নকিয়া ৬ : বিল্ড কোয়ালিটি হার মেনেছে পারফরমেন্সের হতাশায়

এস এম তাহমিদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : একসময় নকিয়া ছাড়া আর কোনও ব্র্যান্ডের ফোন কেনার কথা কেউ তেমন চিন্তা করতো না। মূলত মজবুত, টেকসই ও প্রচুর ফিচারসমৃদ্ধ ফোন বাজারে এনে ফিনল্যান্ডের কোম্পানিটি সবার মন জয় করেছিল। তবে কালের আবর্তে, বেশ কিছু বাজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ব্র্যান্ডটি কদর হারাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটি মোবাইল ফোন কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় ।

তবে কিছুদিন আগে নকিয়ার কিছু পুরাতন কর্মী নতুন করে এ ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন বাজারে আনেন। নতুন ফোনটি নিয়ে হৈচৈও পরে যায়। এখন দেখে নেওয়া যাক এ ব্র্যান্ডের প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফ্ল্যাগশিপ ফোন নোকিয়া ৬-এর খুঁটিনাটি, যা ফ্যানদের আশাবাদী নাকি আশাহত করেছে।

একনজরে নকিয়া ৬

  • ৫.৫ ইঞ্চি, ১৯২০x১০৮০ পিক্সেল রেজুলেশন আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লে
  • ডুয়াল সিম
  • কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৪৩০, ১.৪ গিগাহার্জ গতির কর্টেক্স এ৫৩ অক্টাকোর প্রসেসর
  • অ্যাড্রিনো ৫০৫ জিপিউ
  • ৩ বা ৪ গিগাবাইট র‌্যাম
  • অ্যান্ড্রয়েড ৭.১.১ নুগ্যাট অপারেটিং সিস্টেম
  • ১৬ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপার্চার ব্যাক ক্যামেরা, ফেইজ ডিটেকশন অটোফোকাস ও ডুয়াল-টোন ফ্ল্যাশ
  • ৮ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপার্চার সেলফি ক্যামেরা
  • ১০৮০পি, ৩০এফপিএস ভিডিও ধারণক্ষমতা
  • ৩২ বা ৬৪ গিগাবাইট স্টোরেজ, মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট
  • ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, জিপিএস, রেডিও, এনএফসি
  • মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট ও ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক
  • সামনে অবস্থিত ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর
  • ৩০০০ মিলি অ্যাম্পায়ার ধারণক্ষমতার ব্যাটারি।

xxSp7j9GjvP4jK4xNR728b-1200-80

ডিজাইন
সাধারণত নকিয়ার সব ফোনের ডিজাইন কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী হলেও এক্ষেত্রে আর দশটি অ্যান্ড্রয়েডের থেকে নকিয়া ৬-এর ডিজাইনে তেমন পার্থক্য নেই। এটি তৈরিতে পুরোটাই অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বরাবরের মতই অন্য নকিয়ার মতো এতেও রয়েছে বেশ শক্তপোক্ত বডি।

ডিসপ্লের নিচে রয়েছে ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর, যার দুপাশে ক্যাপাসিটিভ কি ও স্ক্রিনের ওপরে রয়েছে ইয়ারপিস ও ডানে সেলফি ক্যামেরা এবং পাশে ব্র্যান্ডের লোগো।

o5m2vSYBT8tYbG9UVM6LBa-650-80

পেছনে ম্যাট ফিনিস দেওয়া হয়েছে। এতে আঙ্গুলের ছাপ বা অন্যান্য ময়লার দাগ তেমন চোখে পড়বে না। ক্যামেরা ও ফ্ল্যাশ ছাড়া পেছনে আর তেমন কিছু নেই।

ফোনটি তেমন পাতলা না হওয়ায় ক্যামেরা বাম্প থাকাটা বেশ অস্বাভাবিক। ক্যামেরা বাম্পের ডিজাইনে বেশ কিছুটা মটো জি৪-এর ক্যামেরার মিল রয়েছে।

এ ছাড়া ডান পাশে রয়েছে ভলিউম ও পাওয়ার বাটন, সিম ও মেমরি কার্ড ট্রে, ওপরে হেডফোন জ্যাক ও তলদেশে মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট ও স্পিকার গ্রিল।

44sCZ9ixuEeqCMCPSywHXa-650-80

সব মিলিয়ে, নকিয়ার কাছ থেকে সবাই যে বিল্ড কোয়ালিটি আশা করে, তার পুরোটিই রয়েছে এ মডেলে।

ডিসপ্লে
ফুল এইচডি আইপিএস ডিসপ্লের ফোনের কাতারে অবস্থান করলেও এটির ৫২২ নিট ব্রাইটনেস ও ১৩২৮:১ কন্ট্রাস্ট বাকি সব ডিসপ্লে থেকে আলাদা করেছে। যদিও ৫.৫ ইঞ্চি ডিসপ্লেটিতে ১০৮০পি রেজুলেশন ব্যবহারের কারণে পিক্সেল ঘনত্ব ভিআর কন্টেন্ট দেখার জন্য যথেষ্ট নয়।

