Maintance

নকিয়া ৩ : কমদামি অ্যান্ড্রয়েডে ভাবাবে ডিসপ্লে, চিপসেট

প্রকাশঃ ৩:৩৮ অপরাহ্ন, জুন ৫, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৩:০৪ অপরাহ্ন, জুন ১২, ২০১৭

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : সাম্রাজ্য হারানো নকিয়ার আটঘাট বেঁধে অ্যান্ড্রয়েডে পদার্পণ মূলত নকিয়া ৬ ফোনটি দিয়ে। তবে এর দাম যাদের কাছে বেশি মনে হয়েছে, তাদের মন ভরাতে নকিয়া ৩ মডেলের স্বল্পমূল্যের একটি ফোন এনেছে কোম্পানিটি।

এ ফোন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে অনেকের মধ্যে। ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার মতো কী ফিচার রয়েছে ফোনটিতে, সেটিই দেখে নেওয়া যাক।

nokia_3_review_thumb800

এক নজরে নকিয়া ৩

    • ৫ ইঞ্চি, ১২৮০*৭২০ পিক্সেল রেজুলেশনের আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লে
    • ডুয়াল ও সিঙ্গেল সিম দুটি সংস্করণেই রয়েছে
    • মিডিয়াটেক এমটি ৬৭৩৭, ১.৩ গিগাহার্জ গতির কর্টেক্স এ৫৩ কোয়াডকোর প্রসেসর
    • মালি টি৭২০এমপি২ জিপিউ
    • ২ জিবি র‌্যাম
    • অ্যান্ড্রয়েড ৭.০ নুগাট অপারেটিং সিস্টেম
    • ১৬ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজ, মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট
    • ৮ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপারচার ব্যাক ক্যামেরা
    • ৮ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপারচর ফ্রন্ট ক্যামেরা (সামনের ক্যামেরাতেও অটোফোকাস রয়েছে)
    • ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, জিপিএস, এনএফসি, এফএম রেডিও
    • মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট, ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক
    • ২৬৫০ মিলি-অ্যাম্পিয়ার আওয়ার ধারণক্ষমতার ব্যাটারি

ডিজাইন
স্বল্পমূল্যের মডেল হলেও, আগের মতোই নকিয়া বিল্ড কোয়ালিটি নিয়ে কোনো প্রকার আপোস করেনি। ফোনটির ফ্রেম বা শ্যাসি তৈরিতে ম্যাশিন করা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার হয়েছে। এ কারণে হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসটি মজবুত ও টেকসই, এমনই কথা মাথায় আসবে।

অবশ্য পেছনের প্যানেলে চোখ পড়লে এর দামের কথাটি মনে ভাসবে। পলিকার্বনেট প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাক প্যানেলের মান ভালো হলেও আর যাই হোক সম্পূর্ণ ধাতব বডির সমকক্ষ নয়।

nokia_3_1

চতুষ্কোন ফোনটির কোনাগুলো কিছুটা গোলাকৃতির করা হয়েছে। একই সঙ্গে এর পাশগুলোর ফিনিশও সম্পূর্ণ সমান না করে কিছুটা গোল রাখা হয়েছে যাতে হাতের সাথে সহজেই মানিয়ে যায়। এ ডিজাইন আগে আমরা লুমিয়া সিরিজে দেখেছি। যদিও এটির ডিজাইন লুমিয়ার মতো নয়।

তুলনামূলক ছোট সাইজের স্ক্রিন হওয়ার ফলে এক হাতে ব্যবহারে এখনকার প্রায় সকল ফ্যাবলেটের চাইতে অনেক সহজ।

