সুনামের সঙ্গে দুর্নামও কুড়িয়েছেন দেশি ফ্রিল্যান্সাররা

তুহিন মাহমুদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ এখন শক্ত অবস্থানে। বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভের পাশাপাশি ফিল্যান্সারদের কাজের দক্ষতা ও সেবা দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। অনলাইনে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত শীর্ষ মার্কেট প্লেসগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। ২০১৩ সালে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে সফলতা যেমন এসেছে, তেমনি কিছু ব্যর্থতা কিংবা দুর্নামের ভাগিও হয়েছেন ফ্রিল্যান্সাররা। বছরজুড়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার ঘনঘটা নিয়ে এ প্রতিবেদন।

ইল্যান্সে মাসে এক হাজার বাংলাদেশি
অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সে প্রতি মাসে এক হাজারের অধিক ফ্রিল্যান্সার যুক্ত হচ্ছে। প্রতি প্রান্তিকে এদেশি ফ্রিল্যান্সারদের প্রায় ১৫০ শতাংশের বেশি কাজের পরিমাণ বাড়ছে। এটিকে এ খাতের সফলতা হিসাবেই দেখছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। দেশি ফ্রিল্যান্সাররা আইটি, প্রোগ্রামিং, গ্রাফিকস ও সফটওয়্যার বিভাগে অনেক বেশি কাজ পাচ্ছেন। এ ছাড়া কাজের তালিকায় রয়েছে অ্যাডমিন সাপোর্ট ও বিপণন বিভাগ। তারা সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরের বায়ারদের কাছ থেকে।

ফ্রিল্যান্সারে ফিচারড হলেন তিন বাংলাদেশি
অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সারডটকম কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে তাদের ব্লগে দুইজন সফল ফ্রিল্যান্সারের বিস্তারিত তুলে ধরে। ‘ফিচারড ফ্রিল্যান্সার ফ্রাইডে’ হিসাবে তিন বাংলাদেশি রাসেল জন, শফিউল আলম বিপ্লব ও সৌরভ দত্ত তাদের দক্ষতার বিচারে এমন সম্মাননা পেয়েছেন।

Russell John-TechShohor

সেপ্টেম্বরে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ও ফ্রিল্যান্সার ডটকমের প্রথম ‘ফিচারড ফ্রিল্যান্সার ফ্রাইডে’ হিসেবে নির্বাচিত হন রাসেল জন। তিনি মূলত প্রফেশনাল লিনাক্স সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং অভিজ্ঞ ওয়েব মাস্টার। ফ্রিল্যান্সার ডটকমে বর্তমানে ঘন্টায় ২৫ ডলারে কাজ করছেন।

biplob-freelancer-TechShohor

নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসাবে ‘ফিচারড ফ্রিল্যান্সার ফ্রাইডে’ হন শফিউল আলম বিপ্লব। অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত হওয়া বিপ্লবের শুরুটা ছিল শখের বসে। ২০১০ সালে শুরুর সময়টা যদিও ছিল অনেক ধৈয্যের। আস্তে আস্তে সফলতা পেতে শুরু করেন। পরে তিনি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরুর উদ্যোগ নেন। ১০০ ডলার দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তিনি অ্যাডভান্সড অ্যাপস বাংলাদেশ লিমিটেড (অ্যাপবিডি) নামে অ্যাপ্লিকেশন তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা।

Sowrav Datta-freelancer-TechShohor

এরপর ডিসেম্বর মাসের প্রথম ‘ফিচারড ফ্রিল্যান্সার ফ্রাইডে’ হন সৌরভ দত্ত। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ফ্রিল্যান্সার ডটকমে নিবন্ধনের মাধ্যমে এসইও, এসইএম/অ্যাডওয়ার্ড, লিংক বিল্ডিং, ইন্টারনেট মার্কেটিং, আর্টিকেল, ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এবং ওআরএম ক্যাটাগরির কাজ শুরু করেন। যদিও ২০০৯ সাল থেকে টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং করতেন তিনি। তখন ৫ থেকে ১০ ডলারের কাজ করতেন। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সারে কাজ করার পাশাপাশি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ওয়েব সার্কেল’ নামের একটি অনলাইন মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

