লেখালেখিতে দেশ সেরা তিন ফ্রিল্যান্সার

তুহিন মাহমুদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : সফলদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার গল্পগুলো বিচিত্র। কারও ক্ষেত্রে তা মজার, আবার কারও ক্ষেত্রে তা করুণও বটে। কেউবা শেয়ারবাজারের লোকসান পোষাতে, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী হয়েছেন। কেউ আবার শখের বসে কিংবা আশেপাশের ফ্রিল্যান্সারদের সফলতা দেখে এটিকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন।

এদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশ সেরা সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নিজের প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন অনেকে। কেউবা স্বপ্ন দেখছেন নতুন প্রতিষ্ঠান দেওয়ার।

এমন তিন স্বপ্নবান সফল ফ্রিল্যান্সার হলেন মোস্তফা আল এমরান, শামসুল আনাম ইমন ও রবিউল ইসলাম। অনলাইন ব্লগিং ও কনটেন্ট ক্যাটাগরিতে সেরা নির্বাচিত হয়েছেন তারা।

Outsucing-Award-2014-logo-TechShohor

দেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।

এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তাদের কথা জানাতেই টেকশহরডটকমের এ বিশেষ আয়োজন।

টেকশহরডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ তিন সফল ফ্রিল্যান্সার তাদের কাজের শুরু, বর্তমান পেক্ষাপট, বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ও আগামীর লক্ষ্য নিয়ে নানা তথ্য জানিয়েছেন। তাদের সেসব কথামালা তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন।

মোস্তফা আল এমরান
চট্টগ্রামের ছেলে মোস্তফা আল এমরান। চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছেন। বর্তমানে একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট বিভাগে চাকরি করছেন। বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের নিবন্ধিত ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট তিনি।

সেরা এ ফার্মাসিস্ট এখন দেশ সেরা ফ্রিল্যান্সারও। বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে অনলাইন ব্লগিং ও কনটেন্ট ক্যাটাগরিতে দেশ সেরার পুরস্কার পেয়েছেন।

Mostafa Al Amran-TechShohor

একদিন তার এক সহকারীর কাছ থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়টি জানেন এবং কৌতুহল বশে টিপস নেন। এরপর তার ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহ জন্মে। অনলাইনে এ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

নিজের পড়াশোনার বিষয় কাজে লাগিয়ে যখন অনলাইনের মাধ্যমে আয় করা যায় তাহলে কেন থেমে থাকবেন তিনি? তাইতো ওষুধ, রোগের বিবরণ, রিসার্চ ও মেডিক্যাল ডিভাইস নিয়ে আর্টিকেল লেখা শুরু করেন। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন ওডেস্ককে।

চাকরির পাশাপাশি দেশ সেরা এ ফ্রিল্যান্সার এখন ওডেস্কে কাজের মাধ্যমে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। তিনি মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছাড়া সামান্য জ্ঞান নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করাটাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে ওডেস্কে ৫ রেটিং নিয়ে কাজ করতে পারাকে তিনি সফলতা হিসেবেই দেখছেন।

আয়, রেটিং ও দেশের ফার্মাসিস্ট ও চিকিৎসকদের মেডিক্যাল বিষয়ে লেখালেখিতে আগ্রহী করার জন্যই বেসিস তাকে এ বছর দেশ সেরার পুরস্কারে মনোনীত করে।

আগামীতে আর্টিকেল লেখাকে পূর্ণ পেশা হিসেবে নিতে চান এমরান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা যাতে লেখালেখির বিষয়ে আগ্রহী হয় সে বিষয়ে কাজ করবেন তিনি। এ বিষয়ে গবেষণার কাজটিও চালিয়ে যেতে চান।

শামসুল আনাম ইমন
ঢাকার দনিয়ার ছেলে ইমন নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন দেশের সেরা একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে।

ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসাবে চাকুরির সময় উচ্চাভিলাশী হয়ে শেয়ার ব্যবসা শুরু করেন। ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংকের ব্যক্তিগত ঋণের মাধ্যমে শেয়ার বাজারে বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারে ২৫ লাখ টাকা লোকসান হয়। তবে ব্যাংকের ঋণ ও বিপুল পরিমাণ দেনা পরিশোধ করা অসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই খুঁজতে শুরু করেন বিকল্প রাস্তা।

