অন্যান্য মার্কেটপ্লেসগুলোর অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। ইল্যান্সের প্রধান কার্যালয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে এবং দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় নরওয়েতে অবস্থিত।

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার, ওয়েব এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কপিরাইটার, মার্কেট রির্সাচার, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটার এবং বিভিন্ন ব্যবসার পেশাজীবীরা রয়েছেন ইল্যান্সে। প্রতি বছর ১৩ লাখেরও বেশি কাজ ইল্যান্সে পোস্ট হয়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইল্যান্সের ফ্রিল্যান্সাররা মোট আয় করেছে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

টেক শহর : ইল্যান্সে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কি?

মামুন : ইল্যান্সে সাধারণত দু’ভাবে র্যাংতকিং করা হয়। আয়ের ওপর ভিত্তি করে এবং কতজন ফ্রিল্যান্সার কাজ করছে সেটির ভিত্তিতে। বর্তমানে সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ১৭০টি দেশের মধ্যে ৭ নম্বরে আছে। আর আয়ের দিক দিয়ে আছে ১৩ নম্বরে। গত বছর দারুণ কাজ করার মাধ্যমে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা আয়ের দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে এক ধাপ সামনে চলে আসে।

বিভিন্ন কাজের জন্য বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের প্রতি আগ্রহ রয়েছে গ্রাহকদের। প্রতি মাসে হাজারের বেশি দেশি ফ্রিল্যান্সার ইল্যান্সে যুক্ত হচ্ছে এবং তারা অন্য চাকরির চেয়ে এ কাজে বেশি আয় করছে। আইটি, প্রোগ্রামিং, ডিজাইনসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরি যেমন পিএইচপি, এইচটিএমএল প্রোগ্রামিং ও ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে।

দেশি ফ্রিল্যান্সারদের বেশিরভাগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং সিঙ্গাপুরের গ্রাহকদের কাছ থেকে কাজ পাচ্ছে।

elance-logo-TechShohor

টেক শহর : ইল্যান্স থেকে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের আয় কেমন?

মামুন : ২০১৩ সালে দেশি ফ্রিল্যান্সাররা প্রায় ৩৪ লাখ ডলারেরও বেশি আয় করেছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত ইল্যান্সে বাংলাদেশিদের মোট আয়ের পরিমান ৭৬ লাখ ডলার। বর্তমানে দেশি ফ্রিল্যান্সারদের ঘণ্টা প্রতি গড় আয় ৭ ডলার। আশা করছি সামনে এটি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করছে আইটি এবং প্রোগ্রামিং ক্যাটাগরির ফ্রিল্যান্সাররা। তার পরে রয়েছে ব্যবসা এবং ফাইন্যান্স, গ্রাফিক ডিজাইন, রাইটিং এবং সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং।

টেক শহর : দেশে অফিসিয়ালি ইল্যান্সের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য কতোটা সফল হয়েছে?

মামুন : একজন পূর্ণকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার নিয়োগের মাধ্যমে ইল্যান্স ২০১২ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। মূল উদ্দেশ্য দেশের ফ্রিল্যান্সারদের উন্নয়ন।

গত চার বছরে দেশে এ খাতে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। দেশের ফ্রিল্যান্সাররা দারুণভাবে উঠে আসছে। আরও কিছু সহায়তা পেলে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে অন্যতম একটি দেশ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অগ্রগতির এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ইল্যান্সের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বছর এর ফলাফলও পাওয়া গেছে।

গত বছর দেশে ফ্রিল্যান্সারদের উন্নয়য়ের জন্য কোনো ধরণের ফি ছাড়াই নিয়মিতভাবে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে নতুন এবং অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সাররা ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইল্যান্সের পক্ষ থেকে দেশে আয়োজন করা হয়েছে ৯৬টি ওয়ার্কশপ, যার মাঝে ৫৩টি ছিল ঢাকার বাইরে। যেসব এলাকায় নিয়মিতভাবে যাওয়া সম্ভব হয়নি অথবা যারা কর্মশালায় আসতে পারেননি তাদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে ১৩টি ওয়েবিনার (অনলাইন কর্মশালা)। ফলে আগ্রহীরা বাসায় বসে কর্মশালায় অংশ নিতে পেরেছেন।

এ ছাড়াও ফ্রিল্যান্সারদের মাঝে যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছে ১২টি মিট-আপ। এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঢাকার বাইরেও প্রচুর কর্মশালা আয়োজন করা হবে।

২০১৩ সালের আগে ইল্যান্সে দেশি ফ্রিল্যান্সারদের মোট আয় ছিল ৪২ লাখ ডলার, সেখানে শুধু গত বছর আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৪ লাখ ডলার। আমরা যাত্রা শুরু করার আগে দেশে ছিল মাত্র ৩০ হাজার নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার, সেটি এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭ হাজারের বেশি হয়েছে।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং কমিউনিটি গঠনের কারণে ফ্রিল্যান্সারদের মনোবল এবং ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন তারা গর্ব করে নিজেদের অনলাইন ফ্রিল্যান্স প্রফেশনাল হিসাবে পরিচয় দিতে পারেন।

টেক শহর : দেশে ইল্যান্সকে প্রমোট করতে কি ধরণের কার্যক্রম রয়েছে?