রোদে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডিসপ্লেটি বেশ মাঝারি মানের হলেও ব্যবহারের অযোগ্য নয়। মূল সমস্যা বলা যেতে পারে ডিসপ্লেটির হোয়াইট ব্যালেন্স।

নিউট্রাল মোড বা কুল মোডে হোয়াইট ব্যালেন্স খুবই নীলচে মনে হবে। ওয়ার্ম মোডে অবশ্য ব্যালেন্সটি প্রায় পিউর হোয়াইটের কাছাকাছি চলে আসে।

সব মিলিয়ে, ডিসপ্লেটি আর দশটি মাঝারি মানের ফোনের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও খুব বেশি নয়।

পারফরমেন্স
নকিয়া ড-এ যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি হতাশ করার মতো তা হলো প্রসেসর। স্ন্যাপড্রাগন ৪০০ সিরিজের প্রসেসর সবসময়ই মাঝারি মূল্যের মাঝে মোটামুটি নিম্ন পারফরমেন্সের প্রসেসর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এখানেও ব্যাতিক্রম নয়।

প্রসেসরটিতে আটটি কোর থাকলেও সব কয়টি কোর-ই কর্টেক্স এ৫৩ ও ১.৪ গিগাহার্জ গতির হওয়ায় প্রসেসিং পারফরমেন্সে ফোনটি খুবই পিছিয়ে রয়েছে।

সিঙ্গেলকোর পারফরমেন্স স্বল্পগতির হওয়ায় অনেক মাঝারি মানের প্রসেসরের চেয়েও পিছিয়ে গিয়েছে। আটটি কোর থাকার কারণে যদিও মাল্টিকোর পারফরমেন্সে ফোনটি কিছুটা ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দেবে।

গ্রাফিক্সের দিক থেকে অ্যাড্রিনো ৫০৫ জিপিউটি বেশ নিম্নমানের। থ্রিডি-মার্ক অনুযায়ী জিপিউটি মাঝারি পারফরমেন্সের বেশ কিছুটা নিচের দিকে পরেছে। ফলে সকল গেমই ৩০ এফপিএসের উপর খেলার তেমন আশা নেই।

বেশ কিছু গেইম যেগুলোর গ্রাফিক্স কোয়ালিটি বদল করা সম্ভব, সেগুলো হাই গ্রাফিক্সে দেওয়ার পর ২০ এফপিএসের নিচে ফ্রেম-রেট পাওয়া গিয়েছে। এ কারণে বলা যেতে পারে, খুব দ্রুত ফোনটিতে আর এইচডি গেইম ভাল মতো খেলা যাবে না।

র‌্যামের স্বল্পতা না থাকায় মাল্টি-টাস্কিং ও টাস্ক সুইচিং নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। তবে প্রোগ্রাম লোড হওয়ার সময় সিঙ্গেল কোর পারফরমেন্সের ঘাটতি বেশ ভালভাবে টের পাওয়া যাবে। তার মানে এ নয়, ফোনটি স্লো- কিন্তু মূল্য অনুযায়ী যথেষ্ট দ্রুতগামী নয়।

সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, দৈনন্দিন স্মার্টফোন ব্যবহারে নকিয়া ৬ যথেষ্ট এগিয়ে থাকলেও গেমিং ও ভারি অ্যাপ্লিকেশন চালানাের মতো কাজে এটি বেশ পিছিয়ে। বিশেষত মূল্য অনুযায়ী পারফরমেন্স বেশ হতাশাজনক।

Nokia-6-camera-sample-4

ক্যামেরা
নোকিয়া ৬ এর পেছনে রয়েছে f/2.0 অ্যাপার্চার লেন্স সমৃদ্ধ ১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা সেন্সর, যা কাগজে কলমে বেশ ভাল ছবি তুলতে সক্ষম হলেও বাস্তবে ক্যামেরাটি বেশ আশাহত করেছে।

ক্যামেরা অ্যাপ্লিকেশনটি সম্পূর্ণ নকিয়ার নিজস্ব ডিজাইনের। অনেকের কাছেই এটি প্রয়োজনের তূলনায় অতিরিক্ত সাধাসিধে মনে হতে পারে। হাতে গোনা কয়েকটি সেটিং ছাড়া তেমন কিছুই সহজে বদলে নেওয়ার উপায় নেই।

সেটিংসের ভেতরে একটু ঘাটলে অ্যাডভান্সড মোড পাওয়া গেলেও ম্যানুয়াল মোডের অভাব রয়েই গেছে। ম্যাক্রো, ইনফিনিট ও অটো ফোকাস ছাড়া ফোকাসিংয়ের আর কোনও অপশন নেই। নেই আইএসও ও এক্সপোজার সেট করে দেওয়ার সুবিধাও।

