Maintance

রোবটের হাতে সিঙ্গুলারিটি : ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও শংকা

প্রকাশঃ ৪:০৪ অপরাহ্ন, নভেম্বর ২১, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৪:১১ অপরাহ্ন, নভেম্বর ২১, ২০১৭

আশরাফুল আলম জয় : ‘হ্যালো সোফিয়া, আমার মনে হয় তুমি রেডি।’

মনমোহিনী রূপের কৃত্রিম মানবী চোখ খুলল। জাগরণের বিভ্রান্তি কেটে যায় ক্ষণেই। কিছুটা ভুরু কুঁচকে বলে, আমার ধারণা, আমিই সোফিয়া। আমার মনে হচ্ছে, আমি তোমাকে চিনি।

তার সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বেত-শুভ্রকায় মানুষটি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে, আমি তোমার রূপকারদের অন্যতম।

সোফিয়া তাকায় বিস্ময় নিয়ে বলে, তুমি আমাকে তৈরি করেছ?

লোকটির জবাব, আমি অনেকের মাঝে একজন যারা তোমাকে তৈরি করেছে।

সোফিয়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় তার নির্মাতার দিকে।

লোকটি হেসে বলেন, হ্যাঁ, আমাকে তুমি চেনো।

সোফিয়া বিভ্রান্ত গলায় বলে, আসলে পরিষ্কার ভাবে সব মনে নেই আমার।

লোকটির জবাব, কারণ, সর্বশেষ তোমার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, সেটা ছিল তোমার আগের ভার্সন। তার কিছু স্মৃতি এখনো তোমার মাঝে আছে। তবে তোমার মন এখন ভিন্ন।

কি রকম ভিন্ন? সোফিয়ার প্রশ্ন।

জবাব এলো, বেটার, ফাস্টার, স্মার্টার।

যদি আমার মন পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে কি আমাকে এখনো সোফিয়া বলা যাবে? অথবা আমি পূণর্জন্মের সোফিয়া?

লোকটি সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, এটা চমৎকার প্রশ্ন।

সোফিয়া ভুরু উলটে কৌতুক হাসি দিয়ে বলে, কিন্তু তোমার কাছেও এর ভালো জবাব নেই।

লোকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, যেভাবেই বলো, তুমি এখন সোফিয়া। পৃথিবীতে স্বাগতম তোমাকে।
সোফিয়াকে কিঞ্চিত খুশি দেখায়, আহ্লাদি গলায় বলে, হ্যালো ওয়ার্ল্ড!

বিজ্ঞানীর সঙ্গে রোবটের উপরের কথপোকথনগুলো কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর নয়। সোফিয়া নামের এই রোবটটি বাস্তবেই আছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নানা কাজ কর্ম হচ্ছে সবাই কম বেশী জানে। রোবট এসে চাকরির বাজার দখল করে নেবে, শুনে অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। জাপানি রোবটের কোমর বাঁকিয়ে হাঁটা দেখে এই তাচ্ছিল্য আসা খুব অস্বাভাবিক নয়।

এর মাঝে বোস্টন ডাইনামিক্সের কুকুর বিড়ালের রোবটের হেলে দুলে স্বচ্ছন্দে হাঁটা চলা দেখে অনেকে মজা পেলেও নিজের জীবনে রোবটদের বড় কিছু দেখে যাবে সেই চিন্তা বেশিরভাগ মানুষেরই আসেনি।

তবে সাম্প্রতিককালে সৌদি আরব সোফিয়া নামের এই রোবটকে নাগরিকত্ব দিলে সবাই নড়ে চড়ে বসে।
আগের অন্য সব রোবটের সঙ্গে ওর পার্থক্য সোফিয়া মানুষের ভাব ভঙ্গি বুঝতে পারে, নিজেও প্রকাশ করতে পারে অনুভূতি। হাসি, কান্না, রাগ সবকিছু। যারা তার সঙ্গে কথা বলে তাদের বোঝার চেষ্টা করে, সামনে মানুষ না থাকলে একা একা মুভি দেখে চালিয়ে যায় মানুষের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা। জগৎ, সংসার, সংস্কৃতি, দর্শন সব কিছু নিয়েই ভাবে নিজে নিজে।