মামুন : ইল্যান্সকে প্রমোট করার চেয়েও আমাদের লক্ষ্য ফ্রিল্যান্সারদের মানোন্নয়ন। যে কারণে বিভিন্ন চটকদার বিজ্ঞাপনের দিকে না ঝুঁকে কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ আয়োজনে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি বেশি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফ্রিল্যান্সিং জগতের মূল উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক আয়োজিত নারীদের ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিং এবং এটুআই প্রোগ্রামের লার্নিং অ্যান্ড আনিং প্রোগ্রামের আওতায় আমাদের পক্ষ থেকে ওয়ার্কশপ এবং সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলায় ফ্রিল্যান্সারদের বিভিন্ন রিসোর্স তৈরি করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন, ফেইসবুকে ইল্যান্স বাংলাদেশ নামে একটি অফিসিয়াল ইল্যান্স পেইজ আছে (www.facebook.com/ElanceBangladesh), যেখানে দেশি ফ্রিল্যান্সাররা চাইলে বাংলায় তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন এবং মন্তব্য পোস্ট করতে পারেন এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

elance workshop-TechShohor

এ ছাড়া দেশি প্রতিষ্ঠান ডেভসটিম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা তৈরি করেছি ইল্যান্স বাংলা গাইড (Elance Bangla Guide) নামে ৮০ পাতার একটি পরিপূর্ণ ই-বুক। এটি ফ্রিল্যান্সিং এবং ইল্যান্স বিষয়ে বাংলায় তৈরি অনলাইন মার্কেটপ্লেস বিষয়ক প্রথম গাইড বই। বইটি অনলাইন থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যাবে।

আগামীতে এ ধরণের কার্যক্রমগুলো অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও নতুন কিছু কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।

টেক শহর : দেশি ফ্রিল্যান্সারদের কাজ পাওয়া এবং সমস্যা সমাধানে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে আপনার ভূমিকা সম্পর্কে বলুন।

মামুন : কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে আমার মূল দায়িত্ব দেশের ফ্রিল্যান্সারদের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য রিসোর্স তৈরি, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং তাদের ক্যারিয়ার তৈরির জন্য সঠিক পথ দেখানো।

এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে নিয়মিত ফিডব্যাক নেওয়া, তাদের প্রয়োজনগুলো বোঝা এবং সেগুলোর উপর ভিত্তি করে তাদের ইল্যান্স অভিজ্ঞতা আরও ভালো করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কাজের ভারও আমার ওপর রয়েছে।

টেক শহর : ফ্রিল্যান্সিং করতে আগ্রহীদের করণীয় কি?

মামুন : অনেকে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং পেশায় আসতে চাইলেও মনে করেন কয়েক বছরের অভিজ্ঞ না হলে এ পেশায় নামা যায় না। তবে আসল কথা হল অভিজ্ঞ না হয়েও এ পেশায় আসা যায়। ইচ্ছা, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে অনেক ভালো করা যায়। তবে যে কোনো একটি কাজে দক্ষতা এবং ইংরেজিতে যোগাযোগের সামর্থ্য থাকা আবশ্যক। এখানে শিক্ষাগত সার্টিফিকেট, পড়াশোনা দেখে কেউ কাজ দেবে না। এখানে কাজ পেতে নিজের দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব প্রমাণ করতে হবে।

টেক শহর : টেকশহরডটকমকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
মামুন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Related posts

টি মতামত

  1. Saifur Rahman said:

    I am a wheelchair user and physically challenged. Now I am director of a NGO. I am interested to elance. I request to elance authority of Bangladesh, should some initiative to involve disabled people with outsourcing. I know some disabled people who are educated and they will able to work outsourcing. Actually in Bangladesh, disabled people are 1 core 50 lac. Most of them are unemployed. Among them who are educated, they can easily work and earn through outsourcing. Because they will do their work in their home, they do not need to go office. In Bangladesh accessibility is not disabled friendly. So outsourcing can be best workplace for person with disabled. But they are not aware about outsourcing and elance. So some initiative should be taken.

*

*

Top