দেশ সেরা তিন মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার

তুহিন মাহমুদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : স্মার্টফোন ব্যবহার করেই এখন সেরে ফেলা যায় অনেক কাজ। দৈনন্দিন জীবনযাপনকেও সহজ করেছে হাতের ছোট্ট ডিভাইসটি। এত কাজ যে মাত্র কয়েকটি স্পর্শে করা সম্ভব হচ্ছে তার কারণ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন।তবে এর পেছনের মূল কারিগর অ্যাপ ডেভেলপাররা। যদিও তারা বরাবরই থেকে যান আড়ালে।

এমনই তিন মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার হলেন চৌধুরি রাশদি আল রশিদ, আবু সালেহ মোহাম্মদ কায়সার ও জি এম তাসনিম আলম। অ্যাপ ব্যবহারকারীরাদের কাছে হয়ত তারা অজানাই রয়ে যাবেন। তবে একেবারেই আড়ালে থেকে যাননি। এবার তাদের কাজের স্বীকৃতি মিলেছে।

Outsucing-Award-2014-logo-TechShohor

বেসিস তাদের দেশ সেরা মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার হিসাবে নির্বাচন করেছে। যদিও তাদের ডেভেলপার হওয়ার কথা ছিল না। ছিল না এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও।

তাদের এ কাজ শুরুর কাহিনীও ভিন্ন। এদের কেউ মায়ের দেওয়া একটি আর্টিকেল পড়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করে দেশ সেরা ফ্রিল্যান্সার হয়েছেন। আবার কেউ প্রেমিকার কাছ থেকে টাকা ধার করে ম্যাকবুক কিনে কাজ শুরু করেছেন। আর অপরজন শিক্ষকতা ছেড়ে করছেন ফ্রিল্যান্সিং।

এখন নিজের কাজের ক্ষেত্র মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে বেশ নাম কুড়িয়েছেন, প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন। প্রত্যেকের মাসে গড়ে প্রায় ২ লাখ টাকা আয় করছেন।

দেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।

এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তাদের কথা জানাতেই টেকশহরডটকমের এ বিশেষ আয়োজন।

টেকশহরডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ তিন সফল ফ্রিল্যান্সার তাদের কাজের শুরু, বর্তমান পেক্ষাপট, বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ও আগামীর লক্ষ্য নিয়ে নানা তথ্য জানিয়েছেন। তাদের সেসব কথামালা তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন।

চৌধুরি রাশদি আল রশিদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বিবিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করেছেন রশিদ। এরপর ইউনিক্লোতে প্রায় এক বছর চাকরি করেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে আউটসোর্সিং ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

২০০৭ সালের দিকে রশিদের মা একটি পত্রিকায় প্রকাশিত আউটসোর্সিংয়ের বিষয়ে একটি আর্টিকেল তাকে পড়তে দেন। ওই সময় রশিদ অনলাইন গেইম খেলে প্রচুর সময় কাটাতেন। আর্টিকেলটি পড়ে গেইমিংয়ের বদলে আউটসোর্সিং পেশায় নিজেকে জড়ানোর আগ্রহ বেড়ে যায় তার।

Rashdi AL Rashid - app developer-TechShohor

রেন্ট এ কোডার ডটকম নামের একটি সাইটে (পরে এর নাম হয় ভিওয়ার্কার, যা বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার ডটকমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে) কাজ শুরু করেন রশিদ। ২০০৯ সালের শেষ দিকে এসে তিনি রেন্ট এ কোডার ডটকমে টপ এক হাজার কোডারদের মধ্যে চলে আসেন।

যখন কাজ শুরু করেন তখন রশিদের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বা ওয়েব পেইজ ডিজাইনের বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। শুধু কিছু বেসিক ফটোশপ টেকনিক জানা ছিল।

প্রথম কিছুদিন বিড করেও কোনো কাজ পাননি। ৭/৮ দিন পর একজন ভারতীয় তাকে একটি প্রজেক্ট দেন। টানা ৫ দিন কাজ করেন, কিন্তু সে রশিদকে কোনো পারিশ্রমিক দেয়নি। কিন্তু ভালো একটি রিভিউ দিয়েছিলো।

২০০৯ সালের মধ্যে রশিদ ম্যাজেন্টো, ওয়ার্ডপ্রেস ও আমাজন (এ ডাব্লিউ এস [AWS] এবং সেলার সেন্ট্রাল) ভালোভাবে শিখে ফেলেন। ওই একই বছর ড্রিমিং ট্রি নামের একটি আমেরিকান নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি কোম্পানিতে স্থায়ী চাকরি পেয়ে যান।

বেশিরভাগ সময়ে একাই কাজ করেন রশিদ। তবে প্রজেক্টের প্রয়োজনে দলগতভাবেও কাজ করতে হয়। তার কিছু কর্মীও আছে। আয়ের বিষয়টি প্রকাশ করতে না চাইলেও কাজের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ভালোই আয় করে থাকেন তিনি।

মূলত ইউএসএর ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সমাধান দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য ই-কমার্স স্টোর তৈরির করে দেওয়ায় রশিদ বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হন। বানিয়ে দেন।