অ্যাডসেন্সের আয় সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে
গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশি অ্যাডসেন্স পাবলিশারদের জন্য সুখবর নিয়ে আসে গুগল। এখন থেকে চেকের বদলে অনলাইনে ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘরে আনা যাবে গুগল অ্যাডসেন্সের আয়। কয়েক মাস ধরে দেশের অ্যাডসেন্স পাবলিশাররা চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে তাদের অর্জিত অর্থ তুলতে পারছিলেন না। গুগল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে গুগলের প্রধান কার্যালয়ে বিষয়টির সমাধানে যোগাযোগ করলে নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়।
গুগলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগের পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারকারীরা নতুন পেমেন্ট সিস্টেমে অ্যাকাউন্ট আপগ্রেড করার মাধ্যমে এ সুবিধা পাবেন। গুগল ওয়্যার ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে কোনো চার্জ নেই। গুগল হেল্প সেন্টারে ওয়্যার ট্রান্সফার সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। ইতোমধ্যে দেশের অ্যাডসেন্স পাবলিশাররা এ সুবিধা উপভোগ করছেন।

বাংলাদেশকে পেপালের ‘না’
২০১৩ সালের প্রথম থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত আলোচনার শীর্ষে ছিল অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে পেপাল নিয়ে। চলে নানা নাটকীয়তা। বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রী ও গর্ভনরসহ অনেকেই পেপাল চালুর কথা জানান। এতে অনলাইন লেনদেনের সাথে জড়িতরা আশার মুখ দেখছিলেন। তবে সে আশায় গুড়ে বালি দিয়ে আগস্টের শেষের দিকে পেপাল বাংলাদেশকে না বলে দেয়। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেই মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশা ২০১৫ সালের মধ্যে পেপালকে রাজি করিয়ে বাংলাদেশে আনা যাবে।

ক্যাপচা কোড ভাঙতে ওস্তাদ বাংলাদেশ
অনলাইনে বিভিন্ন সাইটে নিবন্ধন কিংবা অ্যাক্সেস নিতে ক্যাপচা কোড পূরণ করতে হয়। স্প্যামিং রোধ করতে মূলত এমন ব্যবস্থা নেয় ওয়েব কর্তৃপক্ষ। হাতে টাইপ করতে অনেক সময় লাগে। তাই যারা একটি ওয়েবসাইটে অসংখ্য নিবন্ধন, অসংখ্য ই-মেইল খোলা কিংবা স্প্যাম কনটেন্ট পাঠানোর কাজ করেন তারা সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্যাপচা কোড ভেঙে থাকেন। আর ক্যাপচা ভাঙতে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। খুব কম খরচে দ্রুতগতিতে ক্যাপচা কোড ভাঙতে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন কর্মীদের ব্যবহার করে ক্যাপচা নিয়ে কাজ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সিমন ফ্রেশার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্রেগ মরি এই তথ্য জানান বছরের মাঝামাঝি সময়ে।
তিনি বলেন, এ ধরনের কাজে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের বেশি বেছে নেওয়া হয়। ডাটা এন্ট্রি কাজ হিসেবে ক্যাপচা কোড ভাঙার কাজ অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে দেওয়া হয়। আর এ ধরণের কাজ বাংলাদেশিরাই বেশি করে বলে জানানো হয়।

ভুয়া লাইক-এ শীর্ষে
বাংলাদেশ থেকে ফেইসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুয়া লাইক করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার ও স্বল্প আয়ের কর্মীরা এ কাজ করছে। তারা কম খরচে ভুয়া লাইক বাড়ানোর কাজ করছে। তৈরি হয়েছে ভুয়া লাইক দেওয়ার জন্য ‘ক্লিক ফার্ম’। প্রতিষ্ঠানগুলো ফেইসবুক, টুউটার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইটে এই কাজ করছে।
আগস্টে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের নামে ভুয়া লাইকের কাজ করছে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার ও প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ধরণের ভূয়া লাইকের কারণে আসল ব্র্যান্ডটি হারিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়ছে ফেইসবুক, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপন ব্যবসা।
ফেইসবুকের তথ্য অনুযায়ী, লাইক জোগানোর দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থানটি মিসরের রাজধানী কায়রোর। আর এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের মান অনেকাংশে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে।

Related posts

*

*

Top