Maintance

লাখ টাকার ডেল ইন্সপাইরন১৫ ৭৫৬৭, হতাশ করবে না গেইমারদের

প্রকাশঃ ২:২৫ পূর্বাহ্ন, জুলাই ২১, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, জুলাই ২৯, ২০১৭

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : নির্দিষ্ট জায়গায় বসে ডেস্কটপে কাজ করা কিংবা গেইম খেলার প্রবণতা কমছে। কাজের প্রয়োজনে এবং নানান বাস্তবতায় অনেকেই গেইমিং ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকছেন। তবে বাজেট নিয়ে এক ধরনের দোটানা থাকেই।

যারা মাঝারি দামের বা এক লাখ টাকার আশেপাশে তেমন ভালো কোনো গেইমিং ল্যাপটপ পাচ্ছেন না, চলতি বছর তাদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে ডেল।

তবে লাখ টাকাকে মাঝারি বাজেট বলা যায় কিনা এটা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। তাদের জন্য বলে রাখা ভালো, ইতোমধ্যে বাজারে গেইমিংয়ের জন্য দুই থেকে ছয়, এমনকি সাত লাখ টাকার ল্যাপটপও রয়েছে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে লাখ টাকার মধ্যে ডেল এনেছে ইন্সপাইরন ১৫-৭৫৬৭ মডেলের ল্যাপটপ। এটির আদ্যোপান্ত দেখা যাক এ রিভিউতে।

এক নজরে ডেল ইন্সপাইরন ১৫-৭৫৬৭

  • ১৫.৬ ইঞ্চি আল্ট্রা এইচডি আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লে
  • ইন্টেল কোর আই ৭, ৭ম প্রজন্মের ৭৭০০এইচকিউ মডেলের ২.৮ গিগাহার্জ গতির কোয়াডকোর প্রসেসর
  • ১৬ জিবি ডিডিআর৪ র‌্যাম, আরও ১৬ জিবি র‌্যাম লাগানোর ব্যবস্থা
  • ২৫৬ জিবি পিসিআই এক্সপ্রেস এসএসডি ও ১ টেরাবাইট সাটা ৫৪০০ আরপিএম হার্ডড্রাইভ
  • এনভিডিয়া জিফোর্স জিটিএক্স ১০৫০টিআই গ্রাফিক্স প্রসেসর, ৪ জিবি জিডিডিআর৫ ভির‌্যাম
  • তিনটি ইউএসবি ৩ পোর্ট, ইউএসবি টাইপ- সি পোর্ট নেই
  • একটি এইচডিএমআই পোর্ট, কম্বো অডিও জ্যাক
  • ইথারনেট পোর্ট ও এসডি কার্ড রিডার
  • ৭৪ ওয়াট-আওয়ার ব্যাটারি
  • ২.৭৫ কিলোগ্রাম ওজন

ডিজাইন

নামিদামি সব ব্র্যান্ড এখন গেইমিং ল্যাপটপ এনেছে। এইচপি ওমেন সিরিজের মতো ডেল ইন্সপাইরনও ম্যাট ব্ল্যাক চ্যাসিসের ওপর লাল ডিজাইন করা। এর ওপরে রয়েছে লাল রঙের লোগো, সামনে লাল ভেন্ট গ্রিল ও পেছনেও লাল ভেন্ট। লাল রঙের ব্যবহার রয়েছে কিবোর্ড ব্যাকলাইটেও।

এ ছাড়া পুরো ল্যাপটপেই ম্যাট ব্ল্যাক ফিনিশ দেওয়া হয়েছে। কোনাগুলো কিছুটা গোলাকৃতির ও সচরাচর হাত রাখার মতো জায়গাগুলোতে রাবার কোটিং দেওয়ায় ডিভাইসটি ধরে রাখা বেশ আরামদায়ক। দীর্ঘ সময় টাইপ করা বা গেইমিংয়ের জন্য বেশ উপযুক্ত। 

পোর্টের দিক থেকে যদিও এটি কিছুটা হতাশ করেছে। বেশ বড়সড় হওয়ায় আরও পোর্ট দেওয়া যেত। ৭ম জেনারেশনের গেইমিং ল্যাপটপে ইউএসবি ৩.১ পোর্ট নেই। এ দুই বিষয় মেনে নেওয়া গেলেও ইউএসবি টাইপ সি ও থান্ডারবোল্ট ৩ পোর্টের অনুপস্থিতি মেনে নেয়া কষ্টকর হবে।

