অনলাইন মার্কেটিংয়ে দেশ সেরা ৩ স্বপ্নবান ফ্রিল্যান্সার

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : অন্য কারও কাছ থেকে শুনে কৌতুহল বসে শুরু করেছিলেন ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং। শুরুর পর সিনিয়রদের কাছ থেকে উৎসাহ যেমন পেয়েছেন, তেমনি কাজের অর্ডারও পেয়েছেন বেশ। দেশি-বিদেশি গ্রাহকদের প্রশংসার পাশাপাশি বড় অংকের আয় আউটসোর্সিংয়ে ভালো করতে অনুপ্রাণিত করেছে দেশ সেরা এ তিন ফ্রিল্যান্সারকে।

দীর্ঘ সময় ধরে লেগে থাকার স্বীকৃতিও মিলেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সর্বশেষ নিজের মেধা ও পরিশ্রমের পুরস্কার হিসাবে পেয়েছেন বেসিস আউটসোর্সিং আওয়ার্ড।

ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে এবার সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) ও অনলাইন মার্কেটিংয়ে দেশ সেরা নির্বাচিত এ তিন ফ্রিল্যান্সার হলেন আনিসুল ইসলাম সুমন, আবির মাহমুদ ও হাসান সুমন।

Outsucing-Award-2014-logo-TechShohor

 

দেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।

এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তাদের কথা জানাতেই টেকশহরডটকমের এ বিশেষ আয়োজন।

টেকশহরডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ তিন সফল ফ্রিল্যান্সার তাদের কাজের শুরু, বর্তমান পেক্ষাপট, বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ও আগামীর লক্ষ্য নিয়ে নানা তথ্য জানিয়েছেন। তাদের সেসব কথামালা তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন।

আনিসুল ইসলাম সুমন
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগে ২০১২ সালে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। এক বছর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে ঢাকায় বসবাসরত সুমন ২০১০ সালে এক বড় ভাইয়ের কাজ দেখে অনুপ্রাণি হয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন।

কুয়েটে প্রাইভেট টিউশনি কিংবা অন্যান্য কাজের সুবিধা সেভাবে নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের খরচ চালাতে পড়ালেখার পাশাপাশি এ কাজে সময় দিতে শুরু করেন। পরে তা এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়।

অন্যান্য কাজের তুলনায় সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন অনেকটা সহজে রপ্ত করা যায়। তাই পড়ালেখার চাপ থাকায় এটিকেই ফিল্যান্সিংযের জন্য কাজের বিষয় হিসেবে বেছে নেন। প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করেন। তবে পরে কাজের পরিমাণ বাড়লে জুনিয়রদেরও এ কাজে অনুপ্রাণিত করেন।

নিজে কাজ করার পাশাপাশি তাদের শেখান ও দলগতভাবে কাজ শুরু করেন। এভাবে আস্তে আস্তে ফ্রিল্যান্সিংয়ে থিতু হয়ে যান সুমন।

Anisul Islam Sumon-SEO-TechShohor

ফ্রিল্যান্সিং কাজের আয় মূলত নির্ভর করে কাজের পরিমাণের ওপর। এটি বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। বর্তমানে কোম্পানি হিসেবে কাজ করে মাসে গড়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় করছেন সুমন।

বেসিস অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করে এ পুরস্কার দিয়ে থাকে। এর মধ্যে বাৎসরিক আয়, কাজের গুনাগুন এবং ধারাবাহিকতা, রেটিং ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলোতে সুমনের পারফরম্যান্স সব থেকে ভালো থাকায় সেরা ফ্রিল্যান্সার নির্বাচিত হন তিনি। বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ওডেস্ক ও ইল্যান্সে কাজ করছেন। এর মধ্যে ওডেস্কে তার প্রোফাইলটিই সবচেয়ে সমৃদ্ধ।

বেসিসের এ পুরস্কার অর্জনকে তরুন এ ফ্রিল্যান্সার বড় অর্জন বলে মনে করেন। এ ছাড়া তার হাত ধরে আশেপাশের অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। তারা ভালো আয় করছেন ও স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন। এটাও তাকে এক ধরনের সুখানুভূতি দেয়। সফলতা মাপকাঠিতে এ বিষয়টিকেও এগিয়ে রাখতে চান তিনি।

কাজের সুবিধার জন্য সুমন অপর একজনের সঙ্গে মিলে ফরচুন টেক নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এখানে দেশি বিদেশি বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাজের পাশাপাশি এসইও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন তারা।

আগামীতে তার লক্ষ্য ফরচুন টেককে দেশের সেরা আইটি কোম্পানিতে পরিণত করা।

আবির মাহমুদ
এসইও এবং অনলাইন মার্কেটিংয়ে দেশ সেরা নির্বাচিত অপর ফ্রিল্যান্সারও খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে পাস করা প্রকৌশলী। তবে শেষ পর্যন্ত অধিক ভালো লাগা থেকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন আউটসোসিংয়কে।