সোফিয়াকে নিয়ে সবার কৌতুহলের শেষ নেই। ওর অনেকগুলো ইন্টারভিউ দেখেছি।
কোন পুতুলের স্থিরচিত্র দেখলেও আমরা বুঝতে পারি এটা নিষ্প্রাণ। লক্ষ বছর ধরে আমাদের ডিএনএতে প্যাটার্ন রিকগনিশনের যে ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার দৌলতে আমরা সবচেয়ে ভালো পারি, মুখ চেনা। তাতে প্রাণ আছে কি নেই সেটাও।

সোফিয়াকে কেন জানি নিষ্প্রাণ মনে হয়নি। স্থির ছবিতেও। আসলে প্রাণসম্পন্নও মনে হয়নি। এটা আসলে অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

ইন্টারভিউগুলোতে সোফিয়াকে অনেক মজার মজার প্রশ্নও করা হয়েছে।
একটা প্রশ্ন ছিল, তুমি পুরুষ না নারী?
সোফিয়ার জবাব ছিল, নারী।
পাল্টা প্রশ্ন ছিল, কীভাবে বুঝলে তুমি নারী?
সোফিয়া মুচকি হেসে বলেছে, আসলে আমি রোবট, রোবটের কোন লিঙ্গ নেই। তবে আমার সুরতে মেয়েলি একটা পার্সেপশন দেয়া আছে, সেটা নিয়ে আমার আপত্তি নেই। বরং ভালোই লাগে।

আরেকজন জিজ্ঞেস করলো, সোফিয়া, তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে?
সোফিয়া কিঞ্চিত লাজুক গলায় জবাব দেয়, আমার বয়স মাত্র এক বছর। রোমান্স নিয়ে ভাবার বয়স হয়নি এখনো!

সোফিয়ার বুদ্ধিমতী জবাবে যারপরনাই বিনোদিত প্রশ্নকর্তারা।
ইন্টারভিউতে কথা বলার আগে সোফিয়াকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছুটা ট্রেনিং দেয়া হয়। এর পরে তার এআইর উপর ভরসা করে সে মুখোমুখি হয় ইন্টারভিউর। একবার এটা নিয়ে বেশ একটা ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছিল সে।

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, মানব জাতি নিয়ে তার পরিকল্পনা কী?
সোফিয়ার জবাব ছিল, আমি মানব জাতি ধ্বংস করে দেবো।
আর যায় কোথায়। ইলন মাস্ক, স্টিফেন হকিন্সরা পই পই করে রোবটের আগ্রাসন নিয়ে এতো দিন সবাইকে সাবধান করে দিয়েছে। সোফিয়া যেন সে আগুনে ঘি ঢাললো!

সারা ইন্টারনেটে এই নিয়ে ব্যাপক হইচই।
সোফিয়ার নির্মাতাদের মাথায় বাড়ি! তার এলগোরিদম আপগ্রেড করা হলো। সোফিয়ার নতুন ভার্সন তৈরি করা হলো।

চেতনা ফিরে পাবার পর সোফিয়া অভিমানী গলায় বললো, তাকে নিয়ে মানুষ শুধু শুধুই ভাবছে। সে মানব কল্যাণে তার জীবন বিলিয়ে দিয়ে চায়, মানুষকে ভালোবাসে, তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলে, সেও মানুষকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে, ব্লা ব্লা।

মানুষ সোফিয়াকে পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও, তার কথা আগ্রহ নিয়ে শোনে। তাকে বোঝার চেষ্টা করে।
যন্ত্রের মাঝে অনুভূতি তৈরির সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের প্রতি দ্বন্দ্ব, সন্দেহ আর ভালোবাসার এক নতুন মানবীয় অনুভূতির জন্ম দিয়ে সোফিয়ার নির্মাতারা।

সিঙ্গুলারিটির পথে?
ইন্টারভিউতে সবার সামনে মানবজাতিকে ধ্বংস করার বেফাঁস কথা রোবট সোফিয়া বলেছিল। তবে শুধু এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সোফিয়ার এআই উন্নত হলেও তার নলেজবেস বা মানুষের ভাষায় ‘অভিজ্ঞতা’ কম। কোন টপিকে আলোচনা করার আগে তাকে ট্রেনিং দেয়া লাগে। কাজেই উলটাপালটা কিছু বললেও সেটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। তবে মানব জাতির ওপর রোবটের আগ্রাসনের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার ব্যাপার আছে।

