রেডমি৪ প্রাইম : মাঝারি বাজেটে বেশ, হতাশা ক্যামেরায়

প্রকাশঃ ৬:৩৩ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৩৯ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৭

এস এম তাহমিদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : স্বল্প মূল্যে ভালো স্পেসিফিকেশনের ফোন গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়ার কারণে শাওমির রেডমি সিরিজটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ সিরিজের সর্বশেষ ফোনগুলোর একটি হচ্ছে রেডমি ৪ প্রাইম, যা মূলত মাঝারি মূল্যের বলা যেতে পারে।

তবে ফোনটি এর মূল্যের চেয়ে স্পেসিফিকেশনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্পেসিফিকেশনই সবসময় শেষ কথা নয়- অতীতে অনেক বারই দেখা গিয়েছে। এ ফোনের ক্ষেত্রেও সেটি খাটে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। 

চলুন দেখা যাক রেডমি নোট ৩ প্রো-এর মতো রেডমি ৪ প্রাইমও ব্যবহারকারীদের মন জয় করার মত কিনা।

এক নজরে শাওমি রেডমি ৪ প্রাইম

  • ৫ ইঞ্চি ডিসপ্লে, ১৯২০x১০৮০পি রেজুলেশন, আইপিএস এলসিডি প্যানেল
  • কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৬২৫ প্রসেসর, ৮টি কর্টেক্স এ৫৩ কোর- যা ২ গিগাহার্জ গতিতে চলতে সক্ষম
  • অ্যাড্রিনো ৫০৬ জিপিউ
  • ৩ গিগাবাইট র‌্যাম, ৩২ গিগাবাইট স্টোরেজ, মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট
  • ডুয়াল সিম, তবে ২য় সিম ব্যবহারে এসডি কার্ড ব্যবহার করা যাবে না (হাইব্রিড স্লট)
  • ১৩ মেগাপিক্সেল, f/2.2, ফেজ ডিটেকশন অটোফোকাস ব্যাক ক্যামেরা, ডুয়াল টোন ফ্ল্যাশ
  • ৫ মেগাপিক্সেল, f/2.2 সেলফি ক্যামেরা
  • ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, এফ এম রেডিও, জিপিএস
  • মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট
  • পেছনে ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর
  • ৪১০০ এমএএইচ ব্যাটারি খোলা যাবে না
  • অ্যান্ড্রয়েড ৬.০.১ মার্শমেলোর ওপর তৈরি মিইউআই ৮.০ অপারেটিং সিস্টেম

redmi4-prime-techshohor

ডিজাইন
ডিজাইনের দিক থেকে ফোনটি আগের রেডমি ৩-এর থেকে বেশ আলাদা। এটির সঙ্গে হুয়াওয়ের মেট৮ মিনির অনেক মিল রয়েছে। তবে রেডমি নোট ৩ বা ৪ এর সঙ্গেও কিছুটা মিল পাওয়া যাবে।

সম্পূর্ণ উচ্চমানের অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি ফোনটির পেছনে রয়েছে ক্যামেরা। ঠিক এর নিচেই একই সমান চক্রাকার ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সরটি খুঁজে পাওয়া যাবে। ক্যামেরার বাম পাশে রয়েছে ফোনটির ডুয়াল-টোন এলইডি ফ্ল্যাশ।

ডান পাশে রয়েছে ভলিউম ও পাওয়ার বাটন ও বাম পাশে ডুয়াল সিম ও মেমরিকার্ড স্লট- হাইব্রিড ট্রে। ফোনটির তলদেশে রয়েছে মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট, মাইক্রোফোন, স্পিকার এবং উপরে রয়েছে নয়েজ ক্যান্সেলিং মাইক ও হোডফোন জ্যাক।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফোনটিতে আইআর এমিটার রয়েছে – ফলে টিভি, এসি ফোন থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

redmi41

৫ ইঞ্চি ডিসপ্লের ফোনের উপরের দিকে রয়েছে কথা বলার স্পিকার, সেলফি ক্যামেরা, প্রক্সিমিটি সেন্সর। নিচে রয়েছে ক্যাপাসিটিভ কীগুলো। সর্বোপরি, ফোনটি হাতে নিলে কোনওভাবেই প্রিমিয়াম বিল্ড চিন্তা না করার কোনও কারণ নেই।

redmi43

পারফরমেন্স
এক কথায় বললে, ফোনটির দাম ও পারফরমেন্স দুটোই মিড রেঞ্জের। এর মানে এটি ব্যবহারে ল্যাগ বা হ্যাং হবার সম্ভাবনা বেশ কম। আবার ভারি গেইম খেলার সময় গতিময় পারফরমেন্স আশা করা বোকামি। তবে আর যাই হোক, র‌্যামের স্বল্পতায় পরতে হবে না কখনই।