পাওয়ার বাটন ও ভলিউম কি ডান পাশের বেশ উপরের দিকে দেওয়া হয়েছে। ফলে হঠাৎ করে ভলিউম বাটনে চাপ পড়ার আশঙ্কা কম। তবে ভলিউম নিয়ন্ত্রণের সময় বা স্ক্রিনশট নিতে বেশ অদ্ভুতভাবে ধরতে হবে।

nokia_3_3ফোনটির ওপরে রয়েছে হেডফোন জ্যাক, বাম পাশে সিম ও মেমোরি কার্ড স্লট এবং নীচে স্পিকার, মাইক্রোফোন ও মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, পেছনে পলিকার্বনেট প্যানেল ব্যবহার করা হলেও ফোনটির ফ্রেমের মাঝেও অ্যান্টেনা ব্যান্ড রয়েছে। এটি ডিজাইনের সময় সহজেই পেছনের প্লাস্টিকের নিচে স্থান দেওয়া যেত।

chorizo-2

ফোনটির ব্যাক প্যানেলের ওপরের মাঝ বরাবর রয়েছে এর উপবৃত্তকার ক্যামেরা বাম্প-যার ওপরের অংশে রয়েছে ক্যামেরা ও নিচে এলইডি ফ্ল্যাশ।

ক্যামেরার অংশটি দেখতে অনেকটাই মটো জি৪+ বা মটো জি৪ এর মতো; প্যানেলের মাঝ বরাবর নকিয়া লোগো না থাকলে দুটি গুলিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়।

সামনের ডিসপ্লের ঠিক ওপরের ডান কোনায় রয়েছে নকিয়া লোগো, মাঝে ইয়ারপিস ও বামে ফ্রন্ট ক্যামেরা। স্ক্রিনের নিচে রয়েছে ক্যাপাসিটিভ ন্যাভিগেশন বাটনগুলো।

নামে নকিয়া হলেও, ফোনটির সঙ্গে অন্যান্য চীনা নির্মাতাদের ডিজাইনের বেশ মিল রয়েছে। আমরা নকিয়ার কাছে আরও অসাধারণ ডিজাইন আশা করতেই পারি। তবে ‘ভেঙে যাওয়া’ একটি কোম্পানি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তাই এ মুহূর্তে এরচেয়ে বেশি কিছু দেখাতে হয়ত সক্ষম হয়নি।

ডিসপ্লে
৭২০ পিক্সেল রেজুলেশনের ৫ ইঞ্চি ডিসপ্লে ২০১৭ সালে বেশ বেমানান। একেবারে কম দামের ফোনেও চীনা নির্মাতারা আজকাল ১০৮০পিক্সেল ডিসপ্লে ব্যবহার করছে।

এক্ষেত্রে অবশ্য ৭২০ পিক্সেল ডিসপ্লে ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। পিক্সেলের পরিমাণ কম থাকায় ফোনের জিপিউ ল্যাগ কম।

র‌্যামে কম পরিমাণ ডাটা রাখার ফলে মাল্টিটাস্কিংয়ে সুবিধা ও সব মিলিয়ে চিপসেটের ওপর কম চাপ পড়ার ফলে ব্যাটারি লাইফ কিছুটা বেড়ে যায়।  

chorizo-1

ডিসপ্লেটির পিক্সেল ঘনত্ব কিছুটা কম হবার ফলে একই সঙ্গে দুটি অ্যাপ চালানাে, ভিআর কন্টেন্ট দেখা ও খুব কাছ থেকে টেক্সট পড়ার সময় কিছুটা সমস্যা হতে পারে। সেটি তেমন বড় কিছু নয়।

কম দামের ফোনে অনেক নির্মাতারাই টিএন প্যানেল ব্যবহারের ফলে কালার, কন্ট্রাস্ট, ব্রাইটনেস, তীর্যক আলোতে ব্যবহারের সুবিধা ও পাশ থেকে দেখার সুবিধায় বেশ খারাপ প্রভাব পড়ে। ফলে ৭২০ পিক্সেল প্যানেল বলতে চোখের সামনে যে বাজে ডিসপ্লেটি ভেসে ওঠে তার আসলে ৮০ শতাংশ দোষ প্যানেলের। রেজুলেশনে ঘাটতির নয়।

