বাড়ছে ক্লিক বাণিজ্য, বেআইনি আউটসোর্সিংয়ে জব্দ হচ্ছে সাইট

ইমরান হোসেন মিলন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : চটকদার শিরোনাম ও আকর্ষণীয় ছবি দেখে লিংকে গেলেন। আসল ঘটনা জানতে আরও কয়েকটি ক্লিক করতে হলো। এরপরও মূল জিনিস অজানাই থেকে গেল। কেননা আপনি তখন হয়ত পৌঁছে গেছেন ‘নিষিদ্ধ’ কােনো ওয়েসবাইটে। এ ফাঁকে অবশ্য বেশ ক্লিক বাণিজ্যে পকেট গরম হয়ে গেছে অন্য কারও।

ব্যাপারটা যে কয়েকটি ক্লিকেই শেষ হয় এমনও নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ভেসে আসা অনেকটাই নিখুঁত সম্পাদনার ছবি বা ভিডিও দেখতে প্রায়ই নিজের ই-মেইল ঠিকানাও জানাতে হয়। যারা এ ফাঁদে পা দেন, তারা নিজের অজান্তে তার ই-মেইলকেও অবৈধ এসব ফ্রিল্যান্সারদের ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে দিলেন।

এই বেআইনি কাজকেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ‘ফ্রিল্যান্সিং’ কিংবা ‘আউটসোর্সিং’ হিসেবে প্রচার করে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করছে একটি চক্র। বিভ্রান্ত হয়ে নগদ লাভের আশায় এ পথে পা বাড়াচ্ছেন অনেকেই। তবে শেষ পর্যন্ত খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না গুগল ও সাইবার নিরাপত্তাদানকারী প্রতিষ্ঠান এসব ওয়েবসাইট জব্দ করে দেওয়ায়। এতে ফ্রিল্যান্সিং পেশা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে ‘আসল-নকলের’, তেমনি ক্ষতি হচ্ছে দেশের আউটসোর্সিং খাতের।

Illigal-outsourching

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফেইসবুক ব্যবহার করেই এসব লিংক ছড়ানো হয়। বিভিন্ন গ্রুপে স্প্যামিং করা হয় আকর্ষণীয় ছবি কিংবা ভিডিওর এসব লিংক। বানানো খবর পরিবেশন করেও অশ্লীল ছবি বা ভিডিওর শেয়ার করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বেশকিছু সাইটও এ ধরনের বেআইনি আউটসোর্সিংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পেপারসবিডি ডটনেট, আপটুবিডি ডটকম, ম্যাঙ্গোটল ডটকম, সুব্রত ডটকম, নিউজআপডেট২৪বিডি ডটকম, ডিএলনিউজ২৪ ডটকম, বিডিটিপসঘর ডটকম, হটসেলব ডটকম, এইজীবন ডটকম, ডেইলিহেরথটিউনস ডটকমের মতো অসংখ্য সাইট।

এগুলোর বেশিরভাগই দেখা যায় দু-তিন মাস কাজের পর জব্দ হয়ে যায়। ইদানিং এমন ওয়েবসাইট জব্দ হওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। চক্রটি তখন আবার নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করে।

অনেক ক্ষেত্রে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও অনেকে মৌলিক কনটেন্টের বদলে কপি পেস্ট করে কাজ করেন। ইউটিউবি চ্যানেলও অন্যের ভিডিও দিয়ে মার্কেটিং বা আয়ের চেষ্টা চালান। তবে কিছু দিন পরেই তা ধরা পড়ে যাওয়ায় সাইট বন্ধ হয়ে যায়।

illegal outsourcing-techshohor

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, চটকদার শিরোনাম দেখে এগুলোতে ঢুকলেও শিরোনামের সঙ্গে কোনো মিল থাকছে না। আরও কয়েক ক্লিকের পর মেলে কোনো পর্ন সাইটের ঠিকানা। এটুকুতেই অবশ্য কাজ হয়ে যায় ওই চক্রের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেননা একদিকে আপনার অ্যাকটিভিটির ওপর নির্ভর করে ফেইসবুক আবারও ওই ব্যক্তির আইডি থেকে শেয়ার করা নতুন লিংক যেমন ওয়ালে দেখায়, তেমনি চক্রটি ই-মেইল ও ক্লিক থেকে আয় করে ফেলে নিমিষেই।

