স্টার্টআপের স্বপ্নের ভুবন

আশরাফুল আলম জয়, সফটওয়্যার স্থপতি, সিঙ্গাপুর : শুনতে অবাক হলেও এটা সত্যি নিজের প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান শুরুর সেরা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনোর সময়টাই।

নতুন প্রতিষ্ঠান মানেই প্রচুর শ্রম-মেধা ও সময় ব্যয় করতে হয়। নিজের প্রতিষ্ঠান বলে প্রাথমিক ব্যবসায়িক পর্যায়ের ঝুঁকি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনোর পরের সময়টা যেমন উদ্যম থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তেমনি সংসার জীবনের দায়-দায়িত্ব কম থাকে বলে এ সময়ে ছোট-বড় ঝুঁকি নেওয়া সহজ হয়।

Ashraful Alam Joy-TechShohorবর্তমানে বিশ্ব কাঁপানো মাইক্রোসফট, ফেইসবুক কিংবা গুগলের শুরুটাও কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পেরুনো (এবং না পেরুনো!) তরুণদের উদ্যোগের ফসল। শুধু এ তিন টেক জায়ান্ট নয়, এ কাতারে প্রতি মাসেই যুক্ত হচ্ছে আরও শত শত প্রতিষ্ঠান।

আজকের প্রযুক্তি দুনিয়ায় স্টার্টআপ বলতে বোঝায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক বা একাধিক সমস্যা সমাধান করতে পারে, এমন একটা ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান ।

ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার তৈরি করতে প্রথমে আসে ওয়েব হোস্টিং ও ডেভেলপমেণ্ট টুলের লাইসেন্সিং খরচের কথা। সুখের বিষয় আজ থেকে দশ বছর আগের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ করা এখন অনেক সহজ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মাইক্রোসফট, আমাজনসহ বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনে পয়সায় লাখ লাখ টাকার সমপরিমাণ সফটওয়্যার লাইসেন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং ও স্টোরেজ রিসোর্স দিয়ে থাকে। যেসব স্টার্টআপকে এ রকম সহায়তা দেওয়া হয়, তার একটা ছোট অংশও যদি সফল হয়, সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি পেয়ে যাবে বছরের পর বছরের নিশ্চিত গ্রাহক।

কাজেই স্টার্টআপের টার্গেট প্রোডাক্ট মোটামুটি প্রতিশ্রুতিশীল হলেই সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহের সাথে এ ধরণের সহায়তা বিনা মূল্যে দিয়ে থাকে।

স্টার্টআপের পরের খরচ জনশক্তি। সবচেয়ে ভালো হয়, প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তারা যদি কাজগুলো ভাগাভাগি করে নেন। দু’জন হয়ত সফটওয়্যার প্রকৌশলের দিকটা দেখলো, ব্যবসা প্রশাসন থেকে পাশ করা আরেকজন দেখল মার্কেটং কিংবা বিজনেস ডেভেলপমেন্টের কাজগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনোর পরের সময়টায় বেতন ছাড়া মাসের পর মাস থাকাটা খুব কঠিন নয়, কারণ বাবার হোটেলতো আছেই। সন্তান নিজেই নিজের একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাচ্ছে, জেনে বাবা-মায়ের খুশীই হওয়ার কথা!

এর পরের খরচ অফিস স্পেস। সেটা নিজের পড়ার ঘর বা বাড়ির গ্যারেজ নিয়েই শুরু হতে পারে। এবং ব্যাপারটাকে মোটেও হালকাভাবে নেওয়ার কিছু নেই। সত্যি বলতে কি মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, গুগলের মতো আজকের বিলিয়ন ডলার প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরু হয়েছে ওই রকম গ্যারেজ স্পেস থেকে। প্রযুক্তি দুনিয়ার “গ্যারেজ স্টার্টআপ” কনসেপ্টটি অনেক জনপ্রিয়।

মাস কয়েকের পরিশ্রমের পর প্রোডাক্টটির প্রথম ব্যবহারযোগ্য ভার্সনটি দাঁড় হয়ে গেলে শুরু হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী পর্যায়। প্রোডাক্টটি থেকে সরাসরি উপার্জন শুরু হতে পারে, ক্রেতাদের কাছে প্রোডাক্টটির লাইসেন্স বিক্রি কিংবা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

