ওয়েব ডিজাইনে বাজিমাত করা দেশ সেরা ৩ ফ্রিল্যান্সার

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ঘন্টায় এক ডলার থেকে শুরু করে সেই রেট এখন ৫০ ডলার। অথচ শুরুতে সেই এক ডলারের কাজ পেতে কতই না কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছিল। নিজের চেষ্টায় সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করে ফ্রিল্যান্সিংয়ে দেশ সেরা ওয়েব ডিজাইনারের কাতারে উঠে এসেছেন।

সফল এসব ফ্রিল্যান্সার বর্তমানে মাসে গড়ে এক হাজার ডলার আয় করছেন। কারও আয় এর চেয়েও বেশি। কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় একা তা করা সম্ভব না হওয়ায় দলগতভাবে করছেন। নিরন্তর এ চেষ্টার পুরস্কার হিসাবে সেরা ফ্রিল্যান্সার খেতাব পেয়েছেন তারা। এদের কেউ আবার মোবিলাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফ্রিল্যান্সিং এক মার্কেটপ্লেসে।

এমন তিন সেরা ওয়েব ডিজাইনার হলেন নিয়ামুল হাসান, নূর মোহাম্মদ ও নাজমুল হোসেন। এবার ওয়েব ডিজাইনার ক্যাটাগরিতে বেসিস ফ্রিল্যান্সার অ্যাওয়ার্ডে লাভ করেছেন তারা।

Outsucing-Award-2014-logo-TechShohor

দেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।

এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তাদের কথা জানাতেই টেকশহরডটকমের এ বিশেষ আয়োজন।

টেকশহরডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ তিন সফল ফ্রিল্যান্সার তাদের কাজের শুরু, বর্তমান পেক্ষাপট, বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ও আগামীর লক্ষ্য নিয়ে নানা তথ্য জানিয়েছেন। তাদের সেসব কথামালা তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন।

নিয়ামুল হাসান
বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার শ্রিফলতলা গ্রামে বেড়ে উঠেছেন নিয়ামুল। এইচএসসি পর্যন্ত পড়েছেন সেখানে। এরপর কম্পিউটার ও প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করেছেন ঢাকায়।

ছোট বেলা থেকে কম্পিউটারের প্রতি অনেক বেশি আকর্ষণ ছিল নিয়ামুলের। অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন মাকে ম্যানেজ করে কম্পিউটার কেনেন। তবে শুরু থেকে কখনই গেমসে আসক্তি জন্মেনি তার। বিভিন্ন সফটওয়্যার ইন্সটল করে কাজ দেখতেন। চেষ্টা করতেন শেখার।

Niamul Hasan-1-TechShohor

শুরুটা ছিল ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে, তখন তিনি সিএসই দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। জুমলা নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলেন। বন্ধুদের নিয়ে বানিয়ে ফেললেন একটা পোর্টাল।

তারপর সবাই মিলে চিন্তা করলেন একটি অনলাইন রেডিও বানাবেন। তিন দিনের চেষ্টার পর সেটাও বানিয়ে ফেললেন জুমলা দিয়েই। এভাবেই শুরু।

এরপর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ওডেস্কে কাজ শুরু করেন। নিয়ামুলের প্রথম কাজ ছিল একটি গার্মেন্টস কোম্পানির জুমলা সাইটের কিছু ফিক্সিং। ঘন্টায় এক ডলার রেটে কাজটি করেন তিনি। যদিও ২০১২ সালে মার্কেটপ্লেসে বিড করে কাজ ছাড়ার আগে ঘন্টায় ৫০ ডলারে কাজ করতেন।

তার প্রথম মাসের আয় ছিল ৪৫ হাজার টাকা, এর মধ্যে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরাতন ল্যাপটপ কিনেছিলেন।

পরে নিয়ামুল ও তার এক বন্ধু আনসারি মিলে বাংলাসফট নামে একটি ছোট্ট কোম্পানি খোলেন। আনসারীদের চিলেকোঠায় ছিল অফিসটি। সেখান থেকে আস্তে আস্তে কাজ চালিয়ে যাওয়া।

ফ্রিল্যান্সিং থেকে ভালোমানের উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা করলেন। তাই ঢাকায় এসে জুমশেপারের সিইও কাউছার আহমেদের কাছ থেকে প্রোডাক্ট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেন। ২০১১ সালে অনুবর্তন নামে আরেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

পরে একাই থিমরক্স নামের আরেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জুমলা টেমপ্লেট তৈরি করে তা থিম মার্কেটপ্লেসে থিমফরেস্টে বিক্রি করা শুরু করেন। বর্তমানে এনভাটোতে এলিট অথর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। মার্কেটপ্লেসে ওয়েব টেমপ্লেট বিক্রির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু ক্লায়েন্টের সঙ্গে পার্টনারশীপে কাজ করেন। থিমরক্সে ১২ জন ফুলটাইম ডেভেলপার কাজ করছে। তৈরি করেছেন ২০টির মতো প্রোডাক্ট।