ডান পাশে রয়েছে দুটি ইউএসবি ৩ পোর্ট, হেডফোন জ্যাক, এইচডিএমআই পোর্ট ও ইথারনেট জ্যাক, বামে একটি ইউএসবি ৩ পোর্ট, পাওয়ার জ্যাক ও এসডি কার্ড রিডার ছাড়া আর কোনও পোর্ট দেওয়া হয়নি। 

সব মিলিয়ে, ডিজাইনের দিক থেকে ল্যাপটপটি মাঝারি। তেমন সুন্দরও নয়, আবার ব্যবহারে সমস্যাজনক হবে এমনও নয়।

পারফরমেন্স

কেবি লেইক সিরিজের কোর আই৭ প্রসেসরের ল্যাপটপটি দুর্দান্ত পারফরমেন্স দিতে সক্ষম। ২.৮ গিগাহার্জ গতির কোয়াডকোর প্রসেসরটি প্রয়োজনে ৩.৮ গিগাহার্জ পর্যন্ত টার্বো করতে পারে ।

সিনেবেঞ্চ বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, এটি ৭২০-৭৪০ পর্যন্ত স্কোর করতে সক্ষম। অর্থাৎ ডেস্কটপ কোর আই৫ প্রসেসরের সমান পারফরমেন্স পাওয়া যাবে এ প্রসেসর থেকে।  

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ল্যাপটপের ক্ষেত্রে প্রসেসরের তাপ সঠিকভাবে বের করে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে অনেক ল্যাপটপ টানা ভারি কাজ করার সময় প্রসেসর অতিরিক্ত গরম হলে গতি কমে যায়। সমস্যাটি ডেল ইন্সপাইরনে পাওয়া যায়নি।

গেইমিং বা ভিডিও এডিটিংয়ের মতো কাজ করার সময় স্পিড কমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।

১৬ জিবি র‌্যাম গেইমিংয়ে বাধা না হলেও ভবিষ্যতে হতে পারে। তাই কেনার সময়ই সম্ভব হলে আরও ১৬ জিবি র‌্যাম সংযোজন করে নেওয়া ভালো। তবে র‌্যামের গতির কারণে সিস্টেমটি ধীরগতির হবার আশঙ্কা নেই। যদিও ভিডিও রেন্ডারিং বা ফটোশপের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল চ্যানেল র‌্যাম কিছুটা গতি কমিয়ে দেয়।

স্টোরেজের ক্ষেত্রে রয়েছে ২৫৬ জিবি এসএসডি। গেইম বা বড় ফাইল রাখার জন্য রয়েছে ১ টেরাবাইট হার্ডডিস্ক।

এসএসডিটি পিসিআই এম.২ স্টাইলের, যেটির রিড ও রাইট স্পিড যথাক্রমে ৪৮৫ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ড ও ৪২২ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ড।

হার্ডডিস্কটিও খুব স্লো নয়, ১১৬ মেগাবাইট রিড ও ১১৪ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে রাইট করতে সক্ষম।

এসএসডিটি এনভিএমই স্টাইলের হলে অনায়াসে ১ জিবি প্রতি সেকেন্ডে রিড ও রাইট করা যেত। এতে কিছুটা পুরোনো স্টাইলের হার্ডওয়্যারের ট্রেন্ড থাকলেও দৈনন্দিন কাজে স্লো পারফরমেন্স দেখা যায়নি।

শুধু হাই কোয়ালিটি ফোর-কে রেজুলেশনের ভিডিও এডিটিংয়ের বেলার এসএসডিটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। 

গেইমিং ল্যাপটপের মূল আকর্ষণ এর জিপিউ। এতে ব্যবহার করা হয়েছে জিটিএক্স ১০৫০টিআই। এনভিডিয়ার এ মুহূর্তের মাঝারি পারফরমেন্সের ডেস্কটপ জিপিউটিই সরাসরি ল্যাপটপটিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

