আইসিটির উন্নয়নে রোডম্যাপ জরুরি

সফটওয়্যার রফতানিকারকদের সংগঠন বেসিসের সভাপতি শামীম আহসান। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ‘সেরা তরুণ উদ্যোক্তা’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এ সংগঠক ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন টেকশহরডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল আমীন দেওয়ান।

Shameem Ahsan-2-TechShohorবাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক পদেও রয়েছেন শামীম। প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সেরও সদস্যও তিনি। দেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের ইনভেস্টমন্টে অ্যান্ড আউটসোর্সিং স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও আছেন তিনি।

দেশের সুপরিচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এখনিডটকমের প্রধান নির্বাহী এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক ই-জেনারেশন লিমিটেডের চেয়্যারম্যান হিসাবেও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন শামীম।

টেক শহর : দেশের সফটওয়্যার খাতের বর্তমান অবস্থা কেমন?

শামীম আহসান : সফটওয়্যার কেনাকাটা এখনও ওপেন টেন্ডারিং পদ্ধতিতে চলছে। এতে নিম্নতম দরদাতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। খুব স্বাভাবিকভাবে কম দামের জিনিষের মানও কম হবে। ঠিক এ জায়গাতে নীতি সংস্কার হওয়া দরকার। যাতে ভাল কাজগুলো বাজারে টিকে থাকে।

একই সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেসব সফটওয়্যার বানাতে পারে তা হাজার ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে আনার প্রয়োজন নেই। তাই সফটওয়্যার বেচা কেনায় একটা স্টান্ডার্ড নীতিমালা দরকার।

অন্যদিকে বেশ কিছু গ্লোবাল কোম্পানি বাংলাদেশ বিনিয়োগ করে দাঁড়িয়ে গেছে। রিব সিস্টেমস গ্লোবাল এক নম্বর ভিওপি সলিউশন কোম্পানি হয়েছে, টাইগার আইটি বায়োমেট্রিক সলিউশনে পৃথিবীব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছে এবং মিলেনিয়াম বিদেশে সফটওয়ার সেবায় এগিয়েছে। এ কারণে এখানে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

আমরা সফটওয়্যারের বাজার সম্প্রসারণে বিশ্ববাজারে রোড শো, ক্যাম্পেইনসহ নানা প্রচারনার উদ্যোগ নিয়েছি। ‘বাংলাদেশ নেক্সট’ নামের ব্র্যান্ডটিকে ‘বাংলাদেশ ইজ দ্য নেক্সট আইটি ডেস্টিনেশন’ থিমে এগিয়ে নিতে চাই। এ জন্য রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং আইসিটি বিজনেস কাউন্সিলের সহযোগিতা দরকার।

টেক শহর : আইসিটি বাজারে আমাদের দূর্বলতা কোথায়? যে ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন?

শামীম আহসান : এক কথায় উত্তর দক্ষ জনবলের অভাব। স্যামসাংয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রে দুই হাজার দক্ষ কর্মী নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা ৪০০ জনের বেশি নিতে পারেনি। এ জন্য বেসিস টেকনোলজি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টকে (বিআইটিএম) বিভাগীয় শহরগুলোতে সম্প্রসারণ করা হবে। এ কাজে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

basis logo_techshohor

ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এগিয়ে থাকার পরও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কনসালন্টেট ফার্ম ম্যাকেঞ্জি ও কার্ডনারের মতো কোম্পানির মাধ্যমে দু’বছর পরপর রোডম্যাপ তৈরি করে। অথচ আমাদের কোনো রোডম্যাপ নেই। আগে থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী পথ চললে দক্ষ জনশক্তির এ সংকট তৈরি হতো না।

টেক শহর : ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে সরকার ও বেসরকারি খাত কি পাশাপাশি এগিয়েছে?

শামীম আহসান : গত পাঁচ বছরে সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে। ই-কমার্স, ই-মার্কেটিংসহ ই-সেবা প্রচারে সরকার বেশ সহায়তা দিয়েছে। এক্সেস টু ফাইনান্স অ্যাক্টিভেট করা হয়েছে, যদিও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাড়েনি। একই সঙ্গে বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলোকে এখনও দেশে আনা যায়নি। ইইএফ ফান্ড পেতে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে।

আমরা এক বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চাই। এ জন্য দরকার এক থেকে দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ। বিপুল এ বিনিয়োগের কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি। সরকারের বাজেটেও কোনো দিক নির্দেশনা নেই। বছরে বাজেট বরাদ্দ মাত্র এক থেকে দুই কোটি টাকা।

এর বাইরে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার পার্ক, বিডিবিএল ভবনে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক-১ বাস্তবায়নের অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।

ইন্টারনেটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাদ দেওয়ার বিষয়টি দাবির পর্যায়ে রয়ে গেছে। ই-কমার্সে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ১০ বছরের জন্য ভ্যাট তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত না হতেই ভ্যাট দিতে হচ্ছে সাড়ে চার শতাংশ পর্যন্ত।

এতকিছুর পরও আমাদের উদ্যোক্তারা ১০ কোটি ডলার রফতানি করছেন। এটা বেসরকারি খাতের বড় সফলতা। সরকারকে দোষারোপ করতে চাই না। এখন চাই সবাই একসাথে কাজ করতে। এবার যেন নতুন সরকার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এসব অসমাপ্ত কাজ শেষ করে সেদিকে দৃষ্টি থাকবে আমাদের।

Shameem Ahsan-e-generation-TechShohor

টেক শহর : ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে দ্রুত কি পদক্ষেপ নিতে হবে?

শামীম আহসান : রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে থ্রিজির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। সামিট ও ফাইবার অ্যাট হোম ঢাকা ছেড়ে বাইরে যাচ্ছে না। এ জন্য সাত বিভাগে সাতটি কোম্পানিকে নতুন লাইসেন্স দিয়ে হলেও দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। ই-সেবা সম্প্রসারণ করার উদ্যোগটিও পুরোপুরি এগোয়নি। এ নিয়ে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে সরকার সবার কাছে ইন্টারনেট পৌঁছাতে পারেনি। দামের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। সরকারের সচিবালয়গুলো সম্পূর্ণ পেপারলেস হয়নি। আইসিটি খাতের জন্য উন্নয়ন কাউন্সিল গঠনের কাজটিও গত পাঁচ বছরে হয়নি। এসব দিকে সবার আগে নজর দিতে হবে।

টেক শহর : যে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে বাংলাদেশ?

শামীম আহসান : আগামী ছয় থেকে সাত বছরে দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত থেকে আট কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। এখন বছরে ৪০ হাজার ফ্রিল্যান্সার প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। একজন সাধারণ ফ্রিল্যান্সার ডাটা এন্ট্রি বা অনলাইন মার্কেটিং করে মাসে এক হাজার ডলার আয় করছেন। এক্সপার্টদের আয় চার/পাঁচ গুণ বেশি। ভবিষ্যতে এসব শিক্ষার্থীদর মধ্যে তিন কোটিকে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে দক্ষ করে তুলতে চাই। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে সবকিছু। সরকারকে স্বপ্ন দেখাতে চাই, মধ্যম নয়- উন্নত আয়ের দেশের তালিকায় থাকবে বাংলাদেশ।

Related posts

*

*

Top