Maintance

ই-হাটে মোবাইল অপারেটর, আশংকা নাকি সম্ভাবনা?

প্রকাশঃ ৩:৪৫ অপরাহ্ন, অক্টোবর ৫, ২০১৬ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৬:০৮ অপরাহ্ন, অক্টোবর ৫, ২০১৬

মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দি ডেইলি স্টার : মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো ই-কমার্সের ব্যবসায় অংশ নিতে পারবে, কি পারবে না – সেটা নিয়ে বাজার রীতিমতো টগবগে গরম। দেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরকে ঝাঁঝালো ও একই সঙ্গে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনতে পাচ্ছি। তবে যাদেরকে নিয়ে প্রশ্ন তাদের কোনো বক্তব্য পাচ্ছি না কোথাও। গণমাধ্যমও যুক্ত হয়েছে এ আলোচনা-বিতর্কে। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে আমারও আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এ বিতর্ক।

বিতর্কের শুরু হয়েছে কিছুদিন আগে রবি যখন কিছু পণ্য ও সেবা নিয়ে ই-কমার্সে যুক্ত হলো। এখন পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত ই-হাটে নিজের পসরা সাজিয়ে বসল। সেটা আরও জোরালো হলো যখন গ্রামীণফোনও এ হাজির হলো বিকাশমান এ খাতে।

গ্রাহক বিচারে শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের নতুন হাটের জানান দিতে হাকডাক শুরু করতেই নড়েচড়ে বসলেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। গ্রামীণফোনের ই-হাটে পণ্য কেনাবেচার উদ্যোগকে কোনো অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছে না স্থানীয় ই-বণিকরা। স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, তারা কিছুটা ভয়ে কাচুমাচু হয়ে পড়েছেন। প্রতিযোগিতায় নামার আগেই হাঁসফাঁস করতে শুরু করেছেন। বাজার জমে ওঠার আগেই তারা নতুন বিক্রেতার অংশগ্রহণে মুখ বেজার করে ফেলেছেন।

e-commerce-techshohor

এটা ঠিক যে প্রতিটি ব্যবসায়ী তার নিজের ও গোষ্ঠী স্বার্থের কথাই আগে ভাববেন ও তা জোরালো ভাবেই তুলে ধরবেন। নিজেরা চেষ্টা করবেন সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে। তাতে দোষের কি? আমি তো বলি দেশীয় ই-বণিকরা উচিৎ কাজটাই করছেন, যতদূর সম্ভব নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা তাদের করা উচিৎ।

কিন্তু আমি যখন গ্রাহক। তখন আমি কি চাইবো?

অবশ্যই সর্বোচ্চ সেবা, বিশ্বস্ততা ও আস্থা। যিনি আজ দেশজ আন্দোলনের কথা বলে বিতর্কের ঝড় তুলছেন- একবার চিন্তা করেন তো আপনাদের হাতের মোবাইল ফোনটি যে অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত তার মালিকানায় কে বা কারা?

দেশে তো ০১৫-ও আছে! কেন আপনারা ০১৭, ০১৮ বা ০১৯ – এর দিকে ঝুঁকছেন? কেউ কি কখনও ০১৫ নম্বর সিরিজের সেবা প্রদানকারী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটকের সেবা পরখ করে দেখেছেন? কবির মতো আমার পাঞ্জেরিও প্রশ্ন করে আর হাসে।

Sajal Zahid-TechShohor

আরও অনেকের মতো এই মাটির সন্তান হিসেবে আমি কিন্তু পরখ করেছি ০১৫। ০১৭ দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করেও ছুটে গিয়েছিলাম ০১৫-এর কাছে। আমি যে পেশায় আছি সেখানে নম্বর বদল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কিন্তু ওই যে দেশ মাতৃকার টান। বছর কয়েক চালিয়েছিও। দাঁতে দাঁত চেপে।

তারপর, আমারও স্বপ্ন ভঙ্গ। সেবাই শেষ পর্যন্ত আমার কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি বেশি খরচের চেয়েও। কেউ কি তাতে দোষের কিছু দেখেন?

আমার পাঞ্জেরি কিন্তু দেখে না, সে বরং হাসে। তার হাসি আরও চওড়া হয়, আরও উচ্চ শব্দের হয়।

আমার বিশ্বাস নানা বিতর্কের পরেও ০১৭, ০১৮ বা ০১৯ সিরিজের সেবা প্রদানকারী মোবাইল ফোন অপারেটরের ওপর আস্থা রেখেছেন তারা। কেউ অন্তত মোবাইল ফোনের অপারেটর পছন্দ করার ক্ষেত্রে দেশজ বিতর্কটা তোলেননি। তেমনটাই হয়, তেমনটাই হয়েছে।