তবে কাজটিকে সরাসরি বেআইনি (ই-লিগ্যাল) আউটসোর্সিং বলছেন ফিল্যান্সিং পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরা। মূলত কিছু ব্যক্তি টাকার লোভ দেখিয়ে তরুণদের এ কাজে ভিড়িয়ে অশ্লীল ছবি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বিষয়টি অনেক দিন থেকে নজরে রেখেছেন এমন অনেকের অভিযোগ, একটি সক্রিয় চক্র রংপুর ও দিনাজপুর থেকে এ কাজ বেশি মাত্রায় করছে। তবে সম্প্রতি চক্রটি ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বেআইনি আউটসোর্সিং করা হচ্ছে সিপিএ বা কস্ট পার অ্যাকশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে। এর মাধ্যম প্রতি ক্লিক থেকে অর্থ আয় হয়। ক্ষেত্র বিশেষে একটি ভিডিও একবার দেখা হলেই ৭০-৮০ সেন্ট পর্যন্ত আয় হয়।

আবার দেখা যায় প্রকৃত ই-মেইল আইডির বিপরীতে এক ডলার সমপরিমাণ অর্থও হাতিয়ে নিচ্ছে ওই চক্র।

একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী রাফায়েত হোসেন রাফু টেকশহরডটকমকে বলেন, ওই চক্রটি টার্গেট করে উঠতি বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণদের। ফ্রিল্যান্সিং কাজ দেবে বলে চক্রটি গোপনে কিছু ফটোশপ ও লিংক কপি-পেস্টের কাজ শেখাচ্ছে।

মূলত সাইটে ট্রাফিক বাড়ানো ও বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানো তাদের উদ্দেশ্য। এ ছাড়াও ভিজিটরদের ই-মেইল আইডি নেওয়াও একটি উদ্দেশ্য থাকে বলে জানান রাফায়েত।

সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা এ নির্বাহী বলেন, গোপনে কাজ করতে ব্রাউজার হিসেবে ভিপিএন বা প্রক্সি আইপি ব্যবহার করে তারা। মার্কেটিং পলিসি হিসেবে সিপিএ, এসইওর পাশাপাশি অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংও কাজে লাগায়।

অনলাইন পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্টারনেট প্রফেশনাল কমিউনিটির (বিআইপিসি) সাবেক আহবায়ক আবুল কাশেম টেকশহর ডটকমকে বলেন, “এ ধরনের কাজকে ‘গ্রে মার্কেটের’ সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে এটা সম্পূর্ণ ই-লিগ্যাল কাজ। এক ধরনের ক্রাইমও বলা চলে।”

Illigal-outsourching2

ফ্রিল্যান্সিং ও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে অভিজ্ঞ এ ফ্রিল্যান্সার বলেন, সরকারের সঙ্গে মিলে যখন দেশে ফ্রিল্যান্সিং পেশার একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। তখন ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে এ ধরনের বেআইনি কাজ মেনে নেওয়া যায় না।

বিডিহায়ারের প্রধান নির্বাহী কাশেম বলেন, যেসব এলাকায় এটা হচ্ছে সেখানকার প্রসাশনকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে প্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সিং পেশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

আউটসোর্সিং কাজের দেশীয় মার্কেটপ্লেস বিল্যান্সারের প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম বলেন, অনেকেই এটিকে আউসোর্সিং হিসেবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটা আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং নয় বরং সম্পূর্ণ অবৈধ এক কাজ। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এখনই ব্যবস্থা না নিলে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব জোরালো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন: 

Related posts

*

*

Top