অ্যাপস সেরা রপ্তানি পণ্য হবে

Nazrul islam khan-ict ministry-TechShohorনজরুল ইসলাম খান : ঠিক তিন বছর আগে বার্সেলোনাতে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বিষয়ক এক সম্মেলেন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্বের সব বড় বড় কোম্পানির নীতিনির্ধারক ও তথ্যপ্রযুক্তির সেরা গবেষকরা সেখানে ছিলেন। আমিও গিয়েছিলাম সেখানে। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় তাদের গবেষণা ও পরিকল্পনার বিষয়টি শুননাম। আগামী দিনগুলোতে রাজত্ব করবে মোবাইল ডিভাইস এমনটাই বলছিলেন সবাই। ডেক্সটপ কম্পিউটার এমনকি ল্যাপটপের অস্তিত্বও হুমকির সম্মুখীন হয়ে দাঁড়াবে। সেখানে আমরা পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। দেশে এসে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি।

আমি তখন এটুআই প্রকল্পে। সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসলাম। কিন্তু তখন কেউ বিষয়টিকে পাত্তাই দিতে চায়নি। সত্যি কথা বলতে কি আমাদের অনেকেই এসব বিষয়ে কোনো খোঁজ খবর রাখেন না বা রাখার সুযোগ পান না। তারপর আমরা বিভিন্ন রিসোর্স সংগ্রহ করলাম। অবশেষে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ‘জনগনের দোড়গোরায় সেবা’ স্লোগানটি বদলে ‘হাতের মুঠোয় সেবা’ প্রতিস্থাপন করা হয়।

কেন হাতের মুঠোয় সেবা? দেখা গেল বর্ষার দিনে, তীব্র শীতের সময়ে, হরতালে, দূর্যোগে বাসা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না অথবা বিভিন্ন সেবার জন্য মুভ করা যাচ্ছে না। তাহলে কি নাগরিক সেবা পাব না? সেই ভাবনা থেকে স্লোগান আমরা দিলাম- ‘অ্যানি টাইম, অ্যানি হোয়ার, অ্যানি ডিভাইস’ অর্থাৎ যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে- যে কোনো ডিভাইসে সেবা প্রদান। এখন যে কোনো ডিভাইস মানে মোবাইল ডিভাইস। এ ডিভাইসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের।

দেশে স্মার্টফোনের সংখ্যা এখন ৮ শতাংশ। আর এটির ব্যবহার ৩০ শতাংশ করে বাড়ছে। এ ছাড়া দেশে এখন যেসব ফোন আমদানি হচ্ছে তার ৩০ শতাংশই স্মার্টফোন। দেড় হাজার টাকাতেও স্মার্টফোন মিলছে এখন। দেশে শুধু সিম্ফোনি বছরে প্রায় এক কোটি ফোন বিক্রি করে। তাদের গ্রোথ রেটও ৩০ শতাংশের মতো।

অর্থাৎ মোবাইল ডিভাইস নিয়ে কাজ করার উপযুক্ত সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। সত্যিকার অর্থে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এগুতে চাইলে মোবাইল অ্যাপস নিয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। কেননা মোবাইল ডিভাইসে ভারি কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় না। এ জন্য প্রয়োজন হালকা সফটওয়্যার, যেটির ব্যবহার খুবই সহজ। আর এ হালকা সফটওয়্যারই হচ্ছে মোবাইল ফোন অ্যাপস।

এখনও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেভাবে মোবাইল অ্যাপসে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে তেমন কিছু শেখানো হয় না। তাই বিশ্বব্যিালয়গুলোতে মোবাইল অ্যাপস বিষয়ে প্রশিক্ষণের কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেখানে জেলা প্রশাশনের অধীনে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যাতে সারা দেশে সবাই সমভাবে মোবাইল অ্যাপস তৈরির ওপর দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

একইভাবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য আরেকটি উদ্যোগ আছে। লানিং অ্যান্ড আনিং নামের এ প্রকল্পে তৃণমূল পর্যায়ে জাভা সফটওয়্যার ল্যাঙ্গুয়েজের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে আস্তে আস্তে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণরাও একসময় অ্যাপস তৈরি করতে সক্ষম হবে।

জাভা দিয়ে অ্যান্ড্রয়েডচালিত অ্যাপস বানানো গেল। কিন্তু অন্যান্য সব প্লাটফর্মে যেমন আইওএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমেও অ্যাপস তৈরির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এ প্রকল্পে। ফোনগ্যাপ, এইচটিএমএল ফাইভ ও টাইটানিয়াম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে আইওএস বা ব্লাকবেরিসহ যে কোনো প্লাটফর্মের মোবাইল অ্যাপস বানানোর দক্ষতা তৈরি হবে।

তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য সেবা প্রদান এবং সমৃদ্ধ জীবনযাপনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন অর্থের। এ জন্য বর্তমানে অর্থ আয়ের একটি চমৎকার খাত হতে পারে অ্যাপস রপ্তানি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিশ্বমানের অসংখ্য অ্যাপস তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। সমৃদ্ধ জীবনযাপন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে মোবাইল অ্যাপস রপ্তানির মাধ্যমে অর্থের চাহিদা মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেবায় স্বচ্ছতা আসলে, সুশাসনও নিশ্চিত হবে।

মোবাইলের জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো অ্যাপস স্টোর ছিল না। অন্যের অ্যাপস স্টোরে অ্যাপস রাখতে গেলে ফি দিতে হয়। দেশে বেশিরভাগের ক্রেডিড কার্ড নেই। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে অ্যাপস স্টোর তৈরি করতে। ইতিমধ্যে ইটিএল করেছে। অন্যান্য কোম্পানিগুলোও করছে। বিদেশি কোম্পানিও এখানে তাদের অ্যাপস স্টোর খুলবে।

যদিও প্রথমেই বিদেশি কোম্পানীগুলো এটা করবে না। নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী অ্যাপস তৈরির মাধ্যমে বাজার তৈরি হলে ব্যবসার পরিসর বাড়বে। তখন নিজেদের স্বার্থেই বিদেশি কোম্পানিগুলো আমাদের দেশে অ্যাপস স্টোর খুলবে। খুব সম্প্রতি বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিয়ে অ্যাপস স্টোরে অ্যাপস রাখা হচ্ছে। আমরা এ অ্যাপস বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছি।

পুরো প্রক্রিয়াটা একটি সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। যাতে খাত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাজ হয়। একজন আইটির লোক ইচ্ছে করলেই কিন্তু মোবাইল অ্যাপস তৈরি করতে পারবে না। ভূমি বিষয়ক কোনো অ্যাপস তৈরি করতে হলে আইটি এক্সপার্টকে এ বিষয়ের সুবিধা অসুবিধা সমন্ধে জানতে হবে। অথবা তার দলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধারনা আছে এমন লোক প্রয়োজন হবে। এ জন্য আমরা প্রথমে আইডিয়া ডেভলপমেন্ট ওয়ার্কশপ করছি।

বিষয়টা হচ্ছে স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো অ্যাপস তৈরির জন্য কর্মশালাটি হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও এ সংক্রান্ত সব বিভাগ, দপ্তরের প্রতিনিধি, হাসপাতালের প্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগী ও সেবা গ্রহীতাদের সমন্বয়ে। এ কর্মশালা থেকে বেরিয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অ্যাপসের ধারনা।

একই সঙ্গে চাহিদানুযায়ী অ্যাপস তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ১৩টি আইডিয়া ডেভলমেন্ট কর্মশালা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ১৫টি প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষ হয়েছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটা রিসোর্স তৈরি করে দেওয়া, একটা জাগরণ তৈরি। যাতে সবাই অ্যাপস তৈরি ও ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। আমরা একজন অ্যাপস ডেভলপারকে প্রতিনিয়ত সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছি, যাতে তিনি তার সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে পারেন ও বিভিন্ন সমস্যার সমাধান লাভ করেন।

এরপর সব আইডিয়া নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা হবে। এটা নিয়ে আইসিটি খাতের বৃহৎ কোম্পানি ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। ইতিমধ্যে গ্রামীণফোন, রবিসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা এসব আইডিয়ার ওপর অ্যাপস তৈরি করে কোম্পানিগুলোর অ্যাপস স্টোরে রাখবে। আইডিয়া ডেভলপকারির নাম থাকবে সেখানে। এটা থেকে সে তার রয়্যালিটিও পাবে।

সরকারি সেবাগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের জন্য ১০০টি অ্যাপস তৈরি করা হবে। তবে এতসব উদ্যোগের পরও যদি সবাই এগিয়ে না আসে তাহলে সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসনের লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে। যদি এমন হয় যে, মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ অনুসারে অ্যাপস তৈরি হলো কিন্তু তারা এ সেবার জন্য প্রয়োজনীয় কনটেন্টগুলো আপডেট করল না। সেক্ষেত্রে সব আয়োজনই গুঁড়েবালি। তাই সেবা আপডেট রাখতে মনিটরিংয়ের বিষয়টি নিয়েও পরিকল্পনা চলছে।

আশা করছি যে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে একটা সফলতা আসবে। শতভাগ না হলেও আশানুরুপ ফলাফল আসবে। নাগরিক সেবা ঠিকই হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া হবে। বাংলাদেশের প্রথম সারির রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অ্যাপস জায়গা করে নেবে।

লেখক পরিচিতি : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম খান সুপরিচিত এন আই খান নামে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের প্রথম উদ্যোগ এটুআই প্রকল্পের প্রথম পরিচালক তিনি। দেশে ডিজিটালাইজেশনের জন্য গৃহীত অসংখ্য প্রকল্প ও উদ্যোগের পুরোধা তিনি।

(অনুলিখন- আল আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর)

Related posts

*

*

Top