Shamsul Anam Emon-TechShohor

পরিচিতজনদের কাছ থেকে জানতে পারেন আউটসোর্সিংয়ের কথা। একটু ভালোভাবে জেনে শুনে ২০১১ সালের শেষ দিকে একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে মার্কেটপ্লেসে আর্টিকেল রাইটিং ও গবেষণার কাজ শুরু করেন।

প্রায় ৮ মাস বিড করার পর প্রথম কাজ পান। দিনে ব্যাংকের কাজ ও রাতে ৪-৫ ঘন্টা ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করতেন। শুক্র ও শনিবার পুরো সময় দেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে।

পরে ডেটা এন্ট্রি, ওয়েব সার্চ, প্রোডাক্ট আপলোড, ইনফরমেশন আপলোডসহ অনলাইন ডেটা এন্ট্রির বিভিন্ন কাজ করতে থাকেন। ব্যাংকের বেতন ও ফ্রিল্যান্সিং থেকে আসা টাকা দিয়ে দেনা পরিশোধ করতে থাকেন। এখনও কিছুটা দেনা অপরিশোধিত রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে দুই লাখের অধিক টাকা আয় করেন ইমন।

প্রায় এক বছর একা কাজ করেন। কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ২০১২ সালের শেষের দিকে এলাকার কিছু ছেলে-মেয়ে নিলে দলগতভাবে কাজ শুরু করেন।

২০১৩ সালের মাঝামাঝি ‘ওয়েফটি’ নামে একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান দেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে সাতজন তরুণ-তরুণী কাজ করছে। তার দেখাদেশি এলাকায় আরও অনেকে ফ্রিল্যান্সিং করছে।

বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড তার সকল কষ্টকে ঢেকে দিয়েছে বলে মনে করেন ইমন। তবে ব্যাংক ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের কারণে পরিবারকে নিয়মিত সময় না দিতে পেরে কিছুটা কষ্ট পান মাঝে মাঝে।

বেসিস তাকে গবেষণাধর্মী কাজ ও কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং কাজের জন্য পুরস্কার দিয়েছে।

এ ছাড়া ইমনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস এবং আগামীর পরিকল্পনাকেও বিবেচনায় এনেছে বেসিস।

আগামীতে নিজের প্রতিষ্ঠান ওয়েফটিকে আন্তর্জাতিক মানের একটি অনলাইন ডেটা এন্ট্রি এবং অনলাইন মার্কেটিংয়ে দেশ সেরা অবস্থানে দেখতে চান এ তরুন ফ্রিল্যান্সার কাম উদ্যোক্তা। একই সঙ্গে চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় পুরো সময় দিতে চান। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে চান।

রবিউল ইসলাম
বগুড়ার ছেলে রবিউল ইসলাম ২০১২ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাশ করেন। বর্তমানে বুয়েটে এমএসসি করছেন।

Robiul Islam-Blogging-TechShohor

কুয়েট ফ্রিল্যান্সিং সহায়ক একটি জায়গা। সেখানে অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং করেন। তাদের আশেপাশে থাকতে থাকতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মে রবিউলের। তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে জানাশোনার চেষ্টা করেন।

অবশেষে ২০১১ সালে এপ্রিলে কাজ শুরু করেন। বিষয়টি ছিলো আর্টিকেল বা ব্লগ রাইটিং, রিরাইটিং ও স্পিনিং। এসব কাজের মাধ্যমে বর্তমানে মাসে অর্ধলক্ষাধিক টাকা আয় করেন রবিউল।

ওডেস্কে ৪.৮৮ রেটিং থাকা রবিউল ইতোমধ্যে ৪ হাজার ঘন্টার অধিক কাজ করেছেন। ঘন্টাভিত্তিক কাজে ৬.৬৭ ডলার চার্জ করেন তিনি। আর চুক্তিভিত্তিক কাজতো রয়েছে। ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে কাজ করেন তিনি।

আগামীতে একটি আইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করতে চান রবিউল। এ ছাড়া নিজের কিছু বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট খুলতে চান।

Related posts

টি মতামত

*

*

Top