বাজার বিশ্লেষণ ছাড়াই চলছে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসা

দেশের প্রথম সারির প্রযুক্তিপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ব্র্যান্ড। কোম্পানির চেয়ারম্যান এএসএম আব্দুল ফাত্তাহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসা, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন টেকশহরডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল আমীন দেওয়ান

প্রায় দু’যুগ আগে সুন্দর এক আগামী নির্মাণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যাত্রা শুরু করেছিলেন আব্দুল ফাত্তাহ। দূরদর্শী এ ব্যবসায়ী সেই সময়ে বুঝতে পেরেছিলেন দেশে আইসিটির অপরিহার্যতা। তার ভাবনায় ছিল তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকলে এগোতে পারবে না জাতি। বর্তমানে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায় তিনি শুধু এক আইকন নন, সত্যিকার ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন বুননের নাবিকদের একজন।

fattah 1

টেক শহর : গ্লোবাল ব্র্যান্ড, স্বপ্নের শুরুটা জানতে চাই।

আব্দুল ফাত্তাহ : শুরুটা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। প্রথম থেকে লক্ষ্য ছিল ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে কাজ করার। সে কারণে খুচরা বিক্রি বা রিসেলারশিপে অংশগ্রহণ নেই গ্লোবাল ব্র্যান্ডের। এলজি ইলেকট্রনিক্সের ডিস্ট্রিবিউশন দিয়ে শুরু। এরপর একে একে আসুসসহ ২৬ ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাত করছি আমরা। এসব ব্র্যান্ডের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের বিস্তার ঘটাতে শুরু থেকে চেষ্টা করছি আমরা।

শুধু ব্যবসা নয়, ভোক্তাসহ সাপ্লাই চেইনের সকলেই যাতে লাভবান হয় সেদিকটায় সবসময় গুরুত্ব দেয় গ্লোবাল ব্র্যান্ড। আমরা বিশ্বাস করি ব্যবসাতে লাভ থাকবে। ডিস্ট্রিবিউটর থেকে রিটেইলার পুরো চেইনের সবাই জিততে চায়। তাই এ প্রতিযোগিতায় যেন অসম হয়ে না পরে সেজন্য রিসেইলার ও ভোক্তা উভয়পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টার দিকে সমান মনোযোগ রয়েছে আমাদের।

টেক শহর : আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিতে অনুসরণীয় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটি জানতে চাই।

আব্দুল ফাত্তাহ : গ্লোবাল ব্র্যান্ডের যাত্রা ১৯৮৯ সালে হলেও আমার ব্যবসায় হাতেখড়ি ১৯৮০ সালে। পেছন ফিরে তাকালে এটি লম্বা এক সময়। অভিজ্ঞতার বয়স ৩৩ বছর। আমি অনেক বড় বিজনেসম্যান নই। কিন্তু যতটুকু ব্যবসা করেছি তা আমার শ্রম, মেধা এবং সততা দিয়ে করেছি। সততাই আমার ব্যবসার মূল। ব্যবসার মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে টাকা বানানোর প্রতিযোগিতায় নামা ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ নয়। এ নীতি মেনে চলেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি আমি। এখান কোনো শর্টকার্ট নেই।

টেক শহর : তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা আপনার। দেশের প্রযুক্তি বাজারের চিত্রটি কেমন? আমাদের পথচলা কি সঠিক পথে এগোচ্ছে?

আব্দুল ফাত্তাহ : যদি কেউ বলেন বর্তমানে তা সঠিক পথে এগোচ্ছে, তাহলে আমার দ্বিমত আছে। দুটো বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটা হল ডিশট্রিবিউশন, আরেকটা ভোক্তা। আমরা যারা ডিস্ট্রিবিউশন করি তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। এ কারণে সকলকে লোকসানের ভাগিদার হতে হয়।

এবার বাজারের কথায় আসি। আমাদের দেশের বাজার বিশ্লেষণ বা গবেষণার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বাজার বিশ্লেষণ না করেই চলছে ব্যবসা। আমরা ঠিকমত জানি না দেশের বাজারের অবস্থা বা এর আকার সম্পর্কে। ধারনার ওপর নির্ভর করে পণ্য আমদানি করা হয়। এতে বাজারে প্রায়শ পণ্যের ওভার ফ্লো থাকে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা চাপে থাকেন। চাপের বড় একটা কারণ ব্যাংকের সুদ হার। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ হারে সুদ গুণতে হয়।