এতে করে গেইম ১০৮০পি রেজুলেশনে মিডিয়াম বা হাই গ্রাফিক্স সেটিংয়ে অনায়াসে ৬০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে খেলা যাবে। গ্রাফিক্স চিপটির সঙ্গে  দেওয়া হয়েছে ৪ জিবি ভির‍্যাম।

এগুলোর কারণে গেইমের ড্র ডিস্টেন্স বা টেক্সাচার বাড়াতে সমস্যা নেই। ভিডিও রেন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রেও ভির‌্যাম নিয়ে সমস্যা হবে না। ভিআর হেডসেট চালানোর জন্য অবশ্য উপযুক্ত নয় ল্যাপটপটি।

সব মিলিয়ে, ডেল ইন্সপাইরন ৭৫৬৭ মাঝারি থেকে ভারি কাজ ও গেইমিং দুটোর জন্যই প্রস্তুত।

ডিসপ্লে

আল্ট্রা এইচডি রেজুলেশনের প্যানেলটির পিক্সেল ঘনত্ব চমকপ্রদ। সমস্যা হচ্ছে চমকের শেষ এখানেই। ৬০ হার্জ রিফ্রেশ রেইটের ডিসপ্লেটির রেসপন্স টাইম প্রায় ২৮ মিলিসেকেন্ড, যা ই-স্পোর্টস ঘরানার গেইম- যেমন কাউন্টারস্ট্রাইক খেলোয়াড়দের জন্য বেশ সমস্যা।

প্যানেলটির কন্ট্রাস্টেও বেশ ঘাটতি রয়েছে, বিশেষত ব্ল্যাকের পরিমাণ হতাশাজনক।

ব্রাইটনেসের ঘাটতি ও তীর্যক আলোতে ব্যবহারে সমস্যা হাতে হাত রেখে চলে। এ ক্ষেত্রে ম্যাট ফিনিশের ডিসপ্লেটি কিছুটা শেষ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।

সবশেষে, ডিসপ্লেটি মাত্র ৫৫ শতাংশ এসআরজিবি কালার দেখাতে সক্ষম, যা ফটো বা ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য উপযোগি নয়।

ডিসপ্লের ঘাটতি নিয়ে বড় ধরনের সমালোচনা করার আগে আমাদের ভাবতে হবে এর ক্রেতা কারা।  ধরে নেওয়া যেতে পারে সাধারণ গেইমার, যারা প্রফেশনাল লেভেলে গেইম খেলেন না বা পেশাগত ভাবে ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি করেন না তাদের জন্য এটি তৈরি।

সেক্ষেত্রে পিক্সেল ঘনত্ব, আইপিএস ডিসপ্লের খুবই ভালো ভিউইং অ্যাঙ্গেল ও ডিসপ্লেতে বাঁচানো খরচ অন্যত্র ব্যবহার তেমন একটা খারাপ নয়। কেননা এ দামে আরও ভালো ডিসপ্লের ল্যাপটপ কিনতে হলে পারফরমেন্স, বিশেষত গ্রাফিক্স প্রসেসর বিসর্জন দিতে হবে।

থার্মাল ডিজাইন

ডেল বেশ গর্বের সাথে দাবি করে ল্যাপটপটির ক্ষেত্রে তারা বিশেষভাবে ডিজাইন করা হিট পাইপ ও ফ্যান ব্যবহার করেছে। ব্যবহারের সময় এ দাবি মিথ্যে মনে হয়নি। বিশেষত টানা প্রসেসর ও গ্রাফিক্স চিপে চাপ প্রয়োগের পরও হাত রাখার স্থানে অতিরিক্ত তাপ বা থার্মাল থ্রটোলিং দেখা যায়নি।

ফ্যানের শব্দও অনান্য গেইমিং ল্যাপটপের চাইতে কম। 

কিবোর্ড ও  টাচপ্যাড 

ল্যাপটপটিতে চিকলেট স্টাইলের কিবোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। সিজর স্টাইলের কি-গুলোর ট্রাভেল হালের বাটারফ্লাই স্টাইলের চাইতে বেশি হলেও আরও কিছুটা গভীরতা থাকলে টাইপিংয়ে বেশি আরাম পাওয়া যেত।

