আঁকাজোখায় দেশ সেরা দুই ফ্রিল্যান্সার

তুহিন মাহমুদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : অগোচরে কাজ করতেই তারা পছন্দ করেন। এতদিন সেটাই করছিলেন । নিভৃতে দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছিলেন। তবে বেসিসের বর্ষসেরা পুরস্কার তাদের সামনে নিয়ে আসে। দেশ সেরা এ দুই ফ্রিল্যান্সার কাজ করেন গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে।

অন্য সব সেরাদের মতো এদেরও ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার পেছনের গল্প ভিন্ন ও চমকপ্রদ। এ দু’জন হলেন আবদুর রাজ্জাক ও মহানন্দ সরকার।

এদের একজন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং বিষয়ক লেখা পড়ে আগ্রহী হন গ্রাফিক্স ডিজাইনে। হটাৎ করেই পেয়ে যান সাড়ে চার হাজার ডলারের কাজ। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন মাসে গড়ে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন।

আর অপরজন প্রায় ১০ বছর চাকরি করেও পেশাগত জীবনে ঠিক সুবিধা করতে পারছিলেন না। এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শুনে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী হন। শুরু করেন নিজে থেকে ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমানে মাসে গড়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করছেন। এনভাটো ডটকমেও ভালো অবস্থান করে নিয়েছেন, শীর্ষের ১৫ তম স্থানটি তার।

Abdur Razzak-Mohananda Sarkar-Graphic Design-TechShohor

দেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।

এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তাদের কথা জানাতেই টেকশহরডটকমের এ বিশেষ আয়োজন।

টেকশহরডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে গ্রাফিক্স ডিজাইনে পুরস্কৃত তিন ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে এ দুই সফল ফ্রিল্যান্সার তাদের কাজের শুরু, বর্তমান পেক্ষাপট, বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ও আগামীর লক্ষ্য নিয়ে নানা তথ্য জানিয়েছেন। তাদের সেসব কথামালা তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন।

আবদুর রাজ্জাক
বগুড়া উপশহরের ছেলে রাজ্জাক ২০০২ সাল থেকে গ্রাফিক্স ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত বগুড়ায়, ২০০৫ সালের শেষের দিকে নরসিংদী ও পরে ঢাকায় একটি গ্রাফিক্স ডিজাইন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

২০১১ সালে খোকন নামে এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে আউটসোর্সিং সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে ঢাকাতে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেন। এরপর ওডেস্ক, ৯৯ ডিজাইনস ও এনভাটোতে কাজ শুরু করেন। কাজও পেয়ে যান। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বর্তমানে এনভাটো ডটকমে নিজে গ্রাফিক্স ডিজাইন করে সেটি বিক্রি করেন। স্টক সেল থাকার কারণে এনভাটোতেই কাজ করতে ভালোবাসেন আবদুর রাজ্জাক। প্রতিদিন গড়ে আট ঘন্টা কাজ করেন তিনি।

বর্তমানে বছরে তার আয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা। কাজের ক্ষেত্র হলো গ্রাফিক্স ডিজাইন, প্রিন্ট ডিজাইন, প্রেজেন্টেশন ও ব্র্যান্ডিং।

Abdur Razzak_ Receiving Award from Tel & IT Minister-TechShohor

২০১১ সালে থেকে একাই কাজ করে আসছিলেন রাজ্জাক। তবে কাজের পরিধি অনেক বেড়ে যাওয়ায় এ বছরের জানুয়ারি থেকে তার কাজের সঙ্গে আরেকজনকে যুক্ত করেছেন।

সফলতা হিসেবে এনভাটোতে এলিট অথর হিসেবে শীর্ষ ১৫তে অবস্থান তার জন্য বড় পাওয়া। সম্প্রতি বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিও  তার সফলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেশের একটি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস না থাকাকে ব্যর্থতা হিসেবে মনে করেন রাজ্জাক। এ ছাড়া ভালো কোনো পেমেন্ট গেটওয়ে না থাকার কারণে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা অনেকাংশেই পিছিয়ে আছে বলে ভাবেন তিনি।

আগামীতে এ দুটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান এ তরুন ফ্রিল্যান্সার। দেশের ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের পরিধি আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।

মহানন্দ সরকার
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পোদালী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মহানন্দ বর্তমানে খুলনার ফুলবাড়ী গেইটে বসবাস করছেন। ছোটবেলা থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক ম্যাগাজিন ও লেখা পড়তে ভালোবাসেন।

আগ্রহের বশে শিখেছিলেন গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ। সে সুবাদে একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে চাকরি নেন। এ সময় ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কিত নানা সফলতার গল্পও তাকে অনুপ্রাণিত করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইল্যান্সে কাজের জন্য বিড করতেন।

ঘটনাটি ২০১২ সালের প্রথমদিকের। হটাৎ একদিন ৪ হাজার ৫০০ ডলারের একটি কাজ পেয়ে যান। এই এক কাজেই ঘুুরে যায় তার জীবনের মোড়।

অনেক বড় ধরণের এ প্রকল্প শেষ করতে কয়েকজন তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের উপযোগী করে তোলেন। তাদের মাধ্যমে শেষ করেন প্রকল্পটি। নির্দিষ্ট সময়ে কাজটি শেষ করেন এবং চাকরি জীবনের ইতি টানেন।

Mohanananda Sarkar-Graphic Designer-TechShohor

বর্তমানে ৫ জনের একটি দলের মাধ্যমে কাজ করছেন। যখন কাজের বাড়তি চাপ আসে তখন চুক্তিভিত্তিক আরও কিছু লোক নিয়োগ দেন।

ইল্যান্সের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন। সবগুলোই গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ। আর এ কাজের মাধ্যমেই ব্যক্তিগতভাবে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন।

মহানন্দ কাজ শুরু করেছিলেন আর্থিক স্বচ্ছলতার উন্নতি করার জন্য। নিজেকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সবসময় কাজের মান ভালো করার চেষ্টা করেছেন। তাই ইল্যান্সে ২৯৫টি জব, ৪৩২ মাইলস্টোন ও ৬০ জন ক্লায়েন্ট পেয়েছেন।

৬২ ঘন্টা কাজ করে আয় করেছেন ২৬ হাজার ডলার। পেয়েছেন ভালো রেটিং, ফিডব্যাক। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিনামূল্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দেন। আর এসব ভালোকাজের জন্য পেয়েছেন এবারের বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড।

আগামীতে কাজের পরিধি এবং গতি আরও বাড়াতে চান মহানন্দ। এ জন্য কিছু শিক্ষিত বেকার এবং সৃজনশীল ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের উপযুক্ত করে তোলার কাজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।

Related posts

*

*

Top