আরেকটি বিষয় হলো দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। সম্প্রতি তিন মাস পণ্য গুদামে মজুদ পড়েছিল। বিক্রয় চেইনের কোনো এন্ডেই বেচাকেনা হয়নি। অথচ ব্যাংকের সুদ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি পণ্যের প্রতিনিয়ত আপডেট আসছে। এ অবস্থায় তিন মাস পেছনে পড়ে যাওয়ায় গুদাম ভর্তি ব্যাকডেটেড পণ্য নিয়ে বড় ধরণের ক্ষতির মধ্যে পড়েছে প্রায় সকলেই।

একই সঙ্গে রিসেইলারদের নিয়েও আমরা সমস্যায় থাকি। তাদের বেশিরভাগের বড় ধরণের পুঁজি থাকে না। আমদানিকারকদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখানে ৪৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত বাকিতে লেনদেন হয়। অনেক সময় তার চেয়েও বেশি। অনেকে পণ্য বিক্রি করার পর ক্যাশ টাকা আর আমদানিকারকদের ফেরত দিতে আগ্রহ দেখান না। এতে চাপ তৈরি হয় সব পক্ষের ওপর।

এবার বলা যাক ভোক্তাদের কথা। ভোক্তারা এখন অনেক সচেতন। তারা অনেক যাচাই বাছাই করে আপডেটেড এবং ভাল পণ্যটি কেনেন। তাই আমাদেরও সতর্ক থাকতে হয়।

টেক শহর : চীন, তাইওয়ান, ভারত থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশে ছোট প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন করে। আপনারা যারা দেশে প্রযুক্তি শিল্পের প্রথম সারিতে আছেন তারা এমন উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?

আব্দুল ফাত্তাহ : চীনের বাজার অনেক বড়। ওই তুলনায় এখানে মানায় না। বাংলাদেশের মার্কেট সাইজ খুব বেশি বড় নয়। এ কারণে এখানে পণ্য তৈরি করে বাজারে টিকে থাকা বা সফলতার বিষয়টি আশা করা দুষ্কর। এর মধ্যেও কিন্তু ইউপিএস ও কম্পিটার ফার্ণিচার তৈরি হচ্ছে। আগে আমদানিই ছিল ভরসা।

তবে মাউস বা মাদারবোর্ডের মতো পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে বাজার এখনও তৈরি নয়। সরকার একটা পদক্ষেপ নিয়েছিল দোয়েল নিয়ে। তা কিন্তু সফলতা পায়নি।

fattah

টেক শহর : প্রতি অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। এখন সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছে, এরপরও কি এসব সমস্যা থেকে যাবে?

আব্দুল ফাত্তাহ : আসলে ডিজিটাল বাংলাদেশ একটি সরকারি স্লোগান। সরকার বা এ খাতের সঙ্গে জড়িতরা না চাইলেও সময়ের দাবিতে প্রযুক্তি এখন জীবনযাত্রার অংশে পরিণত হয়েছে। এখন অনেক ছেলেমেয়ে অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। একটা বিষয় আমি বলব যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়টা সরকার আসলে মৌখিকভাবে চাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব কম।

যেমন আমাদের অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ পড়ে আছে অনেক। সস্তায় ব্যান্ডউইথ জনগণকে উপহার দেওয়া কি হচ্ছে? সাড়ে ৪ হাজার টাকায় এক এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ কিনতে হচ্ছে। ছয়শ’ থেকে আটশ’ টাকায় এটি দেওয়ার ব্যবস্থা হলে ডিজিটালাইজেশন গতি পেত। এ সেবা গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা সরকারও বলছে। এসবের বাস্তবায়ন চিত্র দেখেই বোঝা যায় আসলে ডিজিটালাইজেশনে সরকার কতটা আন্তরিক।

টেক শহর : প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ কম্পিটার সমিতির (বিসিএস) ভূমিকার কথা বলুন।

আব্দুল ফাত্তাহ : বিসিএসের বর্তমান ভূমিকা যথেষ্ট নয়। আমি মনে করি লাস্ট দুই টার্মে কার্যক্রম যতটুকু হওয়া দরকার ছিল তা হয়নি। কথা হলো বিসিএস কার স্বার্থে? বিসিএস হলো একমাত্র কম্পিটাউটার ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। বিসিএসকে কোম্পানীগুলো মিলে সংগঠিত করছি, আমরাই চাঁদা দিচ্ছি এবং মেলাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা দিচ্ছি। তবে বর্তমানে কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রির খারাপ অবস্থা ভাল করার দায়িত্ব অ্যাসোসিয়েশনের হলেও আজ পর্যন্ত ইউনিক ওয়ারেন্টি পলিসি হয়নি।