ব্রাইটনেস, কন্ট্রাস্ট ও ভিউইং অ্যাঙ্গেলের সমস্যা আইপিএস প্রযুক্তির প্যানেল ব্যবহারের কারণে প্রায় সম্পূর্ণই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। ডিসপ্লেতে পোলারাইজার ব্যবহারের ফলে প্রখর রোদেও ডিসপ্লেটি সহজেই দেখা যাবে।

সব মিলিয়ে, রেজুলেশনের ঘাটতি ছাড়া সবদিক থেকেই এগিয়ে রয়েছে নকিয়া ৩।

পারফরমেন্স
মিডিয়াটেক প্রসেসর ‘খুব ভালো’ পারফরমেন্স দেখাতে পারে না। শুরুতেই বলে দেওয়া যেতে পারে, যারা বাজেটের মাঝে গেইম খেলা বা অন্যান্য ভারি কাজ করার জন্য ফোন খুঁজছেন তারা নকিয়া ৩ লিস্ট থেকে বাদ দিতে পারেন।

অন্যদিকে যাদের ল্যাগ ছাড়া দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য একটি ফোন প্রয়োজন তাদের জন্য এমটি ৬৭৩৭ চিপসেটটি খারাপ নয়।

চারটি কর্টেক্স এ৫৩ কোর মাত্র ১.৩ গিগাহার্জ গতিতে চলার ফলে সিঙ্গেল কোর ও মাল্টি কোর দু’ক্ষেত্রেই ফোনটি অসাধারণ কোনো পারফরমেন্স দেখাতে পারেনি।

সিঙ্গেল কোর পারফরমেন্সের ঘাটতির ফলে অ্যাপ লোডিং, ফটো এডিটের মতো কাজ বেশ ধীর গতিতে হবে। ল্যাগ দেখা না গেলেও, কোনও কিছুই দ্রুততার সঙ্গে শেষ হবে না।

মাত্র চারটি কোর থাকায়, যার সবগুলো একই ধীরগতির হওয়ার ফলে মাল্টি-থ্রেডেড প্রসেস, অ্যাপ সুইচিং ও মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ল্যাগ দেখা যেতে পারে।

মালি টি৭২০এমপি২ জিপিউটি বেশ কয়েক বছর ধরেই নানা হ্যান্ডসেটে ব্যবহার হয়ে আসছে। ফলে এতে খেলা যাবে না এমন গেইম প্লে-স্টোরে নেই। তবে স্লো প্রসেসরের ফলে গেইমের লোডিং টাইম কিছুটা বেশি হবে।

জনপ্রিয় সকল গেইম ২০-৩০ এফপিএস এ খেলা যাবে। গ্রাফিক্স নিজ থেকেই লো সেটিংয়ে চলে যাবে।

দুই জিবি র‌্যাম ৭২০ পিক্সেল রেজুলেশনের ডিসপ্লের জন্য আজও চলনসই। এর থেকে যদিও খুব বেশি মাত্রার মাল্টিটাস্কিং ও ঘনঘন টাস্ক সুইচিং আশা করা যাবে না। অ্যান্ড্রয়েড নুগাটে একসঙ্গে স্ক্রিনে দুটি অ্যাপ চালানোর ব্যবস্থা থাকলেও সেটি ব্যবহারের মতো পারফরমেন্স চিপসেটটির নেই। এ ছাড়া র‌্যামের স্বল্পতাতো রয়েছেই।

সব মিলিয়ে পারফরমেন্স খারাপ নয়। স্ন্যাপড্রাগন চিপসেটে সেটি আরও ভালো হতে পারত। 

ক্যামেরা
বাজেট ফোনে সাধারণত তেমন ভালো ক্যামেরা দেওয়া হয় না। নকিয়া সেদিক থেকে চেষ্টা করেছে ক্যামেরাগুলো যাতে অন্তত ব্যবহারযোগ্য হয়। পেছনের ক্যামেরার রেজুলেশন খুব ভালো না হলেও অ্যাপারচার ও পিক্সেলের সাইজ বড় হবার ফলে নয়েজের পরিমাণ ছবিতে নিয়ন্ত্রণের মাঝেই রয়েছে।