কি-রেসপন্স বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুবই ভালো হলেও লম্বা কি-গুলোর ক্ষেত্রে ফিডব্যাক কিছুটা স্পঞ্জের মতো।

যারা ল্যাপটপের কিবোর্ডে লিখে অভ্যস্ত তাদের এ কিবোর্ডে অল্প কিছুটা সময় লাগবে পুরোদমে টাইপ করতে। কিবোর্ডটিতে দুটি পর্যায়ের ব্যাকলাইট রয়েছে। সেটির রঙ বদলানোর উপায় নেই। টাইপিংয়ের সময় তেমন আওয়াজও নজরে আসেনি।

এ ছাড়া ছোট আকৃতির অ্যারো কি গেইমিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা করতে পারে। সব মিলিয়ে, ল্যাপটপটির কিবোর্ড অল্প কিছু ত্রুটি ছাড়া সবদিক থেকেই যথেষ্ট ভালো।

অন্যদিকে অমসৃন প্লাস্টিকে তৈরি টাচপ্যাডটি দেখতে খুব সুন্দর না হলেও কাজের ক্ষেত্রে খুবই রেসপন্সিভ ও অ্যাকুরেট। একেবারে কোনায় টাচ করার সময়ও এটি টাচ অ্যাকুরেসি নিয়ে কোনও ঝামেলা করেনি।

টাচপ্যাডটির নিচের অংশে অবস্থিত ক্লিক বাটন দুটি সহজে প্রেস করা গেলেও বরাবরের মতই বাটন থেকে দূরে আঙুল রেখে প্রেস করার সময় বেশ বেগ পেতে হবে।

ব্যাটারি লাইফ

অন্যান্য গেইমিং ল্যাপটপের চাইতে এর ব্যাটারি লাইফ বেশ ভালো। হালকা কাজ করার সময় এটি অনেক আল্ট্রাবুকের সমান ব্যাটারি লাইফ দেখিয়েছে।

সাধারণ ওয়েব ব্রাউজিংয়ে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা, ভিডিও দেখার সময় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা এবং আইডলে ১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারি লাইফ পাওয়া যাবে।

গেইমিংয়ের সময় এরূপ ব্যাটারি লাইফ পাওয়া যাবে না। ১ থেকে ২ ঘণ্টার মাঝেই চার্জ পুরোটাই শুষে নেবে প্রসেসর ও গ্রাফিক্স কার্ড।

পরিশেষ

গেইমিং ল্যাপটপের তুলনায় মাঝারি দামের এ নোটবুক দুটি কাজই সুন্দরভাবে করতে সক্ষম। চলার পথে বেশ হালকা, মজবুত ও দীর্ঘ ব্যাটারির কম্পিউটার হিসেবে কাজে দেবে। অন্যদিকে বাসায় বা অফিসে চার্জে লাগানো ভারি কাজের ও গেইমিংয়ের জন্য প্রস্তুত ওয়ার্ক স্টেশন।

সেই বিচারে এর মূল্য খুব বেশি বলা যাবে না। তা ছাড়া, সহজেই র‌্যাম ও এসএসডি বাড়ানোর ব্যবস্থা, দামি ডিজাইন (যা ক্লাসরুম থেকে বোর্ডরুম-কোথাওই বেমানান নয়) ও বেশ হালকা পাতলা গড়ন অনেক আল্ট্রাবুকের ক্রেতারও মন জয় করবে।

এতসব বিবেচনার পর এটি কেনার আগে প্রায় একই মূল্যের আসুস রিপাবলিক অব গেমারস সিরিজ ও এইচপি ওমেন সিরিজের গেইমিং নোটবুকও দেখতে ভুলবেন না।

মূল্য

ল্যাপটপটির কোর আই৫ সিপিউ ও জিটিএক্স ১০৫০ জিপিউ সংস্করণটির দাম ৯১ হাজার টাকা।

এ ছাড়া কোর আই৭ ও জিটিএক্স ১০৫০টিআই সংস্করণটির দাম এক লাখ ১৫ হাজার টাকা বা এর বেশিও হতে পারে। শিগগির দেশের বাজারে এটি পাওয়া যাবে।

রিভিউটি তৈরি করেছেন টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর এস.এম. তাহমিদ

*

*

Related posts/