আমাদের প্রচুর পণ্য স্থানীয়ভাবে মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। এগুলো দেশের বাইরে পাঠাতে হয়। পাঠানোর প্রক্রিয়াটা আজ পর্যন্ত ঠিক হয়নি। মেরামতের পর শুল্ক ছাড়া সেগুলো ফেরত আসার নিয়মনীতিও হয়নি। সংগঠনের দায়িত্ব এ বিষয়গুলোর সমাধান করা।

বাজার সম্প্রসারণে কাজ করাও বিসিএসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত ছিল। অথচ বিসিএস নিজেই এখন লভ্যাংশ আয়কারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কত বেশি টাকা এফডিআর করা যায়, কত বেশি টাকা আয় করা যায় এটাই এখন মূল লক্ষ্য হয়েছে তাদের।

টেক শহর : গ্লোবাল ব্র্যান্ডের কতগুলো শাখা এবং ডিলার রয়েছে? বর্তমানে কতটি পণ্যের ডিস্ট্রিবিউটর আপনারা?

আব্দুল ফাত্তাহ : কয়েকশ ডিলার আছেন। শাখাও আছে ১৩টির বেশি। বর্তমানে ২৬ ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে।

টেক শহর : একমাত্র পরিবেশক হিসেবে কতগুলো পণ্য রয়েছে আপনাদের? দেশের প্রযুক্তি বাজারে এগুলোর অবস্থান কেমন?

আব্দুল ফাত্তাহ : আমরা আসুস, এফোরটেক, মাইক্রোনেট, এডটাসহ নামীদামী ২২ থেকে ২৩টি পণ্যের একমাত্র পরিবেশক। ডেল, লেনেভো, সিসকোর দু’একটি প্যারালাল ডিস্টিবিউটর আছে। এসব পণ্যের পরিবেশক হিসাবে বাজারের আমাদের অবস্থা খুবই ভাল।

একমাত্র পরিবেশক হলে সুবিধা হলো নিজের মতো করে সাজানো যায়। নিজের মতো করে কাস্টমারের কাছে উপস্থাপন করা যায়। সার্ভিস সাপোর্ট থেকে প্রাইজিং সবকিছু নিজের কন্ট্রোলে রাখা যায়। প্যারালাল ডিস্ট্রিবিউটর থাকলে সেভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

টেক শহর : দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের অবস্থানের বিষয়ে বলুন। বিক্রয়ত্তোর সেবা দিচ্ছেন কতটুকু?

আব্দুল ফাত্তাহ : গ্লোবাল ব্র্যান্ড বর্তমানে দেশের শীর্ষ তিন কোম্পানির একটি। আমাদের প্রত্যেকটি ব্রাঞ্চে সার্ভিস সেন্টার আছে। কল্যাণপুরের সার্ভিস সেন্টারটি পাঁচ হাজার বর্গফুটের। বিক্রয়ত্তোর সেবায় সবসময় গ্রাহক সন্তুষ্টির বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

টেক শহর : ডিজিটালাইজেশনের যুগে পণ্যের প্রচারণার ক্ষেত্রে আপনারা কোন প্লাটফর্মকে গুরুত্ব দিচ্ছেন?

আব্দুল ফাত্তাহ : অবশ্যই অনলাইনভিত্তিক প্রচারণা থাকছে সবার আগে। ফেইসবুক ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে জনপ্রিয় অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিজ্ঞাপনের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে। দিন দিন অনলাইন বিজ্ঞাপন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য প্রযুক্তির প্লাটফর্মই ভালো।

টেক শহর : তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বিশেষায়িত নিউজ পোর্টাল টেকশহরডটকমের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

আব্দুল ফাত্তাহ : টেকশহরডটকমের উদ্যোগটি খুবই সময়োপযোগী। তথ্যপ্রযুক্তির খবর ছড়িয়ে দিতে এটি চমৎকার এক পদক্ষেপ। দেশে ইন্টানেট ব্যবহারের ঘনত্ব বাড়ছে। ১১ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার খুলতে হচ্ছে না। এটি এ খাতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

টেকশহরডটকমের মতো সার্বক্ষণিক আপডেট থাকা নিউজ পোর্টাল তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। খবর পরিবেশনে পাঠকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিলে পোর্টালটি জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয়তর হবে।

টেক শহর : টেকশহরডটকমকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আব্দুল ফাত্তাহ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Related posts

*

*

Top