ডিজিটালাইজেশনে প্রাইভেট সেক্টরকে সঙ্গে না পাওয়াটা বড় ব্যর্থতা

এন আই খান নামেই সুপরিচিত মো. নজরুল ইসলাম খান। বর্তমানে তিনি আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব। এটুআই’র প্রথম এই প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলেছেন আল আমীন দেওয়ান

টেক শহর : আপনি তো সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম বাস্তবায়নে একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের নের্তৃত্ব দিয়েছেন। কতখানি এগিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথযাত্রা?

এন আই খান : পাঁচ বছর আগে যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল সে সময় থেকে এখন ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে দশগুণ। তখন ডিজিটাল সার্ভিস ছিল না। এখন কয়েকশ’ ই-সার্ভিস হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি ওয়েবসাইট ছিল এবং তা ভিন্ন প্লাটফরমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। আর এখন সরকারের ওয়েবসাইটের সংখ্যা ২৫ হাজার। সকল দপ্তরের তথ্য সংবলিত ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। একেকটি ইউনিয়নেরও চমৎকার ওয়েবসাইট রয়েছে।

Nazrul islam khan-TechShohor

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন ডিজিটাল সেবাসহ কোনো তথ্য জানার জায়গা ছিল না। এখন প্রত্যেক মাসে ইউনিয়ন সেবা কেন্দ্রসমূহে ৫০ লাখ মানুষ সেবা নিতে যায়। যেখানে কম্পিউটারসহ ডিজিটাল প্রযুক্তি স্থাপিত হয়েছে। আমরা ছয় কোটি টাকারও বেশি এসব কেন্দ্র থেকে আয় করছি।

ডিজিটাল রূপকল্পের ঘোষণার সময় দেশের মধ্যস্তরের বিশেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেরা ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করতে পারবেন এটা কল্পনা করাও মুশকিল ছিল। সে সময় বিশেষজ্ঞরা সবসময় এর রিরুদ্ধে বলেছে যে এটি সম্ভব না। এখন বিশ হাজারের বেশি শিক্ষক বাতায়ান নামে পোর্টালে নিজেরাই কন্টেন্ট তৈরি করছেন। অন্যরা সেটা আপগ্রেড করছেন এবং ক্লাসে ব্যবহার করছেন। যখন শুরু করা হয়েছিল তখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ক্লাসকে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হবে এটা স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। এখন প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রেনী কক্ষকে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে রূপান্তর করা হয়েছে।

শুরুতে হাতেগোনা কিছু স্কুলে হয়ত ল্যাব ছিল, এখন কম্পিউটার ল্যাব বা কম্পিউটার নেই এমন কোনো স্কুল বোধহয় নেই। তখন স্কুল লেভেলের শিক্ষক ছাত্রদের ই-মেইল আইডি ছিল না। এখন এ পর্যায়ের ছাত্র শিক্ষকরা ই-মেইল ব্যবহার করছেন। ফেইসবুক একাউন্ট গুনতে হবে  মিলিয়ন হিসেবে। শিক্ষার্থীদের বই ডিজিটালাইজড হয়েছে, ই-বুকের সেবাটি অসাধারণ। সোজা কথায় তখন যে পরিমাণ তথ্যের আদান প্রদান হতো, তার চেয়ে কয়েক হাজার গুন তথ্যের আদান প্রদান এখন হয়। নানা সুবিধা আদান প্রদান হয়।  আর যত বেশি তথ্যের লেনদেন হয় মানুষ তত বেশি নলেজেবল হয়। আপনারা দেখবেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে পাবলিক সার্ভিসে দূর্নীতি কমেছে আর এর কারণ আইসিটি ব্যবহার, সরাসরি আইসিটির মাধ্যমে সার্ভিস ডেলিভারি দেওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেক শহর: ডিজিটাল ভিশনের পথে ব্যর্থতাগুলো কি?
এন আই খান : ফাইবার অপটিক, ব্রডব্যান্ডের দাম কমাতে এবং সংযোগে আমরা এখনও সফল নই। সরকারি অংশে দাম কমেছে কিন্তু প্রাইভেট সার্ভিস প্রোভাইডার অংশে সেভাবে কমানো যায়নি। এখনও ইউনিয়নে, হাটবাজারে, স্কুলে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিতে পারিনি। শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায়নি। কাংখিত আইটি প্রফেশনাল তৈরি করতে পারিনি। আমরা যদি শুরুর তুলনায় দশগুণ বেশি আইটি গ্রাজুয়েট বের করতে পারতাম সেটা ভাল কিছু হতো।