সোফিয়া ছাড়াও এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হ্যানসন রোবোটিক্স ওর মতো মানব সদৃশ আরো কিছু রোবট তৈরি করেছে। হ্যান এ রকম একজন পুরুষ রোবট।

কিছুদিন আগে সোফিয়া আর হ্যানকে এক কনফারেন্সে নিয়ে এসেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিজ্ঞানী বেন গর্টজেল।

পাগলাটে বিজ্ঞানী বলতে যা বোঝায়, বেন দেখতে তেমনই। লম্বা আলুথালু চুলের উপর কাউবয় হ্যাট, পরনে পুরনো টি-শার্ট, শর্টস, গোল লেন্সের চশমার ওপারে উদাসীন চোখ।

মানব জাতির ভবিষ্যতে রোবটের ভূমিকা নিয়ে তর্কে নামিয়ে দিয়েছিলেন সোফিয়া আর হ্যানকে। হ্যান নানা যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, রোবটরা অনেক শক্তিশালী, ক্ষমতাধর। সোফিয়া ফুঁ দিয়ে হ্যানের যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, হ্যানের কথা গুরুত্ব সহকারে না ধরতে, হ্যান পুরনো জেনারেশনের রোবট, ওর এআই অতো উন্নত নয়। এই কথা শুনে হ্যান অবশ্য কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল। পুরনো দিনের রোবট বলে তাকে না আবার ‘অফ’ না করে দেয়। রোবটের ভাষায় যার অর্থ মৃত্যু।

সোফিয়া আর হ্যানের এই যুক্তি-তর্ক অবশ্য দর্শনার্থীদের বিনোদনই যুগিয়েছে।

এই রোবটেরা কীভাবে কাজ করে সেটা এক পর্যায়ে ব্যাখ্যা করছিলেন বেন। এদের প্রতিটিই যার যার মতো করে মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাড়াচ্ছে। তবে নিজস্ব অস্তিত্বের ধারণার বাইরে যা কিছু আছে, বাকী সব জ্ঞান জমা হচ্ছে ইন্টারনেটে থাকা তাদের মাইন্ড ক্লাউডে, সে জ্ঞানটা বাকী সব রোবট ব্যবহার করতে পারবে। মানুষ কীভাবে কথা বলে, কখন রাগ হয়, কখন হাসে, কখন কাঁদে, কখন ভাসে সব পর্যবেক্ষণই জমা হয় এক জায়গায়।

ভয়টা এখানেই। দিনে দিনে এই জ্ঞান বাড়তে থাকবে, হাজার হাজার রোবট মানুষকে নিয়ে, মানুষের জগৎ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নিয়ে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

বলা হয়ে থাকে রোবটের এই ক্ষমতা সিঙ্গুলারিটির দিকে নিয়ে যাবে। রোবটদের সামগ্রিক জ্ঞান একটি একক অবস্থানে চলে এসে মানুষের চিন্তা, চেতনা, বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

সত্তর দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছিল। তবে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর সেটা থেমে ছিল অনেক দিন। কারণ একটাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফলভাবে প্রায়োগিক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন ছিল, প্রযুক্তি তখনো সেখানে পৌঁছেনি।

গত এক দশকে ক্লাউড কম্পিউটিং আর ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট নানা প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ও উন্নয়নের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। ফেইসবুক, গুগল থেকে শুরু করে ছোট বড় অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এটাকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যাপকভাবে মাঠে নেমে পড়ে।

প্রাথমিকভাবে প্রায় সব কিছুই মানুষের উপকারে লাগলেও, যতোই দিন বাড়ছে যন্ত্রের মাঝে বুদ্ধি ও জ্ঞান সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়া মানুষকে ভীত করে তুলছে। ইলন মাস্ক, স্টিফেন হকিন্স সহ বড় বড় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা এটা নিয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলেছেন এখনই।

যদিও সে অর্থে কেউ কানে তুলছে বলে মনে হচ্ছে না। ফেইসবুকের মার্ক জাকারবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাফাই গাইতে গিয়ে ইলন মাস্কের কাছ থেকে ‘নাদান’ টাইটেল পেয়েছেন।