এ পর্যায়ে যদি প্রোডাক্টটি মোটামুটি মানের সফলতা দেখাতে পারে এবং সেটিকে আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর মাপে ব্যবসার সম্ভাবনা দেখানো যায়, তাহলে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে আসতে পারে প্রতিষ্ঠানটির জন্য। প্রযুক্তি বিশ্বে দায়িত্ব ও শর্ত ভেদে এদেরকে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইনভেস্টর বলে।

আমাদের দেশে এ ধরণের বিনিয়োগকারীদের ধারণা বেশ নতুন হলেও, প্রযুক্তি ভিত্তিক স্টার্টআপগুলো থেকে ভালো কিছু সফলতা দেখাতে পারলে অনেক স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হবে আমার বিশ্বাস।

বেড়ে ওঠার একটা পর্যায়ে স্টার্টআপটি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কিনে নিতে পারে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা স্টক মার্কেটে আসতে পারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও)মাধ্যমে। যেখানে সাধারণ মানুষও বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবে প্রতিষ্ঠানটিতে।

একনিষ্ঠা ও কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের স্টার্টআপ সফল করতে পারলে ঘুরে যেতে পারে নিজের জীবনের মোড়। নিজের প্রতিষ্ঠানে, স্বকীয়তায় নিজের পছন্দের কাজ করার সুযোগ, সঙ্গে অর্থ উপার্জনের সৎ উপায় – জীবনের এতো সব চাহিদা পূরণ হতে পারে কর্ম-জীবনের শুরুতে পরীক্ষামূলক কিছু ঝুঁকি নেওয়ার মাধ্যমে।

প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ করে সবাই যে সফল হচ্ছে তা নয়, কিন্তু একেবারে গোড়া থেকে একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে যে পরিমান সৃষ্টিশীলতার সুযোগ এবং স্বাধীনতা থাকে, সেখান থেকে শিক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে ক্যারিয়ারের অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ খুব গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে আলাদা একটি শিল্প। সম্ভাবনার দিক থেকে এ ধরনের কনসেপ্টটি আমাদের দেশেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্যবসায় প্রশাসনের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এ বিষয়ে আলাদা একটি কোর্স রাখা গেলে নিকট ও সুদূর প্রসারী সুফল পাওয়া যাবে দেশের অর্থনীতিতে।

আমি এখন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি, এটাও একটা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান। প্রথম বিশ্বের একটি দেশে এ রকম স্টার্টআপ কালচারে কাজ করার আগ পর্যন্ত আমারও তেমন পরিস্কার ধারণা ছিল না এ সম্পর্কে। গত কয়েক মাসে এ ক্ষেত্রে অর্জিত আসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতাই উদ্বুদ্ধ করেছে এ বিষয়ে কিছু লেখার। আমি বিশ্বাস করি অসাধারণ এ কালচার আমাদের দেশেও গড়ে উঠবে খুব শিগগির। কারণ আমাদের দেশের মতো এতো মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণ পৃথিবির আর কোথাও দেখিনি!

লেখক সম্পর্কে

সিঙ্গাপুর প্রবাসী সফটওয়্যার স্থপতি আশরাফুল আলম জয় উচ্চ সক্ষমতার (High Performance) ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটার সফটওয়্যার ডিজাইন ও তৈরি বিষয়ে একজন সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ। এক দশকের পেশাগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তিনি। রয়েছে অনেক সফলতার গল্প।

আশরাফুল আলম জয় গাম্বায়া (Gumbuya) নামের পরবর্তী প্রজন্মের ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যার প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমানে সেখানে অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত ইন্টারনেট অভিজ্ঞতার আলোকে সামনে আসা জটিল সব সমস্যার সমাধান যেমন আইডেনটিটি, ডাটা সেগরেগেশন, ডাটা ইন্টারকানেক্টিভিটি, মোবিলিটি ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি কমিউনিটিতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসাবে ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আশরাফুল আলমকে ছয় বার মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল (এএসপি.নেট) পুরস্কার দিয়েছে।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে ২০০৩ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আশরাফুল আলম জয়।

 

Related posts

*

*

Top