সচিবায়লসহ সরকারি দপ্তরগুলো সম্পূর্ণ পেপারলেস করতে পারিনি। সেটা পারলে অন্য শাখা প্রশাখাগুলোতে আইসিটি ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা তৈরি হতো। প্রাইভেট সেক্টরকে আইসিটিতে আনতে পারিনি। প্রাইভেট সেক্টরকে আমরা জোরাজুরি করতে পারি না, সুযোগ সুবিধা দিতে পারি মাত্র। আইসিটি ব্যবহার করাটা তাদের নিজের সদিচ্ছার কাছেই আছে। অথচ অন্য অনেক দেশে প্রাইভেট সেক্টর আগে থাকে। এখানে সরকার এগিয়ে গেছে কিন্তু সেভাবে প্রাইভেট সেক্টর এগোয়নি। বিটিসিএল নিয়ে বিপদে আছি। এটি না কোম্পানি, না সরকারি প্রতিষ্ঠান। মামলা মোকদ্দমায় আটকে আছে এটির কার্যক্রম, এটিকে সক্রিয় করতে পারছি না আমরা। অথচ এটি আমাদের সেক্টরের ব্লাড।

টেক শহর : দীর্ঘ ১৪ বছর! কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক কি স্বপ্নই থেকে যাবে?
এন আই খান: এটি নিয়ে মামলা হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে ডেভলপার নিয়োগের বিষয়ে স্থগিতাদেশ আছে। তাই আমরা কাজ এগোতে পারছি না। তবে সংযোগ সড়ক, ভেতরের সড়কসহ অন্যান্য কাজ এগিয়ে নিচ্ছি । এখন শুধু মামলাই একমাত্র  কারণ, যে জন্য এ প্রকল্পে থমকে আছি।

টেক শহর: ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্যোগ ছিল দেশীয় ল্যাপটপ দোয়েল। অথচ বাজারে আসার দুই বছর পরও দোয়েলকে ব্যর্থ প্রকল্পই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পটিতে দূর্নীতিসহ এর গুণগত মান ও পারফরম্যান্স নিয়ে অভিযোগ আছে। কেন এমনটি হল?
এন আই খান: এটি আমার মন্ত্রনালয়ের কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবে। এটি সত্য যে জাতীয় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কেউ লোয়ার কোয়ালিটির ডিভাইস নেবে না। বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানির পর পুরোপুরি দেশে তৈরি দোয়েল। মূল্য কম হওয়ায় এটি বেশ সাড়া ফেলেছিল। একেবারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড হিসেবে দোয়েলের মূল্যে ল্যাপটপ কিন্তু কোথাও পাবেন না। মূল্য ও প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে এখনই এটিকে আন্তর্জাতিক  ব্র্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।

এরপরও গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্কুল কলেজে এ দোয়েলই কিন্তু ল্যাপটপ নামক ডিভাইসটির সাথে মানুষকে পরিচিত করেছে। যে কোন যাত্রায় উৎসাহ তৈরি করতে পারাটাও বড় সফলতা। নতুন উদ্যোমে ভুল ত্রুট শুধরে দোয়েল এগুচ্ছে। এটির বেশ সম্ভাবনা আছে এবং আশাকরি তা কাজে লাগানো যাবে।

টেক শহর: মন্ত্রনালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট হালনাগাদ নয়।  আশাব্যাঞ্জক হয়নিও বলছেন অনেকে, কেন?
এন আই খান: ওয়েবসাইটগুলো প্রথমে যে যার মতো করে তৈরি করেছে। প্রথম থেকে অনেক বিধি নিষেধ দিলে শুরু করা অনেক কঠিন হত। আমরা এখন জাতীয়ি একটি নকশা তৈরি করে ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কে নিয়ে আসছি সব ওয়েবসাইট। আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থাটাও একটু ভাবতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের ওয়েবসাইটই আপডেট হয় না। আমি সিআইএর ওয়েবসাইট দেখেছি, হালনাগাদ নয়।