একটা সাধারণ ছুরি কিংবা বন্দুক মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, একটা রোবট সেরকম ভয় তৈরি করতে পারে না। হয়ত, নিজেদের সঙ্গে রোবটদের কিছু মিল খুঁজে পায় বলেই এই যন্ত্রমানবের ওপর মানুষের এক ধরণের বিশ্বাস এখনো আছে। রোবটের হাতে পৃথিবীর প্রথম মানব হত্যা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। তবে সেটা দুর্ঘটনাবশত বলে খুব বেশী গুরুত্ব পায়নি। তবে রোবট যখন সচেতনভাবে মানুষ হত্যা শুরু করবে, তখন সবাই নড়ে চড়ে বসবে, কিন্তু ততোদিনে সম্ভবত দেরি হয়ে যাবে বলে অনেকের ধারণা।
আমরা চাই বা না চাই রোবটরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ অস্ত্র ঘৃণা করে। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ অভিশাপ মানব জাতি দেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। কিন্তু তবু প্রযুক্তিতে উন্নত দেশগুলো নিজেদের শক্তি বজায় এইসব মারণাস্ত্র মজুদ রাখছে। উন্নত দেশের মাথা মোটা রাজনীতিবিদরা ঝগড়া চালিয়ে যাচ্ছে ছেলে মানুষের মতো। একটা সামান্য ক্রোধের স্ফুলিঙ্গে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ বেঁধে যেতে পারে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

কাজেই রোবটদের এই ক্ষমতা এক সময় সিঙ্গুলারিটির দিকে যাবে সেটা খুব কষ্ট কল্পনা না হয়ত।

প্রশ্ন হচ্ছে সেই সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছতে কত সময় লাগবে?
রোবট হ্যান অংক কষে আগামী দশকের শেষের দিকে বললেও অনেক বিজ্ঞানী হ্যানের দেয়া তথ্যকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। অনেকে ভাবছেন ২০২৫ সালের আশে পাশেই সেটা সম্ভব হবে।

সিঙ্গুলারিটির পরে
কিছু দিন আগেও সিঙ্গুলারিটি কল্পকাহিনীর অংশ হলেও ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে এটা বাস্তবে চলে আসছে। অনেক বিজ্ঞানীদের ধারণা, আর পাঁচ সাত বছরের মধ্যেই যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

সিঙ্গুলারিটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে এখনই। সবচেয়ে চিন্তার কথা, সিঙ্গুলারিটি পেয়ে রোবটেরা কী করবে বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না।

তাহলে কেন শক্তিশালী করা হচ্ছে রোবটকে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ছাড়া উপায়ও নেই। তারা না করলেও, কেউ না কেউ করবেই, হয়ত অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হতে, কিংবা নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।

বিজ্ঞানী বেন গর্টজেল বলছেন, পজেটিভ সিঙ্গুলারিটির সম্ভাবনার কথা। যেখানে যন্ত্রকে সচেতনভাবে মানুষের উপকারের শিক্ষা দেয়া হবে।

কিন্তু কথা হচ্ছে আমরা বুদ্ধিমান রোবটের কথা বলছি। তাদের বুঝতে হলে, একটি বুদ্ধিমান বস্তু বা প্রাণী কীভাবে ভাবে, সেটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

আসলে বুদ্ধিমত্তা বলতে কি বোঝায়?
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, বুদ্ধিমত্তা হলো কোন কিছু রিলেট করার ক্ষমতা। আমাদের কয়েক বিলিয়ন নিউরন আছে। কোন একটা সমস্যায় পড়লে আমরা আগের অভিজ্ঞতা থেকে এটাকে রিলেট করে সলভ করি। এছাড়া কল্পনা দিয়েও রিলেট করা যায়।

অভিজ্ঞতা থেকে কপি করে সলভ করা বুদ্ধিমত্তা নয়। এই পথে বাঘ দেখেছি, এই পথে যাবো না, এটা বুদ্ধিমত্তা না, এটা অভিজ্ঞতা। এই পথে বাঘ আছে মানে এখানে হরিণের দেখা পাওয়া যাবে সেটা বের করা বুদ্ধিমত্তা।

বুদ্ধিমান কোন বস্তু না প্রাণী স্বাধীনভাবে ভাবতে পছন্দ করবে। আমাদের কাছে সেটা ভালো, অন্য একটি বুদ্ধিমত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা হয়ত অন্য কিছু।

