Maintance

সিটিসেলের অতীত ও আমি

প্রকাশঃ ৬:৪১ অপরাহ্ন, জুলাই ২৪, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৪৮ অপরাহ্ন, জুলাই ২৪, ২০১৭

মাহমুদ হোসেন, চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার, গ্রামীণফোন : সিটিসেলের লাইসেন্স বাতিল সংক্রান্ত খবরটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, এই পরিণতির ব্যাপারটা প্রায় সবারই জানা ছিল। এখন আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে মাত্র।

দেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর এই অবস্থায় কীভাবে এলো সেটা একাডেমিক আলোচনার বিষয়, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। কোম্পানিটির সঙ্গে আমার অনেক পুরোনো এবং যথেষ্ট লম্বা সময়ের সংশ্লিষ্টতার কারণে একে ঘিরে আমার অনেক স্মৃতি। সিটিসেলের অতীত, আমার কিছু স্মৃতি ও কিছু ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই আজকের লেখা।

আমার জীবনের প্রথম চাকরি সিটিসেলে। সঠিকভাবে বলতে গেলে আরও আগে ‘হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম’ নামে একটি যৌথ (৫০-৫০) মালিকানাধীন কোম্পানিতে, যেটা বাংলাদেশে মোবাইল সেলুলার সেবা চালু করার প্রথম লাইসেন্স পায়। একটি অংশীদার ছিল হংকংয়ের বিখ্যাত ধনকুবের লি কা শিং-এর মালিকানাধীন ‘হাচিসন টেলিকম’ আর অন্যটি শাহজাদ আলী নামে বাংলাদেশি এক দূরদর্শী উদ্যোক্তার ‘বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড’।

শাহজাদ আলীকে দূরদর্শী বললাম এই কারণে যে, ১৯৮৯ সালে উনি যখন বাংলাদেশে মোবাইল সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটা ছিল আমাদের সেই সময়ের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্টই উচ্চাভিলাষ। উপমহাদেশে শ্রীলঙ্কা তার আগের বছর চালু করেছিল, আর ভারতে তো মোবাইল এসেছে আরও অনেক পরে ১৯৯৫ সালে।

citycell_techshohor

হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম’-এর লাইসেন্সের প্রক্রিয়াটা এখনকার সময়ের বিচারে স্বচ্ছ ছিল না। তবে সেই সময়ে দেশে এ ব্যাপারে কোনো আইনগত কাঠামোও ছিল না। সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি) ছিল একাধারে একমাত্র অপারেটর অন্যদিকে রেগুলেটর। বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (বিটিএল)-এর বরাবর ইস্যু করা বিটিটিবির এক পাতার একটা চিঠিই ছিল সেলুলার ( পেজিংসহ আরও তিনটি) সেবা প্রদানের লাইসেন্স। আর লাইসেন্সটা ছিল পাঁচ বছরের জন্য এক্সক্লুসিভ।

সেই সময়টাতে আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী ও বিশিষ্ট বন্ধু অদুদ শিকদার আর আমি মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা দুজনে আগামী তিনমাস কোনো চাকরি খুঁজবো না, শুধুই আয়েস করে কাটাবো। কিন্তু বন্ধু অদুদ আমাদের অলিখিত শপথ ভেঙ্গে পাশ করার এক মাসের মাথায় বিটিএল-এ চাকরি নিয়ে নিল। তার কয়েকদিনের মধ্যেই অদুদের ফোন – আমাকে বিটিএল-এ চাকরির ইন্টারভিউতে হাজির হতে হবে পরের দিনই। এবার আমি শপথ ভাঙ্গলাম যার জন্য আমার মোটেই অনুতাপ হল না।

ইন্টারভিউতে সর্বসমেত দুটি প্রশ্ন ছিল।

শাহজাদ আলীঃ আপনি এখন কি করছেন?

আমিঃ স্যার, আমি মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি।

শাহজাদ আলীঃ এখানে চাকরি করলে তো মাস্টার্স করা যাবে না।

আমিঃ মাস্টার্স করবো না।

এরপর শাহজাদ আলী আমার রেজ্যুমের ওপর খসখস করে কি যেন লিখলেন, বুঝলাম চাকরিটা হয়ে গেছে! আধঘণ্টার মধ্যেই নিয়োগপত্র হাতে পেলাম। ওই দিন ২১ জানুয়ারি, ১৯৯০ থেকেই চাকরি কার্যকর। মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে তিন হাজার টাকা! প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমি জীবনে যেসব মানুষের কাছে ঋণী এবং সেই ঋণ শোধ হবার নয়, অদুদ তাদের অন্যতম – শুধু প্রথম চাকরির জন্য নয় আরও অনেক কারণে।