এখন ইউনিয়ন, উপজেলায় দপ্তরগুলো নিজের ওয়েবসাইট আপডেটসহ কার্যক্রম নিজেই করে; কিন্তু উপরের দপ্তর ও মন্ত্রনালয় পর্যায়ে অন্য প্রফেশনালরা করে। সচিবের নিজের পক্ষে তা দেখা সম্ভব নয়।  বড় দপ্তর ও মন্ত্রনালয়ের অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। সবগুলো ডিপার্টমেন্টর তথ্য এক জায়গার করা অনেক কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। আমরা ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে ট্রেনিং শেষ করেছি। সচিবালয় পর্যায়েও ট্রেনিং শুরু হয়েছে। আসলে এ যে অর্গানাইজেশনটা, সিস্টেমটা ডেভলপমেন্ট করতে সময় লাগবে।

ই-সার্ভিসগুলোর জন্য  দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সংযোগ হলেই নেটসহ ইনফো সরকার সিস্টেমটা ডেভলপ করায় ভূমিকা রাখবে।  দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ না হলে সার্ভিস ক্রাশ করবে। ২০১৪ সালের মধ্যে আমরা সব গুছিয়ে আনব আশা রাখি।

টেক শহর : আমাদের সাইবার সিকিউরিটির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ? অনেক সরকারি ওয়েবসাইট ইতোমধ্যে হ্যাকের শিকার হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের এত বিশাল পরিসরের কার্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি সমান্তরালভাবে আসেনি কেন?

এন আই খান : কোন কিছুই শতভাগ নিরাপদ নয়। তবে আমরা সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। তথ্যের সুরক্ষায় ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব সরকারি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসএসএল (সিকিউরড সকেট লেয়ার) সার্টিফায়েড করার জন্য ইতোমধ্যে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। প্রথমে মানুষকে ভয়ের ভেতরে রাখতে চাইনি। প্রথমে বলেছি সিকিউরিটির চিন্তা করতে হবে না, কাজ করো। এখন এসএসএল সার্টিফিকেট, ডিজিটাল সিগনেচারসহ আমরা বেশ কিছু কর্মসূচী নিয়েছি। সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি অথবা ডিপার্টমেন্ট খোলা হবে। অর্গানোগ্রাম গঠনের কাজ চলছে। আমরা তহবিল জোগানোর চেষ্টায় আছি ।

টেক শহর : ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমের পরবর্তী কিছু আশার কথা শোনান।
এন আই খান: পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে মাল্টিমিডিয়া বই তৈরি করা হবে। জোড়েশোরেই সফটওয়্যার পার্কের কার্যক্রম চালু করতে চাই। ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাটি বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং সারা দেশে বেশ কিছু আইসিটি পার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এতসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে সর্বনিম্ন দুই এমবিপিএস ইন্টারনেট সংযোগ লাগবে। আগেই একার বলেছি তারপরও বলি, ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে সব সরকারি দপ্তরগুলোতে অটোমেশনে রান করা হবে। সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা হল আউটসোর্সিংয়ে এক বিলিয়ন ডলার আয় করা, যার জন্য ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ কর্মসূচির পরবর্তী অংশ বাস্তবায়ন করা হবে।

পরিকল্পনা আছে ব্যক্তি উদ্যোগে ময়মনসিংহে একটি হাইটেক পার্ক, সমাজ সেবার বিভিন্ন অর্গানাইজেশনকে সঙ্গে করে ‘বাড়ি বসে বড়লোক’ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন, ট্রান্স ইউরো সুপার হাইওয়েতে সংযুক্ত হতে পদক্ষেপ নিতে হবে। ‘ওয়ান ফ্যামিলি ওয়ান উইমেন’ বিষয়ক আরও একটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ই-সেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন সার্ভিস অ্যান্ড ডকুমেন্টেশনের (ইউএসডি) কাজ হবে। জনসচেতনতায় ও জনসম্পৃক্ততার লক্ষ্যে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ফেয়ার এবং উপজেলা পর্যায়েও এর সম্প্রসারণ করা হবে।

টেক শহর : আমরা  আশা করছি এসব আশা পূরণ হবে। ডিজিটাল রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে সফল হবে বাংলাদেশ। মূল্যবান সময়ের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এন আই খান : আপনাকেও ধন্যবাদ। টেক শহরকে ধন্যবাদ।

Related posts

*

*

Top