দেশে ই-কমার্স ব্যবসার হাঁটিহাঁটি পা পা

কামরুল হাসান ইমন : ক্লাসিফাইড সাইট হিসেবে বাংলাদেশে ক্লিকবিডিডটকম আত্মপ্রকাশ করে ২০০৫ সালে। এবং বলা চলে তখন থেকেই দেশে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু। আর বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে বিশ্বে ই-কমার্স ব্যবসার প্রচলন শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ব্রিটেনে। এরপর ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময়ে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসায় আসলেও তেমন সাড়া জাগানো কিছু করতে পারেনি। তবে সব কিছু বদলে যায় ১৯৯৫ সালে আমাজন (Amazon.com) এবং ই-বে (ebay) যাত্রা শুরুর পর।Kamrul Hasan Emon-TechShohor

আমাজনের সাইট চালুর ১০ বছরের মধ্যে আমাদের দেশেও শুরু হয় এ ব্যবসার পথচলা। কিন্তু ক্লিকবিডিডটকম সাইটটি শুধু ক্ল্যাসিফাইড সাইট (ক্রেতা চাইলে তার ব্যবহৃত/অব্যবহৃত পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতে পারেন) হওয়ায়, এটি তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। যেমনটা ২০১১ সালে এখনিডটকম শুরুর পর হয়েছিল।

সে হিসাবে বলতে গেলে ই-কমার্স ইন্ডাষ্ট্রির বয়স বাংলাদেশে খুব বেশি নয়। আমরা বলতে গেলে এখনও বর্তমানেই আছি, বলার মত অতীত তৈরি হয়নি। ২০১১ থেকে এ পর্যন্ত এ খাতে অনেক নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান আসছে। একটি খাতের জন্য একটি ভালো খবর। কারণ এতে এ খাতের আকার বড় হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে ভাবার ও চিন্তার অবকাশ রয়েছে।

কোনো খাত বড় হতে থাকলে তা সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে শুরুতেই নিয়মনীতি মেনে না এগোলে আমাদের অনেক বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। এখনও পর্যন্ত এ ব্যবসার তেমন কোন নিয়মনীতি আমাদের দেশে নেই। এমনকি ব্যবসার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়নি। এ কারণে বর্তমানে যারা ব্যবসায় করছেন তারা যার যার ইচ্ছা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এটির ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি খারাপ দিকগুলোও বলে শেষ করা যাবে না।

নিয়মনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলে হয়তো এ বিষয়গুলো অনেক ভালোভাবে তদারক করা যেত। একই সঙ্গে যারা নতুন করে এ ব্যবসায় আসতে চাচ্ছেন তাদের জন্যও তা অনেক বেশি কার্যকর হতো।

দেশে ই-কমার্স ব্যবসার সীমাবদ্ধতা
দেশের নগরগুলোতেই এখনও এ ব্যবসার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। যদিও স্বল্প পরিসরে কিছু গ্রামীণ এলাকা থেকেও প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের অর্ডার পেয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ ইন্টারনেট সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়নি। ইন্টারনেট যত দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছোবে ততো দ্রুত এ ব্যবসার ব্যপ্তি বাড়বে।

আরও বড় সমস্যা ইন্টারনেটের গতি। উচ্চ গতির ব্যান্ডউইথ পেতে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। ইন্টারনেট সহজলভ্য হলে এ ব্যবসার প্রচার এবং প্রসার ঘটবে। এতে মার্কেট সাইজও বেড়ে যাবে অনেকগুণ।

পণ্যের যাচাই বাছাই এবং দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কারণ এ দুটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠান এবং ইন্ডাষ্ট্রির ভবিষৎ ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।

এ বিষয়গুলোকে একটা স্টান্ডার্ড মানে নিয়ে যেতে না পারলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। কেননা সবসময় অবশ্যই অফলাইন বাজারের কথাটি মাথায় রেখে এগোতে হবে। অনলাইন বাজারে ক্রেতা পণ্য হাতে না ধরে অর্ডার করছে। সুতরাং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে ক্রেতার সন্তুষ্টি ধরে রাখা জরুরি। পণ্য হাতে পাওয়ার পর ক্রেতার মধ্যে যাতে অসন্তুষ্টি না আসে সেটা ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা
পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সময়ের পরিক্রমায় অনেকটা এগিয়েছে। অনেকগুলো কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান শুধু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য সরবরাহের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। এ কার্যক্রম পরিচালনায় আইটির ব্যবহার খুব একটা হচ্ছে না। আইটির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ই পণ্য সরবরাহের কোন স্টেজে আছে তা জানতে পারবেন। এতে ব্যবসা আরও গতিশীল হবে।

ই-কমার্স সাইটগুলোর অবকাঠামো এবং লে-আউট
ই-কমার্স সাইটগুলোর অবকাঠামো এবং লে-আউট যতটা সম্ভব ইউজার ফ্রেন্ডলি করে সাজাতে হবে। দেশের মানুষ জন এখনও অনলাইনে কেনাকাটার ব্যাপারগুলোতে অভ্যস্ত হতে পারেনি।

ক্রেতা টানতে প্রথমে সাইটের ডিজাইন দিয়ে তাকে আকৃষ্ট করতে হবে। এরপর তাকে ধরে রাখতে সাইটটি যাতে ইউজার ফ্রেন্ডলি হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আমি নিজেও এমন অনেক সাইট দেখেছি যেগুলো ইউজার ফ্রেন্ডলি না হওয়ায় ক্রেতা টানতে পারেনি। সুতরাং ব্যবসাকে লাভজনক করতে হলে ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে হবে।

পেমেন্ট গেটওয়ে
পেমেন্ট গেটওয়ে নিরাপদ কিনা সেটাও একটা বড় বিষয়। যদিও দেশে এখনও সেই রকম অনিরাপদ কিছু ঘটেনি। বিশ্বের অনেক দেশে হরহামেশা হ্যাকাররা জালিয়তি করে যাচ্ছে। দেশে ব্যবসাটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায়, শুরু থেকে ক্রেতার পেমেন্টের নিশ্চয়তাটি ভালোভাবে দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে কাজও করতে হবে।

ভবিষৎ পরিকল্পনা
আমরা যারা ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে অবশ্যই ব্যবসার আওতা (পণ্যের ধরণ বৃদ্ধি এবং দেশের প্রতি এলাকায় কার্যক্রম বৃদ্ধি) বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে বহি:বিশ্বে দেশি পণ্যের প্রসার বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। পণ্যের গুনগত মান এবং সেবা ভালো হলে বিশ্ব বাজারেও স্থান করে নেওয়া কঠিন কিছু হবে না।

আর নতুন যারা এ ব্যবসায় আসতে চাচ্ছেন তাদেরকে বলবো, এ বিষয়ে আরও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকে থাকতে হলে পরিকল্পনার পাশাপাশি চাই বাজার গবেষণাও। হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেমে পরলে, হুট করেই হয়তো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হতে পারে। জেনে বুঝে ভালো পণ্য এবং সেবা নিয়ে বাজারে না আসলে ক্রেতারা প্রথমে ব্যাপারটি না ধরতে পারলেও অতি দ্রুত তা বুঝে যাবে। তখন আপনার পাশাপাশি এ খাতও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

কামরুল হাসান ইমন
প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা অংশীদার
সিভি স্ট্রিট

Related posts

*

*

Top