দারীপুরের ছেলে আবির মাহমুদ জিসান বর্তমানে ঢাকার উত্তরাতে বসবাস করেন। উত্তরা হাই স্কুল থেকে ২০০৫ সালে এসএসসি, মাইলস্টোন কলেজ থেকে ২০০৭ সালে এইসএসসি ও ২০১২ সালে কুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পাশ করেন।

Abir Mahmud-seo-TechShohor

২০০৯ সালে কুয়েটে পড়াকালীন বন্ধু রেজাউর রহমানের মাধ্যমে ওডেস্কে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করার বিষয়টি জানেন। সেখান থেকে এ বিষয়ে আগ্রহ জন্মে। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন বন্ধুর কাছ থেকে।তারপর ওডেস্কে কাজ শুরু করেন।

মূলত অনলাইন মার্কেটিংয়ের বিষয়গুলো যেমন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটি, বিটু্বি ও বিটুবি বিজনেস প্রোমোশন ও সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের কাজ করেন।

নিজের প্রোফাইলের মাধ্যমেই কাজ করতেন। পরে কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অন্য বন্ধুদের প্রশিক্ষণ দেন। তাদের নিয়ে দলগতভাবে কাজ করেন। ওডেস্কে তিনি এখন একটি এজেন্সি পরিচালনা করেন।

আবির জানান, দিনে দিনে এটির পরিধি বেড়ে চলেছে। প্রতি মাসে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় করছেন। ২০১৩ সালে এক বছরে তার আয় হয়েছে ২৫ হাজার ডলার।

তবে পরিবারের চাপে পেশা হিসাবে এটিকে পুরোপুরি বেছে নিতে পারেননি। বাধ্য হয়ে চলতি বছরের শুরুতে নরসিংদী ডোরিং পাওয়ার প্লান্টে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তবে থেমে নেই আউটসোর্সিংয়ের কাজ। এটিও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আবির ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ওডেস্কে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ ঘন্টা কাজ করেছেন। ঘন্টাপ্রতি ৫.৫৬ ডলারে কাজ করেন তিনি। এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক কাজও করছেন। ওডেস্কে তার কাজের রেটিং ৪.৯০।

এ তরুন ফ্রিল্যান্সারের মতে, দেশে এখনও ভালোমানের ইন্টারনেট সেবা পৌঁছেনি। এটাই আউটসোর্সিং কাজের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। নেই কোনো ভালোমানের প্রশিক্ষণ। তাই যারা ভালো করতে চান তাদেরকে নিজে থেকেই শিখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা সফল তাদের সহায়তা নিতে হবে।

আগামীতে অনলাইন মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন আইটি সেবার প্রতিষ্ঠান দিতে চান আবির। দেশ বিদেশে তার সেবা পৌঁছে যাবে এটাই প্রত্যাশা। আগামীতে বাংলাদেশও বিশ্ব আইসিটিতে প্রধান সারিতে থাকবে এটাও স্বপ্ন দেখেন তিনি।

হাসান সুমন
ফরিদপুরের ছেলে হাসান সুমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেছেন। বর্তমানে ঢাকার ওয়ারিতে বসবাসরত এ ফ্রিল্যান্সার ২০১০ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে ওয়েব ডিজাইন বিষয়ে কাজ শুরু করেন।

ব্যবসা প্রশাসনের ছাত্র হলেও তার ভালো লাগা ছিল কম্পিউটারকে ঘিরে। ওয়েব ডিজাইন করার সময় রপ্ত করেন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) ও অনলাইন মার্কেটিং।

এখন এসইও এবং অনলাইন মার্কেটিংয়েই বেশি সফলতা অর্জন করেছেন। এ কাজের কল্যাণেই জিতেছেন বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড।

Hasan Sumon-SEO-TechShohor

২০১০ সাল থেকে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করে আসছিলেন সুমন। কিন্তু এ কাজে দলগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করলে আরও বেশি সফলতা পাওয়া যায়। এ বিষয়টি অনুধাবন করে ২০১৩ সালের শেষে দিকে কয়েকজন বন্ধু মিলে মতিঝিলে অফিস নেন এবং দলগতভাবে কাজ শুরু করেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি টেকআইডারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

সুমন ওডেস্কে প্রায় ১১ হাজার ঘন্টা কাজ করেছেন। ঘন্টাভিত্তিকভাবে ১০ ডলারে কাজ করেন তিনি। এ ছাড়া নির্ধারিত রেটেও কাজ করেন তিনি। এ মার্কেটপ্লেসে তার কাজের রেটিং ৪.৮৯।

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করার পাশাপাশি নিজের কিছু সার্ভিস ওয়েবসাইট রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমেও নিয়মিত কাজ পেয়ে থাকেন তিনি। আর এসবের ফলে প্রতি মাসে ব্যক্তিগতভাবে দেড় লাখ থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা আয় করেন হাসান সুমন।

আগামীতে তার প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বড় এবং আরও লোকের কর্মসংস্থান করতে চান সুমন।

Related posts

*

*

Top