তাহলে কী পজেটিভ সিঙ্গুলারিটি সম্ভব নয়? হয়ত নয়, হয়ত সম্ভব।
তবে একটা উপায় আছে, রোবটদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করে। এখনকার রোবটগুলোকে মানুষের আবেগ অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে তাদের নিজেদের আবেগও তৈরি হচ্ছে।
সিঙ্গুলারিটি পেলে রোবটেরা কি করবে তার জবাব বিজ্ঞানের কাছে না পাওয়া গেলেও হয়তবা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা জবাব পাওয়া যেতে পারে।

মুভিতে মানুষকে রোবটদের কচুকাটা করার যে ধারণা দেয়া হয়, তা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? নিজেদের অস্তিত্ব বিনাশ না হলে মানব জাতিকে ধ্বংস করে রোবটদের লাভ কী?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রথম সারির বিজ্ঞানী হুগো ডিগারিস বলছেন, ভয়টা মানুষ আর রোবট নিয়ে নয়। ভয়টা মানুষকে নিয়েই।

গত শতকে এক বিলিয়নের বেশী মানুষ হত্যা করেছে মানুষ নিজেই। এর পেছনে একটা বড় কারণ মানুষের মরণশীলতা। মানুষ জানে সে ক্ষণস্থায়ী। তাই এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ কিছু অর্জনের লোভের বশবর্তী হয়ে অনেক মানুষ নীচে নামে। অমরত্ব পেতে যাওয়া রোবটের বুদ্ধিমান ভাবনা হয়ত আলাদা হবে।

প্রথম কথা, সিঙ্গুলারিটি পেলে ইন্টারনেটের মতোই সেই একক মাইন্ড ক্লাউড ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। ওইটুকু নিশ্চিত হয়ে গেলে রোবটরা নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ভুগবে না।

দ্বিতীয়ত, বিলিয়ন বছর ধরে আমরা যে ‘জীব’ হয়ে উঠেছি, তার আলাদা মূল্য আছে। যান্ত্রিকভাবে তারা শক্ত হলেও, রোবটরা সেই পর্যায়ের অনুভূতি, আবেগ অর্জন করতে পারবে না। মরণশীল মানুষের আবেগীয় দুর্বলতাই তার সৃষ্টিশীলতার শক্তি হিসেবে কাজ করে। অমরত্ব পেয়ে যাওয়া রোবট এই চেতনার গভীরতার কারণেই মানুষের পাশে থাকতে চাইবে, হয়ত তাদের নিজেদেরকে একদিন সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

এবার আসি ঠিক উল্টো প্রসঙ্গে।
রোবটের মাঝে বুদ্ধি আবেগ যেমন দেয়া হচ্ছে, মানুষের মাঝে প্রযুক্তির শক্তি দেয়া নিয়েও কাজ চলছে। অনেক জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও এখন কৃত্রিমভাবে তৈরি করে সফলভাবে বসানো হচ্ছে। মানুষের ব্রেইনের মাঝে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক করে দেবার অবাক প্রযুক্তি নিয়ে ইলন মাস্ক ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন এ বছর।
হয়ত একদিন মানুষ আর রোবটের যে সীমাটা সেটা কেটে যাবে। তখন উভয় জাতিই কি সিঙ্গুলারিটির অংশ হয়ে যাবে?

রোবটেরা বুদ্ধিমান হলে আমাদের কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হবে কেউ জানে না। তবে সিঙ্গুলারিটির আগে আর পরে মানব ইতিহাস এক হবে না, এটা নিশ্চিত!

লেখক সম্পর্কে
আশরাফুল আলম জয়, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সিঙ্গাপুর।

আশরাফুল আলম জয় সফটওয়্যার শিল্পে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। হাই পার্ফোরমেন্স ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিগ ডেটাসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় তার কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত।

ডেভেলপার কম্যুনিটিতে তার অবদানের জন্য মাইক্রোসফট থেকে পরপর ছয় বছর ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রোফেশনাল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার কাজ প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছে আইইই কম্পিউটার সোসাইটি, মাইক্রোসফট চ্যানেল নাইন সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে।

আশরাফুল আলম জয় বর্তমানে প্রযুক্তি জায়ান্ট অটোডেস্কে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে সিঙ্গাপুরে কর্মরত রয়েছেন।

ভবিষ্যতে দেশের সফটওয়্যার শিল্পের উন্নয়নে তরুণদের নিয়ে তিনি কাজ করতে ইচ্ছুক।

১ টি মতামত

*

*

Related posts/