অদুদ আর আমার পর কয়েক মাসের মধ্যেই আরও চারজন সহকর্মী আমাদের টেকনিক্যাল টিমে যোগ দেয়– জাহেদ কবির, ফয়জুল রতন, রোকসানা শিরিন ও জহুরুল আলম চৌধুরী। সেপ্টেম্বর হতে নভেম্বর মাসে নেটওয়ার্ক বসানো হয়, ঢাকায় মাত্র তিনটি বেইজ স্টেশন আর একটি সুইচ নিয়ে খুবই ছোট এএমপিএস নেটওয়ার্ক, যেটাকে এখনকার পরিভাষায় ওয়ানজি বলতে হবে। মগবাজার বিটিটিবি এক্সচেঞ্জের পাঁচ তলায় আমাদের সুইচরুম। বেইজ স্টেশনগুলোও বিভিন্ন বিটিটিবি এক্সচেঞ্জে–মগবাজারে, উত্তরায় ও নারায়ণগঞ্জে।

প্রথমদিকে নেটওয়ার্ক বসানোর সময় অর্গানাইজেশন বলতে ছিল আমরা ছয়জন তরুণ প্রকৌশলী। মনে পড়ে সেদিনের কথা যেদিন আমরা ক’জন ‘ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট’-এর সাথে মিলে এয়ারপোর্ট থেকে নেটওয়ার্কের যন্ত্রপাতি ছাড়িয়ে, টঙ্গী হতে ট্রাক ভাড়া করে সারারাত জেগে মগবাজারে পাঁচতলার ওপর সুইচরুমে ওঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম।

নেটওয়ার্ক বসানোর পর যখন টেস্টিংয়ের কাজ চলছে তখন এক বিপত্তি দেখা দিল। ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্টের সখ্যতার কথা বিবেচনায় নিয়ে আশু বিপদের আশংকায় বিটিএলের স্বত্বাধিকারী শাহজাদ আলী বিদেশে পাড়ি জমালেন। এদিকে বিটিটিবি বিটিএলের নামে ইস্যুকৃত সেলুলার লাইসেন্সটা বাতিল করে দিল। লাইসেন্স বাতিলের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বিটিএল হাইকোর্টে মামলা ঠুকলো। হাইকোর্ট থেকে ‘স্থিতাবস্থার আদেশ’ পেলেও বিটিটিবি তার নেটওয়ার্কের সাথে ইন্টারকানেকশন দিতে রাজী হল না।

tower-techshohor

উপায়ান্তর না পেয়ে ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি আমরা মোবাইল-টু-মোবাইল সেবা চালু করলাম। বলাই বাহুল্য, গ্রাহকের সংখ্যা ছিল দুইশরও কম।
পরবর্তী দুই বছর আমরা ক’জনে মিলে কয়েকশো গ্রাহককে (যারা সোয়া লাখ টাকা দিয়ে হ্যান্ডসেট কিনে মিনিটে দশ টাকা করে ইনকামিং ও আউটগোয়িং দু’দিকেই কলচার্জ দিতেন) সেবা দেবার জন্য নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখছি। এই সময় আমি আইবিএতে এমবিএর সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামে ভর্তি হলাম। কাজের চাপ কিছুটা কম, তদুপরি তখনও ব্যাচেলর, তাই বেশ জোরেশোরেই এবং কৃতিত্বের সাথে কোর্সগুলো শেষ করছিলাম। এর মধ্যে অদুদ ফিলিপস-এ যোগ দিল আর রোকসানা পাড়ি দিল আমেরিকায়। আমাদের সাথে যোগ দিল কাজী আসিফ ইকবাল ও জাহিদ হোসেন।

পরবর্তীতে আরও দুজন জাহেদ ও জাহিদ চলে গেলো আমেরিকায়। আরও পরে আসিফ গেলো প্রথমে মাস্টার্স করতে থাইল্যান্ডে ও পরে গ্রামীনফোনে (এখন কানাডা হয়ে আমেরিকায়), রতন মধ্যপ্রাচ্যে আর জহুরুল বিসিএস দিয়ে বিটিটিবিতে। মগবাজারে কাজ করার সময় প্রায়ই আমরা বিটিটিবি কর্মচারী ইউনিয়নের লোকজন দিয়ে ঘেরাও হতাম টেলিযোগাযোগ খাতকে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের অংশ হিসেবে। এ নিয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার।

এর মধ্যে শাহজাদ আলী তখনও দেশে ফিরছেন না। মামলা চলতে চলতে ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝিতে এসে অনেকটা হতাশ হয়ে মালিকদের দু’পক্ষই তাদের শেয়ার প্যাসিফিক গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। কোম্পানির নতুন নামকরণ হয় ‘প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম’ এবং ব্র্যান্ডের নাম ‘সিটিসেল’। মালিকানা হস্তান্তরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোম্পানির পক্ষে রায় বেরুলো, তার মানে লাইসেন্স বহাল থাকল। ওই বছরেরই ১১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিটিবির সাথে ইন্টারকানেকশনসহ সিটিসেলের নতুন করে যাত্রা শুরু হল। চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান সাহেবের তরুণ পুত্র ফয়সাল খান সাহেব সদ্য আমেরিকা থেকে এসে মালিকদের পক্ষ থেকে কোম্পানির মূল হালটি ধরলেন।