আলোর পরিমাণ যথেষ্ট হলে বা দিনের বেলা বাইরের শটে শার্পনেসের পরিমাণ খুবই ভালো। ছবিগুলো জুম না করলে সোশ্যাল মিডিয়াতে সহজেই ব্যবহার করা যাবে।

হাইলাইট ও শ্যাডোর মাঝের ডিটেইলে পার্থক্য খুবই বেশি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্রায় সময়ই হাইলাইট ফেটে গিয়েছে, না হয় শ্যাডোর ডিটেইলে চরম ঘাটতি চলে এসেছে।

nokia_3_3

কালার ব্যালেন্সও কিছুটা পানসে মনে হয়েছে। ছবির বিষয়বস্তুতে একই রঙের ভিন্নমাত্রার শেড থাকলে ছবির পার্থক্য বোঝা কঠিন।

ছবির বড় অংশজুড়ে একই রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড, যেমন মাটি বা আকাশ থাকলে সেখানে কিছুটা নয়েজ দেখা গেছে। অন্ধকারে ছবিতে বেশ নয়েজ পাওয়া গেছে। তাই কম আলোয় ব্যবহার না করাই ভালো।

ফ্রন্ট ক্যামেরাটিতেও অটোফোকাস থাকাটা একটা বড় ফিচার। একই অ্যাপারচার ও রেজুলেশনের সেন্সর হওয়ার ফলে সেলফি ক্যামেরাটি তুলনামূলকভাবে ব্যাক ক্যামেরার চাইতে বেশি কাজের। যারা সেলফি ও ভ্লগ করে অভ্যস্ত তাদের বেশ কাজে আসবে ফোনটি।

nokia 3 cam1 nokia 3 cam2 nokia 3 cam3 nokia 3 cam4 nokia 3 cam5

ক্যামেরা স্যাম্পল ছবি জিএসএমএরিনার সৌজন্যে।

ব্যাটারি লাইফ

২৬৫০ এমএএইচ ধারণ ক্ষমতার ব্যাটারি ২০১৭ সালে এসে কম মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। চিপসেট অনুযায়ী এটি নিতান্তই কম নয়।

এর আগে রিলিজ হওয়া মিডিয়াটেক কোয়াডকোর ফোনগুলোতে ১৭০০ এমএএইচ ব্যাটারিও কাজ চালানোর মতো ব্যাকআপ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৪-৬ ঘণ্টা স্ক্রিন অন টাইম ও ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্ট্যান্ডবাই টাইম পাওয়া যাবে। ফার্স্ট চার্জিংয়ের অনুপস্থিতি বেশ ভাবাবে।

nokia_3_4

পরিশেষ ও দাম
নকিয়া ৩ দেশের বাজারে আসার কথা চলতি সপ্তাহেই। এইচএমডি গ্লোবাল ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। বাজেটে হ্যান্ডসেট আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর ফলে শেষ পর্যন্ত এ দাম থাকবে কিনা তা এখনও পরিষ্কার নয়।

এ হিসেবে শাওমি রেডমি সিরিজ, হুয়াওয়ে জি সিরিজ, মটোরোলার ই সিরিজ ও সামনে আসা সি সিরিজের সঙ্গে একে লড়তে হবে।

এক নজরে ভালো

      • বিল্ড কোয়ালিটি
      • মূল্য অনুসারে ক্যামেরা, বিশেষত ফ্রন্ট ক্যামেরা
      • সর্বশেষ ও স্কিনমুক্ত অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম

এক নজরে খারাপ

    • ডিসপ্লের রেজুলেশনে ঘাটতি
    • দুর্বল চিপসেট
    • ফিচার অনুযায়ী চড়া দাম

রিভিউটি তৈরি করেছেন টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর এস এম তাহমিদ

*

*

Related posts/