বিজয়ের রজত জয়ন্তীতে আসছে একাত্তর প্রো

কম্পিউটারে বাংলা লেখায় মাইলফলক বিজয়। সফটওয়্যারটির ২৫ বছর পূর্তি ১৫ ডিসেম্বর। বিজয়ের রূপকার মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে কথা বলে এটির শুরু, ভবিষৎ পরিকল্পনা ও অজানা সব বিষয় তুলে ধরেছেন তুহিন মাহমুদ

টেক শহর : বিজয় সফটওয়্যারের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?

মোস্তাফা জব্বার : বিজয়ের প্রথম কোডিং হয়েছে দিল্লীতে। দেবেন্দ্র জোশী নামের একজন ভারতীয় ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ কাজটি করেন। এরপর বাংলাদেশে এর উন্নয়ন অব্যাহত থাকে। ২৫ বছরে শত শত বাঙালী তরুণ-তরুণী এর উন্নয়নে কাজ করেছে। শুরুর বছরে শুধু মেকিন্টোস কম্পিউটারের জন্য প্রচলিত হয় বিজয় সফটওয়্যার ও কীবোর্ড। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কম্পিউটারে বাংলা লেখার জনপ্রিয় সফটওয়্যার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

টেক শহর : বিজয় নামকরণের কারণ কি?

মোস্তাফা জব্বার : বিজয় হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জনগণের বিজয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বাংলা লিপিকে পরাধীনতার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে বলে বিজয় নামকরণ করা হয়েছে। আমার ছোট মেয়ে সুনন্দা শারমিন তন্বী পাঁচ বছর বয়সে নতুন সফটওয়্যার ও কীবোর্ডের জন্য বিজয় নাম দেয়। পরে সেটিই রেখে দেওয়া হয়।

mostafa jabber_techshohor

টেক শহর : বাংলা ভাষায় বিজয়ের কি ধরণের অবদান রয়েছে?

মোস্তাফা জব্বার : বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার প্রণয়নের সময় বাংলা হরফকে কীবোর্ডে বিন্যস্ত করার একটি নতুন ধারনা কাজে লাগানো হয়েছে। বাংলা মূল বর্ণগুলোর মাঝে শুধু ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি, দুটি স্বরবর্ণ, ৯টি স্বরচিহ্ন,  হসন্ত-দাড়ি ও তিনটি ফলাকে কীবোর্ডে রাখা হয়েছে। যুক্তাক্ষর ও স্বরবর্ণ তৈরির জন্য হসন্তকে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বাংলা যুক্তাক্ষর কীবোর্ডে রাখার প্রয়োজন হয়নি। এসবই কম্পিউটারে সহজে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

পরবর্তীতে যারাই বাংলা লেখার সফটওয়্যার ও কীবোর্ড নিয়ে কাজ করেছে তারাই স্বীকার করেছে বিজয় সব থেকে বেশি সহজ ও অসাধারণ লেআউট। প্রিন্ট মিডিয়া, ছাপাখানার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় বিজয়। বর্তমানে বিজয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেটেও সরাসরি ইউনিকোডে বাংলা লেখা যাচ্ছে।

কম্পিউটারে বাংলা লেখায় বিজয় চালুর আগে ও পরে অনেক বাংলা সফটওয়্যার প্রচলিত হলেও এটির বিশেষত্ব আলাদা। এখনও পেশাদারী কাজে শুদ্ধ বাংলা লেখার জন্য বিজয় সেরা বাংলা সফটওয়্যার হিসেবে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এটি কেবল একটি কীবোর্ড বা সফটওয়্যার নয়, এটি একটি নতুন ধারনা, একটি উদ্ভাবনা।

বিজয় ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা ভাষা ও লিপি ব্যবহারের জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেছে। এটি এমন নয় যে, আর কোনো সফটওয়্যার বা অন্য কারও প্রচেষ্টা এখানে ছিল না। তবে বিজয় ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা হরফকে অবিকৃত রেখে এর পরিপূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। তাই বাংলা ভাষার প্রসারে এর অবদান অনস্বীকার্য বলে আমি মনে করি।

bijoy keyboard_techshohor

টেক শহর : গত ২৫ বছরে কি পরিমান বিজয় সফটওয়্যার বিক্রি হয়েছে?

মোস্তাফা জব্বার : গত ২৫ বছরে কি পরিমাণ কম্পিউটারে বিজয় ইন্সটল হয়েছে তা হয়ত আন্দাজ করা যাবে না। তবে নিশ্চিত করে বলা যাবে, সেই সংখ্যা দেশের কম্পিউটার ব্যবহারের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। হয়ত শতকরা ৯৫ ভাগ কম্পিউটারে এ সফটওয়্যারটি ইন্সটল হয়েছে।কেবলমাত্র মাইক্রোসফট উইন্ডোজ বা অফিস বিজয়ের কাতারে রয়েছে। বিজয় শুরুর পর থেকে দেশে এমন কোনো বাংলা সফটওয়্যার প্রচলিত হয়নি যাতে এ কীবোর্ড বা সফটওয়্যারের ফন্ট বা প্রযুক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

টেক শহর : এ পর্যন্ত বিজয়ের কি কি সংস্করণ বাজারে এসেছে?