ফোনটিতে ব্যবহৃত কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৬২৫ প্রসেসরটিতে ৮টি ৬৪বিট কর্টেক্স এ৫৩ কোর ব্যবহার করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ ২ গিগাহার্জ গতিতে চলতে সক্ষম। ৮টি কোর হলেও, কোনও কর্টেক্স এ৭২ কোর না থাকার ফলে প্রসেসরটি স্ন্যাপড্রাগন ৬৫০ বা ৬৫২এর চাইতে কম কাজ করবে।

তবে সেটি দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না। এটির গিকবেঞ্চ স্কোর নিচে দেয়া হলো।

remi45

প্রসেসর ছাড়াও ফোনের অন্যতম অংশ এর জিপিউ। এতে ব্যবহার করা অ্যাড্রিনো ৫০৬ জিপিউটির স্ক্রিন রেজুলেশন ও মাঝারি মানের গেমিং চালিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। প্লে স্টোরের যে কোনও গেম কোনও ল্যাগ ছাড়াই চলবে। তবে যেসব গেমে গ্রাফিক্স বাড়ানো বা কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে গ্রাফিক্স হাই না দেয়াই ভাল। 

অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনার সময় আজকাল প্রায় সবাই ফোনের র‌্যাম সমস্যা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। সেটি চিন্তা করেই শাওমি রেডমি ৪ প্রাইমে ৩ গিগাবাইট র‌্যাম ব্যবহার করেছে – ফলে মাল্টিটাস্কিং নিয়ে কোনও সমস্যা নেই।

মনে রাখা ভালো শাওমির নিজস্ব মি-ইউআই ইন্টারফেসটি বেশ র‌্যাম খাদক – ফলে ওয়ানপ্লাস, মটোরোলা বা নেক্সাস ফোনগুলোর ৩ গিগাবাইট র‌্যামের মতো পারফরমেন্স এতে পাওয়া না গেলেও পার্থক্য অনেক কম।

ফোনের স্টোরেজের স্পিড নিয়ে কেউই তেমন মাথা না ঘামালেও এটির ওপরেই কিন্তু অ্যাপ লঞ্চ করার সময় বা ইন্সটল করার সময় নির্ভর করে।

অনেকেই দেখে থাকবেন, পিসির ক্ষেত্রে হার্ডডিস্কের বদলে এসএসডির ব্যবহারে সেটির কাজের গতি অনেক বদলে যায়। একই ব্যাপার ফোনের ক্ষেত্রেও প্রজোয্য। সেদিক থেকে রেডমি ৪ প্রাইম মাঝারি পারফরমেন্স দিতে সক্ষম। মূল্য অনুযায়ী যেটি যথেষ্ট।

ফোনের সবকিছু মিলিয়ে পরীক্ষা করার বেঞ্চমার্ক আনটুটুর স্কোর নিচে দেয়া হলো।

redmi42

অন্যান্য ফিচার
ডিসপ্লে: শাওমি ডিসপ্লের ব্যাপারে তেমন খরচ কমায়নি, ফলে ৫ ইঞ্চি ফুল এইচডি ডিসপ্লেটির কালার, ব্রাইটনেস, কন্ট্রাস্ট – কোনও অংশেই কোনও কমতি নেই। তবে মাঝারী মূল্যের একটি ডিভাইসের কাছ থেকে সবকিছুই সমান ভাল হবে সেটি আশা করা ভূল, এ ক্ষেত্রে সেটি দেখা গিয়েছে ফোনটির সরাসরি রোদের মধ্যে ব্যবহারের সময়। তবে উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে ব্যবহার করলে ফোনটির ডিসপ্লেটির তেমন কোনও খুঁত পাওয়া যাবেনা।

