Maintance

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখন বড় সমস্যা বিদেশিদের আগ্রাসন

প্রকাশঃ ৭:২০ অপরাহ্ন, মার্চ ৪, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৭:৫৮ অপরাহ্ন, মার্চ ৪, ২০১৭

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সফল সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত শামীম আহসান। ই-কমার্সে বাগডুম ডটকম এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ই-জেনারেশন তাঁর। ব্যবসায়ী হিসেবে খাতটির চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার কথা বলেছেন টেকশহরডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাতকারে আল আমীন দেওয়ান।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-কে একটি সাধারণ ও কম পরিচিত সংগঠন হতে দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের শীর্ষ সংগঠন হিসেব রূপান্তর ও প্রতিষ্ঠার অনত্যম অবদান শামীম আহসানের। একক অবদানের কৃতিত্বও অনেকটাই তাঁর, কারণ শামীমের কয়েক সেশনের নেতৃত্বের সময়টাতেই এই রূপান্তর।

দেশে বিনিয়োগ তহবিল যোগানেও সফলতার প্রমাণ রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফেনক্স ভেঞ্চারের এই জেনারেল পার্টনার। ২০১৪ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশে ফেনক্সের যে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা আছে সেটা তাঁর প্রচেষ্টায়।

প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের সদস্য শামীম। বেসিসের এই সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ‘সেরা তরুণ উদ্যোক্তা’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এ সংগঠক ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে চলেছেন। সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালির দ্যা ইন্দাস এন্টারপ্রেনার্স বা টাই (টিআইই) এর বাংলাদেশ অংশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

টেকশহর : ব্যবসায়ী শামীম আহসান সম্পর্কে জানতে চাই? আপনার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।

শামীম আহসান : আমাদের প্রতিষ্ঠান ই-জেনারেশন দেশের অন্যতম তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদাতা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। ই-জেনারেশনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনে অবদান রাখা এবং বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ যাতে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে হাতের মুঠোয় বিভিন্ন ধরণের সেবা পেতে পারে সেক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ই-জেনারেশন কৃষি মন্ত্রণালয়, আইসিটি ডিভিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সিটিজেন সার্ভিসেসগুলোকে অটোমেশনের কাজ করছে।

এর মধ্যে ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন সিস্টেম অন্যতম। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ই-জেনারেশন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরণের সেবা যেমন মাটির ধরণ, ফসলের ক্যাটাগরি, ফসল, জমির পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ এবং দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার বা অনলাইন নিরাপদ রাখাও ই-জেনারেশনের অন্যতম উদ্দেশ্য। একারণে বেসিস ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তায় কাজ করছে ই-জেনারেশন। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, সাইবার নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও টুলস সরবরাহসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়ে শতাধিক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ চলছে।

ই-জেনারেশনের আরেকটি লক্ষ্য হলো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল তৈরি করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইসিটি ডিভিশনের লার্নিং-আর্নিং প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে ই-জেনারেশন। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের চাহিদানুযায়ী তৈরির কাজ চলছে। চাকরি না করলেও তারা যাতে ফ্রিল্যান্স-আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে নিজেদেরকে নির্ভরশীল ও এক সময়ে যাতে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ই-জেনারেশন।

টেকশহর : ই-কমার্স খাতে আপনার উদ্যোগ কেমন চলছে ?

শামীম আহসান : বাগডুম ডটকম দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে দেশের ই-কমার্স খাতের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বাগডুম। পেশাজীবী, শিক্ষার্থী কিংবা তরুণ উদ্যোক্তার ডিজাইন করার টি-শার্ট, হস্তশিল্প, কিংবা অন্য কোনো পণ্যের মানোন্নয়ন করা, আমদানি করা পণ্যের মান ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি যাচাই করা ও তাদেরকে গাইডলাইনের মাধ্যমে এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলার মতো অনেক সফল গল্পের পেছনে রয়েছে বাগডুম ডটকম।

বাগডুমের মাধ্যমেই অনেকে ই-কমার্সের সাথে পরিচিত হতে পেরেছে। বাগডুম থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে মানুষের ই-কমার্সের প্রতি আস্থা বেড়েছে। এছাড়া অনলাইন পেমেন্টেও নির্ভর করতে শুরু করেছেন বিভিন্ন ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডধারীরা। গ্রাহকের চাহিদানুযায়ী পণ্য সঠিক সময়ে, সহজে পৌছে দেওয়া ও গ্রাহক সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত রাখছে বাগডুম। আমি প্রত্যাশা করি আগামী দিনে বাগডুম ডটকম দেশের ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স খাতের সফলতম উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে বাগডুম। অন্যদিকে হাজারো মার্চেন্টরা তাদের পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌছে দিয়ে ব্যবসায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

shameem-ahsan-techshohor

টেকশহর : তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যবসায়ী হিসেবে বর্তমানে খাতটির বড় সমস্যা কোনটি?