আসেন আমার পেশার একটা উদাহরণ দেই। শ্রদ্ধেয় মোস্তাফা জব্বার ভাইসহ অন্যরা যখন অগ্রপথিকের মতো দেশের সংবাদপত্র শিল্পে কম্পিউটার প্রযুক্তি এনে বিপ্লবের সূচনা করলেন তার বিরুদ্ধে কি এ শিল্পের তখনকার সবচেয়ে বড় অংশ দাঁড়িয়ে যায়নি।

এমনকি জব্বার ভাইয়ের এ প্রযুক্তি গ্রহণের দুই দশক পরেও শুধু আন্দোলন ও জ্বালাময়ী বক্তৃতার ভয়ে দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং এক সময়ের অভিজাত সংবাপদপত্রটিতে ঢালাই ফন্ট টিকে ছিল। তাদের কাজ ছিল, কাজ বাড়ানো। আর সেই কাজের জন্যই তারা মোটা বেতন পেতেন।

এ যুক্তি তো ঠিকই, মোবাইল অফারেটররা যদি তাদের নিজেদের ই-হাটে বিক্রি করা পণ্যের সঙ্গে তার নিজের ডেটা বা ভয়েস ফ্রি দিয়ে দেয় তাহলে সেটি দেশজ ই-বণিকদেরকে হুমকির মুখে ফেলবে। আমিও আপানাদের এ যুক্তির সঙ্গে সহমত পোষণ করছি।

মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো এটা করতেই পারে। অন্তত আইন-বিধি তো তাকে আটকায় না।

তাহলে? তাহলে আন্দোলন করতে হবে আইন ও বিধি নিয়ে। বড় অংকের বিনিয়োগ নিয়ে আসা বিদেশি এসব উদ্যোক্তা আইন ও বিধির সুযোগ নেবেই। ব্যবসা করতে এসে তারা হাত-পা গুটিয়ে রাখবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়। সম্ভাবনা থাকলে তারা সেখানে যুক্ত হবে- এটিই পুঁজির নিয়ম। তাই যে সুযোগ নিচ্ছে তার বিরুদ্ধে অসহযোগ করেন আর যাই করেন না কেন, তাতে আখেরে আপনাদেরই লোকসান হবে। টক্কর খাবেন, হারিয়ে যাবেন।

ki-dorar-gp-techshohor

বিষয়টাকে যদি আবার এভাবে দেখি, ইউনিলিভার তার বিভিন্ন পণ্যের প্রচারের সময় অনেক ক্ষেত্রেই একটার সঙ্গে আরেকটা ফ্রি দেয়। কিন্তু তাই বলে কি স্থানীয় শিল্প উদ্যোগ স্কয়ার এ নিয়ে ‘পারবে না’; ‘চলবে না’ আন্দোলনে নামে? নাকি প্রতিযোগিতাকে গ্রহণ করে সেও নতুন কোনো অফার নিয়ে আসে। আপনি উন্মুক্ত বিশ্ববাজারের কথা বলবেন, আবার নিজেদের স্বার্থে দেশজ শিল্প রক্ষায় আন্দোলনের ধোঁয়া তুলবেন- এ স্ববিরোধিতা কেন? এ থেকে আমরা কিভাবে বের হতে পারবো?

পাশের দেশ ভারতের বিষয়ে অনেকের অতি উৎসাহ, আবার কারওবা আছে ব্যাপক অ্যালার্জি। এখানে প্রাসঙ্গিক একটি উদাহরণ দেয়া যাক। তারাও কিন্তু বহুদিন খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায় (রিটেইল শপ) বিদেশিদেরকে সুযোগ দেয়নি। তাদের দেশেও কি ই-হাটের জন্যও নিয়ম বদলায়নি? বদলেছে- যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা জানেন বিশ্ব সেরা ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন সেখানকার ই-বাজারে কেন আসতে রাজি হয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের এখানে তো কোনো বাঁধা-নিষেধ ছিলই না, নেইও। সুতরাং আমরা তো আরও আগে থেকেই উন্মুক্ত বিশ্ব বাজারের জোয়ারে ভাসা দেশ। আমরা অন্তত এখন আর বিধি নিষেধের কথা তুলতে পারি না।

যদি তুলতেই হয়, সেই দাবি জানাতে হবে নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকের কাছে যারা বিধি তৈরি করেছেন। বিধি মেনে যারা ব্যবসা করছেন তার কাছে নয়।

এক্ষেত্রে দেশীয় ই-বণিকদের জন্য একটাই পরামর্শ হলো- নতুন উদ্ভাবন ও সেবা আনলে দেখবেন দেশবাসী আপনাদের সঙ্গেই থাকবে।

দেশের মানুষও কিন্তু নিজেদের পণ্য ও সেবার কথাই আগে ভাবে, মনমতো হলে সেটাই ব্যবহার করতে চায়।

*

*

Related posts/