ব্যাটারি লাইফ: ফোনটিতে শাওমি ৪১০০ এমএএইচ ধারণক্ষমতার ব্যাটারী ব্যবহার করেছে। এই বিশাল ব্যাটারী সমৃদ্ধ ফোন যে ব্যাটারী লাইফের রাজা হবে সেটি কাউকে বলে দিতে হবে না।

ফোনটির প্রসেসর ও ফুল এইচডি ডিসপ্লে ব্যাটারীতে রেডমি ৩ এর চাইতে কিছুটা বেশী ভাগ বসালেও, অন্তত ৮ ঘন্টা টানা ব্যবহার বা স্ক্রীন অন টাইম পাওয়া যাবে – যা স্ট্যান্ডবাই টাইমের সাথে মিলিয়ে চিন্তা করলে বলা যেতে পারে অন্তত একটি পুরো দিন ভারী ব্যবহার ও ২ দিন মাঝারী ব্যবহার আশা করা যেতে পারে।

অডিও কোয়ালিটি: তলদেশে অবস্থিত স্পীকারটি কোয়ালিটি বা ভলিউম-  কোনও দিক থেকেই সবার নজর কাড়বেনা, তবে সেটি অস্বাভাবিক নয়।

হেডফোনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে ফোনটির অডিও আউটপুট খুবই পরিষ্কার, ভলিউমের কোনও কমতি নেই ও সাউন্ড বাড়ানোর পরেও ফেটে যাওয়ার প্রবনতা একেবারেই নেই। বলা যেতে পারে, মাঝারী থেকে বেশী বাজেটের ফোনের মাঝে এটি সবচাইতে ভাল সাউন্ড কোয়ালিটির ফোনগুলোর একটি। সঙ্গীত প্রেমীরা চোখ বুজে ফোনটি কিনে ফেলতে পারেন।

ক্যামেরা: স্মার্টফোনের অন্যতম দায়িত্বের একটি বলা যেতে পারে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা, তবে সেদিক থেকে রেডমি ৪ প্রাইম কিছুটা হতাশ করবে। প্রথমত, পূর্বের রেডমি ৩ ফোনটিতে f/2.0 ক্যামেরা লেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল, রেডমি ৪ এর ক্ষেত্রে যেটি  f/2.2 এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে ক্যামেরাটির লো লাইট পার্ফরমেন্স বেশ কমে গিয়েছে, প্রভাব পরেছে দিনের আলোর শটেও।

শাওমি ক্যামেরার সফটওয়্যারে এক্সপোজারের পরিমাণ সঠিকভাবে না বাড়ানোয় প্রায় প্রতিটি ছবিই বেশ অন্ধকার ও আন্ডারএক্সপোজড রয়ে গিয়েছে। এছাড়াও, লেন্সটির মান কমে যাওয়ায় ছবির কেন্দ্রের বাইরের ডিটেলেও রয়ে গিয়েছে বেশ ঘাটতি। ভিডিওর ক্ষেত্রেও চিত্র তেমন বদলায়নি। ফোনটি ১০৮০পি ভিডিও ধারন করলেও সেগুলো বেশ অন্ধকার ও অডিওর কোয়ালিটি খুবই নিম্নমানের।

সেলফি ক্যামেরাটিতেও সমমানের লেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে কাজ চালানোর মত সেলফি তোলা গেলেও ভাল কালার ও কন্ট্রস্ট নেই। সর্বোপোরি, ক্যামেরাই মূল ব্যবহারের জন্য এই ফোনটি সঠিক নয়।

মূল্য : শাওমি রেডমি ৪ প্রাইম দেশের বাজারে ১৪০০০-১৫০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

এক নজরে ভাল

  • ডিসপ্লে, যা মাঝারি বাজেটের ফোনের মাঝে বেশ উন্নত মানের
  • অডিও কোয়ালিটি ভালো
  • ব্যাটারি লাইফ দীর্ঘ 
  • মূল্য অনুযায়ী খুবই ভালো পারফরমেন্স

একনজরে খারাপ

  • ক্যামেরার কোয়ালিটি বেশ হতাশাজনক
  • দুটি সিম ও মেমরি কার্ড একই সঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ নেই

*

*