শামীম আহসান : তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিদেশিদের আগ্রাসন ও তাদের বাজার দখল। বিদেশি দাতা সংস্থা যখন ফান্ড দেয় পলিসিতে এমনসব শর্ত জুড়ে দেয় যাতে দেশি কোম্পানিগুলো অংশগ্রহণ করতে না পারে। এবং একই সাথে সরকারি সংস্থা, ব্যাংক এবং টেলিকম অপারেটররাও বিভিন্ন কাজে দেশি কোম্পানিদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশিদের কাছ থেকে সফটওয়্যার ও আইটি সেবা নিয়ে থাকে ।

ই-কমার্স খাতেও বিদেশিরা প্রভাব খাটাচ্ছে। বাংলাদেশে দারুন সম্ভাবনাময় বাজার দেখে বিদেশি ই-কমার্স কোম্পানিগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজার দখলের চেষ্টা করছে এবং অল্প পুজি নিয়ে ব্যবসায় আসা ছোট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিদেশি ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সহজেই ঢুকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, যারা প্রায়ই প্রাইস ক্যাপিটাল ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে বাজার দখল করার অপচেষ্টা চালায়।

টেকশহর : সমস্যা সমাধানের পথ বলুন?

শামীম আহসান : পলিসিতে জরুরি সংশোধন প্রয়োজন। বাংলাদেশি কোম্পানির কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অংশগ্রহণ ছাড়া যাতে বিদেশি কোম্পানি পাবলিক প্রকিউরমেন্টে অংশগ্রহণ করতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল- বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করতে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ স্থানীয় অংশীদার থাকতে হবে। স্থানীয় এবং বিদেশি ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুযোগের সমতা নিশ্চিতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত।

কিন্তু এটা অত্যন্ত হতাশার যে, সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও সস্থাগুলো এখনেও প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই দেশের সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও ই-কমার্স খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোই যাতে অগ্রাধিকার পায় সেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

shameem-ahsan-techshohor

টেকশহর : বাংলাদেশে ফেনক্সের ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের যে ঘোষণা রয়েছে তা হতে কত টাকা এবং কয়টি কোম্পানি বিনিয়োগ পেয়েছে? আর বিনিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি কোম্পানি বা উদ্যোগগুলোর পারফম্যান্স কেমন?

শামীম আহসান : এখন পর্যন্ত ৫টি স্টার্টআপ কোম্পানি প্রিয় ডটকম, সহজ ডটকম, বাগডুম ডটকম, আজকেরডিল ডটকম এবং হ্যান্ডিমামাতে বিনিয়োগ করেছে ফেনক্স। এসব কোম্পানি ইতোমধ্যেই তাদের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।

দেশের দ্রতবর্ধনশীল ই-কমার্স খাতে মাত্র ৬ বছর বয়সী ই-কমার্স স্টার্টআপ বাগডুম ও আজকের ডিল শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। মানুষের অফিস, বাসাবাড়ির প্রতিদিনের নানা সমস্যা মিটিয়ে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করেছে হ্যান্ডিমামা। দেশে অনলাইনে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে বিশ্বস্থ প্লাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সহজ ডটকম। এছাড়া প্রিয় ডটকম বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি কমিউনিটির ইন্টারনেট ট্রাফিকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দখল করতে পেরেছে।

টেকশহর : বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কালচার ঠিক পথে এগুচ্ছে বলে মনে করেন?

শামীম আহসান : বিশ্বব্যাপী সঠিক পার্টনারদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে পোর্টফোলিও কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় সম্প্রসারণে সহযোগিতার কাজ করে আসছে ফেনক্স ভেঞ্চার ক্যাপিটাল। বাংলাদেশে ফেনক্সের প্রধান লক্ষ্য হলো ইন্টারনেট ও আইটি কোম্পানি। আমাদের লক্ষ্য তাদের সহযোগিতা করা।

বর্তমানের সিলিকন ভ্যালির থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, তবে সেই অবস্থানে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। আমাদের যথাযথ পলিসি তৈরি করতে হবে, যা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে আমরা ভিসিপিইএবি (ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইক্যুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) গঠন করেছি।

সম্প্রতি আমরা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আইসিটি পলিসি ইস্যু, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নিয়ে আলোচনা করেছি। ভেঞ্চার ফান্ডকে উৎসাহিত করতে ট্যাক্স হলিডে, মিউচুয়াল ফান্ড, অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, স্ট্যাম্প ডিউটি রহিতকরণ, বিনিয়োগ সহজীকরণসহ এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছি। এক্ষেত্রে ট্যাক্সের বিষয়টিতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি।

*

*

Related posts/