আগামীতে কোম্পানিকে শীর্ষ ওয়েব টেমপ্লেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই নিয়ামুলের প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

নূর মোহাম্মদ
পটুয়াখালীর ছেলে নূর মোহাম্মদ বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছেন। কাজ করেন ওয়েব ডিজাইনার হিসেবে। কুয়েতে ইন্ডিয়ান স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসচির পর সিএসআইতে বিএসসি কররেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন শখের বসে ওয়েব ডিজাইন শেখেন। অনলাইন থেকে বিভিন্ন বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও টিউটোরিয়াল দেখে কাজটা আয়ত্তে আনেন।

অনলাইনে অনেক ডিজাইন কমিউনিটি আছে, তাদের করা নানা রকম ডিজাইন মোহাম্মদকে এই কাজে উৎসাহিত করে। পরে ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডে ওয়েব ডিজাইনার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে স্বাধীনভাবে কিছু করার মানসিকতা নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন।

Nur Mohammad-TechShohor

ফ্রিল্যান্সার ডটকমে গ্রাফিক্স এবং ওয়েবসাইট ডিজাইনের কাজ করলেও মূলত ওয়েব ও মোবাইল ইউজার ইন্টারফেসে মোহাম্মদের আগ্রহ বেশি। এখন ইল্যান্সেও কাজ করেন।

মার্কেটপ্লেসের পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে নিয়মিত গ্রাহক রয়েছে তার। প্রথমদিকে একা কাজ করতেন। পরে কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দল গঠন করেন। বর্তমানে ওই দলে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। মাসে ব্যক্তিগত আয়ের পরিমাণ এক থেকে দুই লাখ টাকা।

বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড পাওয়াকে নিজের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে বিবেচনা করেন মোহাম্মদ। এ কাজে এগিয়ে যেতে ব্যবসায়িক বন্ধু সৈয়দ মোবারকের সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সার ডটকমে ৫ এর মধ্যে ৪.৮ রেটিং পাওয়া মোহাম্মদ ঘন্টায় ১৫ ডলারে কাজ করেন। এ ছাড়া প্রজেক্টভিত্তিক কাজও করেন। আগামীতে নিজের দলটিকে একটি সফল কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি।

নাজমুল হোসেন
খুলনার ছেলে নামজুল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন থেকে স্নাতক শেষে এখন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিনে স্নাতকোত্তর করছেন। আগামীতে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রী নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি ২০১৩ সালের জুন থেকে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সের খুলনা অঞ্চলের মোবিলাইজার হিসেবে কাজ করছেন।

২০০৮ সালে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সবার সফলতা দেখে নিজেও শুরু করেন। প্রথম দিকে কপিরাইটিংয়ের কাজ করতেন। যদিও ২০১০ সাল থেকে ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন। এখন মূলত পিএইচপি, ওয়ার্ডপ্রেস থিম ডেভেলপমেন্ট, প্লাগইন ডেভেলপমেন্ট, ম্যাজেন্টো, জেন্ড ফ্রেমওয়ার্ক ও ই-ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করছেন।

Nazmul Hussain-TechShohor (1)

ইল্যান্সে আইটি অ্যান্ড প্রোগ্রামিং ক্যাটাগরিতে নিয়মিত কাজ করছেন নাজমুল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্টের একটি কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান। সেখানে ৩ জন ওয়েব ডেভেলপার কাজ করেন। নিজে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করেন। প্রতিমাসে গড়ে প্রায় এক হাজার ডলার আয় করে থাকেন তিনি।

নাজমুল জানান সফলতা ও ব্যর্থতার হিসাব কখনও করা হয়নি কাজের চাপে। তারপরও ইল্যান্স মোবিলাইজার হিসেবে দেশের জন্য কাজ করতে পারছেন, এটাকে তার সবচেয়ে বড় সফলতা বিবেচনা করেন তিনি।

এ পর্যন্ত ইল্যান্সের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জেলায় ৫০টিরও অধিক ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছেন। সেই সঙ্গে খুলনা অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সারদের উন্নয়নে সর্বদা কাজ করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মোবাইল অ্যাপস নিয়ে ইল্যান্সের উদ্যোগে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ আয়োজনের পরিকল্পনায় করেছেন।

আয়ের পরিমান, কাজের মান, সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান এসবের ওপর ভিত্তি করে এবারের বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে পুরস্কৃত হয়েছেন নাজমুল।

আগামীতে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার চিন্তা নাজমুলের। বিশেষত তার ইচ্ছা আউটসোর্সিং অর্থনীতি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার। দেশের মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার মাধ্যমে অর্থনীতেতে অবদান রাখতে চান তিনি।

Related posts

*

*

Top