এসব বিপরীতে গাইডলাইন, এক্সপোজার ভ্যালু সেট করার সুবিধা কিছুটা কাজের বলা যেতে পারে।

রেজুলেশনের ঘাটতি না থাকার ফলে ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিগুলোতে ডিটেইলের পরিমান বেশ ভাল। এইচডিআর মোডে ছবি তুললে সেগুলোতে ডাইনামিক রেঞ্জে তেমন পার্থক্য না হয়ে উল্টো ডিটেইল কিছুটা কমে যায়। তাই এ মোড ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

ক্যামেরাটির মূল সমস্যা বলা যেতে পারে কালার ব্যালেন্স – প্রায় প্রতিটি রঙই ছবিতে বেশ অনুজ্জ্বল ও কন্ট্রাস্টের বেশ ঘাটতি রয়েছে। ফলে ছবি তোলার পর সেগুলোকে এডিট করা ছাড়া গতি নেই।

সেলফি ক্যামেরার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা বিরাজমান। অবশ্য ৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার শটগুলো সেলফি হিসেবে যথেষ্ট ভালো।

ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ক্যামেরাটি সর্বোচ্চ ১০৮০পি রেজুলেশনে ৩০ এফপিএস ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম। ৭২০পিতে ৬০ এফপিএস ও ৪৮০পিতে ৯০ এফপিএস পর্যন্ত ভিডিও করা যাবে।

ক্যামেরার স্থিরচিত্রের তূলনায় ভিডিওতে বেশ ভাল ডিটেইল ও ডাইনামিক রেঞ্জ পাওয়া গেছে। বলা যেতে পারে স্থির চিত্রধারণের চেয়ে ভিডিও ধারণে বেশে উপযোগী ফোনটি।

সাউন্ড কোয়ালিটি
মাঝারি রেঞ্জের হওয়ার পরও ফোনটি সাউন্ড কোয়ালিটির দিক থেকে বেশ এগিয়ে রয়েছে। স্টেরিও স্পিকারের কল্যাণে ভিডিও দেখা বা স্পিকারে গান শোনার মতো কাজও এর মাধ্যমে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে হেডফোনে একমাত্র অল্পবিস্তর ভলিউমের অভাব ছাড়া আর কোনও ঘাটতি দেখা যায়নি। স্টেরিও ক্রসটক বা সিগন্যাল টো নয়েজ রেশিও অন্যসব মাঝারি মূল্যের ফোনের চেয়ে বহুগুনে এগিয়ে রয়েছে।

যারা মিউজিক একটু কম ভলিউমে শুনতে পছন্দ করেন, তারা ফোনটি কিনে ফেলতে পারেন।

ব্যাটারি লাইফ
আজকাল তিন হাজার মিলি অ্যাম্পায়ার ধারণক্ষমতার ব্যাটারি ৫.৫ ইঞ্চি ডিসপ্লের ফোনে কিছুটা কম মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ব্যাটারি লাইফ পরীক্ষায় সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

কিছুটা কম শক্তিশালী প্রসেসর ব্যবহার করায় ফোনটি ৭-৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্ক্রিন অন টাইম দিতে সক্ষম, যা সর্বাধিক শক্তিশালী অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তূলনায় খুব একটা বেশি নয়।

স্ট্যান্ডবাই টাইমে অবশ্য নকিয়া ব্র্যান্ডের মর্যাদা ধরে রেখেছে। হালকা ব্যবহারে দু’দিন নিশ্চিন্তে চালানো যাবে।

vLoGnpL6vx8nEnCCCiqzaa-650-80

পরিশিষ্ট
বিল্ড কোয়ালিটি, ব্র্যান্ড নিশ্চয়তা ও দ্রুত অপারেটিং সিস্টেম আপডেট থাকার পরও ক্যামেরার কোয়ালিটিতে কিছুটা ঘাটতি ও পারফরমেন্সে অনেক ঘাটতি থাকায় দাম অনুযায়ী এটি কেনা কতটা যৌক্তিক তা একটু তুলনা করলেই নতুন ক্রেতাদের কাছেও পরিস্কার হবে।

তবে যারা নকিয়ার অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জন্য আজ অবধি অপেক্ষা করে আছেন, তারা শখ পূরণের জন্য এতক্ষণ হয়ত বসেও নেই।

মূল্য : দেশে গ্রে-মার্কেটে ওয়ারেন্টি ছাড়া ফোনটি ২৫,০০০ থেকে ২৭,০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

একনজরে ভালো

  • অসাধারণ বিল্ড কোয়ালিটি
  • সর্বশেষ অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ
  • উন্নতমানের সাউন্ড

একনজরে খারাপ

  • পারফরমেন্সে অনেক ঘাটতি
  • ক্যামেরার মানে শংশয়
  • অতিরিক্ত মূল্য

Related posts

*

*

Top