২০১০ থেকে ২০১৩ এর মধ্যে এ উদ্যোক্তা ফ্রিল্যান্সার ৩৫টির বেশি নতুন ব্যবসা চালু করেছেন। সাধারনত গুগল এবং লিংকডইনে ক্রেতা পাওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। ৩০০ মার্কিন ডিস্ট্রিবিউটর এবং ড্রপ শিপারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি সহজেই প্রোডাক্ট সোর্স করতে পারেন।

আগামীতে একটি বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) ফার্ম খুলতে চাই রশিদ। যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সমাধান দেওয়া হবে।

আবু সালেহ মো. কায়সার
মোবাইল ফোনের জন্য একটি অ্যাপ তৈরির ঘটনা ফ্রিল্যান্সিং পেশাকে স্থায়ীভাবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ঢাকার ছেলে কায়সার লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েট শেষ করে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটিতে লেকচারার হিসেবে যোগদান করে।

তবে ২০০৮ সাল থেকে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে রেন্ট এ কোডারে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন। ওডেস্কেও কাজ করেছেন। মূলত ওয়ার্ডপ্রেস, জুমলা ও ই-কমার্স নিয়ে কাজ করেন তিনি।

Abu Saleh Mohammad Kaisar-App Developer-TechShohor

ড্যাফোডিলে চাকরি করার সময় অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ২০১১ সালের শেষের দিকে অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করেন।

সফলতা আসায় গত বছর চাকরি ছেড়ে দিয়ে এ কাজে পুরো সময় দিচ্ছেন। বর্তমানে গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপ প্রকাশ করে তার মাধ্যমে ভালো আয় করছেন।

এরই মধ্যে মুঠোফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল ও এসএমএস ব্লক করার অ্যাপ ‘কল অ্যান্ড এসএমএস ব্লকার প্রো’ নামের একটি অ্যাপ তৈরি করে মার্কেটপ্লেসে ছাড়েন। দ্রুততম সময়ে এটি ইউরোপের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। অ্যাপ বিক্রির মাধ্যমে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করছেন কায়সার।

একাই কাজ করেন এ ফ্রিল্যান্সার। আগামীতে একটি ভালো দল তৈরি করে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে চান। সেই সঙ্গে অ্যাডভান্সড মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিজেকে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে চান কায়সার।

জি এম তাসনিম আলম
ঢাকার গ্রিনরোডের বাসিন্দা তাসনিম বুয়েট থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন। ২০১১ সালে মহাখালীর একটি বেসরকারি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে আইফোনের অ্যাপ্লিকেশন তৈরির চাকরি করতেন। তখন সহকর্মীদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে ওডেস্কে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন কাজে বিড করা শুরু করেন।

হটাৎ করেই একজন ক্লায়েন্ট তাকে কাজ দেন। শুরু হয় ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজের যাত্রা। মূলত আইওএস প্লাটফর্মের জন্যই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন তাসনিম। এ কাজে প্রয়োজন আইফোন ও ম্যাক পিসি। কিন্তু যখন তিনি কাজটি পান তখন এই ডিভাইস ছিলো না তার কাছে।

Tasnim Alam-App Developer-2-TechShohor

তখন প্রেমিকা ও বর্তমানে তার স্ত্রীর কাছ থেকে ৫১ হাজার টাকা ধার নিয়ে একটি ম্যাকবুক কেনেন। প্রথম কাজে এক হাজার ডলার বোনাস পান তাসনিম। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এগিয়ে গেছেন বেশ দ্রুতগতিতেই।

আইওএস গেইম ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির পাশাপাশি বর্তমানে অ্যান্ড্রয়েড গেইম তৈরির কাজও করছেন তাসনিম। বর্তমানে আইটিউন স্টোরে অ্যাপ ও গেইম প্রকাশ করে আয়ও করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের বেশ কয়েকজন গ্রাহক তাকে নিয়মিত কাজ দিয়ে থাকেন।

বেশিরভাগ কাজ ওডেস্ক থেকে পান, তবে ইল্যান্সেও কাজ করেছেন। ওডেস্কে ৫ রেটিং নিয়ে কাজ করছেন।

প্রথম থেকেই একাই কাজ করছিলেন এ তরুন ফ্রিল্যান্সার। তবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে একটি দল গঠন করেছেন। এতে ৩ জন ডিজাইনার ও একজন আইওএস ডেভেলপার রয়েছে। এ জন্য ধানমণ্ডিতে একটি অফিসও নিয়েছেন তিনি। বন্ধুর পরিচালনায় একটি সফল অ্যান্ড্রয়েড টিমেও তিনি কাজ করছেন। কাজের হিসেবে প্রতি মাসে অনেক ভালো আয় করেন।

তার কাজের কারণে অনেকেই এখন বাংলাদেশের নাম জানেন, এ বিষয়টিকে তাসনিম সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে বিবেচনা করেন।

আগামীতে দলের পরিধি আর্বও বাড়িয়ে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে চান তাসনিম। ইচ্ছা আছে মোবাইল গেইম স্টুডিও তৈরিরও। এ লক্ষ্যে কাজও করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল গেইম তৈরির সবচেয়ে বড় কোম্পানি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন এ প্রকৌশলী।

Related posts

*

*

Top