মোস্তাফা জব্বার : সংখ্যাটি অনেক। প্রায় প্রতি বছর কিছু না কিছু আপডেট এসেছে। বিজয় এখন চারটা প্লাটফর্মে কাজ করে। এগুলো হলো মেকিন্টোস, উইন্ডোজ, লিনাক্স ও অ্যান্ড্রয়েড। এরমধ্যে মেকিন্টোস ও উইন্ডোজের সংস্করণ হয়েছে অনেক। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কম্পাটিবিলির বিষয় ছিল। এরই পরিপেক্ষিতে বিজয়েরও সংস্করণ আনতে হয়েছে। তবে ম্যাকের জন্য সবচেয়ে বড় ধরণের সংস্করণ এসেছে ১৯৮৮, ১৯৯২, ২০০৫, ২০১২ সালে। উইন্ডোজের ক্ষেত্রে ১৯৯৩, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০৫, ২০০৭ এর পরে আরও চারটি সর্বমোট ৯টি বড় ধরণের সংস্করণ বাজারে এসেছে।

Bijoy71_techshohor

টেক শহর : রজত জয়ন্তীতে বিজয়ের কোনো নতুন সংস্করণ আসছে কি না?

মোস্তাফা জব্বার : রজত জয়ন্তীতে বিদ্যমান সংস্করণগুলোর সাথে নতুন যুক্ত হচ্ছে উইন্ডোজের জন্য বিজয় একাত্তর প্রো। এতে বিজয়, মুনির ও জাতীয় কীবোর্ড কাজ করে। এটি আস্কি, একাত্তর ও ইউনিকোড এনকোডিং-এ কাজ করে। এতে সকল ধরনের কনভার্টার রয়েছে। এটি অন্য সফটওয়্যারের চাইতে আলাদা হওয়ার কারণ এটি কোয়ার্ক এক্সপ্রেস নামক পেশাদারী পেজ মেকআপ সফটওয়্যারের উচ্চতর সংস্করণগুলোতে (৬, ৭, ৮, ৯, ১০) কাজ করার পাশাপাশি উইন্ডোজ এক্সপি, উইন্ডোজ ভিস্তা, উইন্ডোজ সেভেন ও উইন্ডোজ এইটে কাজ করে। এটি আগের সকল সংস্করণের চাইতে অনেক দ্রুত কাজ করে। রজত জয়ন্তীতে বিজয়ের গর্ব করার মতো আরও একটি বিষয় হচ্ছে এতে এবার ১০০ ফন্ট যুক্ত হয়েছে। বাংলা লিপির এমন বৈচিত্য এর আগে আর কখনও দেখা যায়নি।

টেক শহর : ‘বিজয়’ লে-আউট মুদ্রিত কীবোর্ড কখন থেকে বাজারে আসে?

মোস্তাফা জব্বার : ১৯৯৮ সালে এ কীবোর্ড বাজারে আসে। ২০০৪ সালে বিজয় কীবোর্ড লেআউট প্যাটেন্ট করা হয় এবং ২০০৮ সাল থেকে লাইসেন্সিং চালু হয়। প্রচলিত আইনে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিজয় কীবোর্ডের প্যাটেন্টের মেয়াদ বলবৎ থাকবে। পরবর্তীতে প্যাটেন্ট না থাকলে কপিরাইট বলবৎ থাকবে।

টেক শহর : এ পর্যন্ত বিজয় লেআউটসহ কি পরিমান কীবোর্ড বাজারে এসেছে?

মোস্তাফা জব্বার : ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ বছরের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৩২ হাজার ১৮৮টি বিজয় লেআউট মুদ্রিত কীবোর্ড বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি হয়েছে। এ সময়ে শুধু বৈধভাবে আমদানী হয়েছে ২২ লাখ ৬৩ হাজার। ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালের কোনো হিসাব কোথাও নেই। সেই সময়েও আরও অন্তত ৩০/৫০ লাখ আমদানি হয়ে থাকতে পারে।দেশের কোন মেধাজাত পণ্য এখন পর্যন্ত এমন একটি রেকর্ড তৈরি করতে পারেনি।

Bijoy Bayanno_techshohor

টেক শহর : বিজয়ের কি কি অর্জন রয়েছে?

মোস্তাফা জব্বার : এ পর্যন্ত বিজয় দেশ-বিদেশে অর্জন করেছে অসাধারণ সফলতা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সেরা সফটওয়্যারের পুরস্কার থেকে শুরু করে আমাকে এসোসিওর সম্মাননা পাইয়ে দেবার কৃতিত্ত্ব বিজয়-এর। বেষ্টওয়ে পুরষ্কার বা পিআইবি সোহেল সামাদ পুরষ্কার কিংবা নেত্রকোণার গুণীজন সম্মাননা সব কিছুর পেছনে রয়েছে এর অবদান।

টেক শহর : অভ্রর সাথে বিজয়- এর বিরোধ সংক্রান্ত অভিযোগ ও মামলার অগ্রগতি কি?

মোস্তাফা জব্বার : অভ্রর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। তারা কপিরাইট লঙ্ঘন করেছিল। সে কারণে আমি শুধু একটি অভিযোগ করেছিলাম। পরবর্তীতে অভ্র কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভুল বুঝতে পারে ও লেআউট সরিয়ে নেয়। এটি নিয়ে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই।

টেক শহর : আগামীতে ‘বিজয়’ নিয়ে কি ধরণের পরিকল্পনা রয়েছে?

মোস্তাফা জব্বার : সামনের দিনগুলোতে সফটওয়্যারটিতে বাংলা ব্যাকরণ, অভিধান, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিডার ও নতুন নতুন ফন্ট যোগ করা হবে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, পিসিসহ নতুন নতুন ডিজিটাল যন্ত্রের সকল ধরনের অপারেটিং সিস্টেমে বিজয় ব্যবহারের চেষ্টা করা হবে।

Related posts

*

*

Top