১৯৯৪ সালে পাঁচ বছরের এক্সক্লুসিভিটির মেয়াদ পার হলে সরকার আরও সেলুলার লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলে সিটিসেল আবার মামলা করে বসে এই কারণ দেখিয়ে যে কোম্পানিটি আগের মামলার কারণে পুরো পাঁচ বছর এক্সক্লুসিভ ব্যবসা করতে পারেনি। এই পরের মামলায় সিটিসেল হেরে যায়। হেরে গেলেও মামলা চলার সময়ের কারণে সিটিসেল আরও দেড় বছরের মতো বেশি অতিরিক্ত এক্সক্লুসিভিটি পেয়ে যায়। মামলার রায়ের পর সরকার আরেক দফা লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে এবং ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে তিনটি নতুন লাইসেন্স প্রদান করে–গ্রামীণফোন, একটেল (বর্তমানে রবি) ও সেবা টেলিকম (বর্তমানে বাংলালিংক)। ১৯৯৭ সালের মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যেই ওই তিনটি নতুন অপারেটর তাদের সেবা চালু করে। এর পরের ইতিহাস এই লেখার বেশিরভাগ পাঠকেরই জানা আছে।

সিটিসেলে পরবর্তী প্রায় কয়েক বছর অনেক ঘটনার মধ্যে পার করেছি। অনেকে আমার সহকর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছে। কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। আমাকে অনেক দিক সামলাতে হতো বলে অনেক কিছু হাতেকলমে শেখার সুযোগ হয়েছে, সে হিসেবে সিটিসেলের কাছে আমি অনেকটাই ঋণী। ফয়সাল সাহেব আমাকে অতটা পছন্দ করতেন না (সেটা অবশ্য উনি বোঝাতে দ্বিধা করতেন না) তাতে একটু সমস্যা হতো বৈকি। এর মধ্যেও ম্যানেজ করে চলার অভিজ্ঞতাটাও আমার জীবনে পরবর্তীতে অনেক কাজে লেগেছে নিঃসন্দেহে।

সবশেষে সিটিসেল থেকে আমার বিদায়ের ঘটনা। যদিও সেটা আমার জন্য মোটেই সুখকর ছিল না। তখন ১৯৯৯ সালের শেষের দিক। পত্রিকায় ‘মনোয়ার অ্যাসোসিয়েট’ নামে এক ‘হেড-হান্টার’ টেলিকম সেক্টরে একটা চাকরির বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে। আমি দেখেছি আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ পরের দিন। বিজ্ঞাপনের ভাষা পড়েই অনুমান করা গেলো যে ওটা গ্রামীণফোনের জন্য। সময় পেরিয়ে গেলেও আবেদন করলাম এবং সিলেক্টেডও হলাম। অ্যাপয়েন্টমেন্টের চিঠি হাতে পেয়ে সিটিসেলে পদত্যাগ পত্র জমা দিলাম। কিন্তু ওখানে বাধল আমার জন্য এক বড় বিপত্তি।

চাকরি ছেড়ে গ্রামীনফোনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারটা সিটিসেল কর্তৃপক্ষ একেবারেই পছন্দ করেনি। তারা এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিল যে সিটিসেল হতে রীতিমত আমার নিয়োগ বাতিল করার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল। আর গ্রামীণফোনও কিছুটা বিচলিত হয়ে অনেকটা অবিবেচকের মতো আমাকে জানিয়ে দিল যে, আমাকে তারা নেবে না। আমি পড়ে গেলাম মহাসংকটে। একদিকে সিটিসেলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি, অন্যদিকে গ্রামীণফোন আমাকে নেবে না। কীভাবে ওই মহাসংকট থেকে পরিত্রাণ পেলাম তা এক বড় অধ্যায় এবং সেটা এখানে বিশদ বলাটা শোভন হবে না। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে জীবনের প্রথম চাকরিতে পুরো দশ বছর পার করে ইতি টানলাম। দশ বছর অনেক সময়, অনেক স্মৃতি, অনেক অভিজ্ঞতা, অনেক পাওয়া সিটিসেল থেকে। আজ সিটিসেলের আশু প্রস্থানের সময়ে অনেক কিছু মনে পড়ছে।

লেখক বাংলাদেশে মোবাইল ফোন শিল্পের শুরুর দিকের প্রকৌশলী। দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সবেচেয়ে অভিজ্ঞদের একজন ।

*

*

Related posts/