সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন: কিছু অসত্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি

sajal-TechShohorসজল জাহিদ, বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ট্রিবিউন : পাঁচ বছর পূর্তিতে সরকারের সাফল্যের খতিয়ানে যে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে তার মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত অন্যতম। টেলিযোগাযোগমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে সরকারের প্রচারে কলম ধরেছেন। আমার জানা মতে, ল্যাপটপের কিবোর্ড চাপেননি কিন্তু।

আমি বলতে চাই না, এটা সাফল্যের মাপকাঠি। তারপরেও এটি তো অস্বীকারের সুযোগ নেই, মহাজোট সরকারের প্রথম দুই টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোবাইল ফোনে এসএমএস করতে শেখেননি। ই-মেইল, সে তো অনেক দূরের আলোচনা। রাশেদ খান মেনন তাও এ সমালোচনার খানিকটা হলেও ওপরে।

মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা অযোগ্যতার আলোচনায় যেতে চাই না। তুলে আনতে চাই কিছু বিষয় যেগুলো মেনন সাহেব তার নিজের বয়ানে সত্য বলে চালিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সেগুলোর অনেক কিছু অসত্য, অর্ধসত্য এবং বিভ্রান্তিকর।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে এটি জানার সুযোগ হয়েছে, বর্তমান টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর নামে যে লেখাটি বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেগুলো তার নিজের লেখা নয়। হয়ত একবার চোখ বুলিয়ে থাকবেন মাত্র! তা ছাড়া এসব তথ্যের খুঁটিনাটি যৌক্তিক কারণেই তার জানার কথাও নয়।

রাশেদ খান মেমন দাবি করেছেন, এ সরকার থ্রিজি সেবা চালু করার কারণে দ্রুত গতির ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে। কথা ঠিক; তবে আমার মতো অধম যারা গত সাত আট বছর ধরে এ খাতের রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে জড়িত তারা জানি এ দাবির সঙ্গে কতটা বিভ্রান্তি জড়িয়ে রয়েছে।

জরুরি অবস্থার সময় মেজর জেনারেল মঞ্জুরুল আলম তখন বিটিআরসির চেয়ারম্যান। তিনি থ্রিজি সেবা চালুর উগ্যোগ নেন। নীতিমালাও হয়েছিল। থ্রিজি চালু করতে তিনি যে রোডম্যাপ করেছিলেন তাতে ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি স্পেকট্রামের নিলাম হওয়ার কথা ছিল। এর দালিলিক প্রমাণও আছে আমার কাছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা কবে হল তা সবাই জানেন। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। এ যে আমরা সাড়ে চার বছর পিছিয়ে গেলাম সেটির কথা কেউ বলছে না? শেষ পর্যন্ত থ্রিজি স্পেকট্রামের জন্য নিলাম হলেও তাতে কিন্তু সাংবাদিকদের প্রথমে অবাঞ্চিত করা হয়েছিল। পরে অবশ্য সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়।

মন্ত্রী তার লেখায় সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ সংযোজনের দাবি করেছেন। কাজটা তখন হয়েছিল রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর হাত ধরে। বাংলাদেশকে ল্যাপটপ নেশন হিসেবে পরিচিত করার কৃতিত্ব তার। কিন্তু সবাই কি ভুলে গেছেন তিনি বিদেশি একটি কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তি নিতে গিয়ে নিজের মন্ত্রনালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবকে কাজে লাগিয়েছিলেন। আর ওই বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তি আমদানির নামে টেবিল-চেয়ার পর্যন্ত আনা হয়েছিল। আর টাকার ভাগবাটোয়ারা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ার দুটি ব্যাংকে। সেসব ব্যাংকের হিসেব এবং লেনদেনের তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে।

আর তার চেয়েও বড় কথা হল, সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ সংযোজন হলো। ভালো কথা। তাহলে এগুলো কেন বিক্রি হচ্ছে না। কেন গুদাম ঘরে সব পড়ে আছে?

ওয়াইম্যাক্সে প্রচলনের দাবি এই সরকার করছে। এর চেয়ে ডাহা মিথ্যা আর কি হতে পারে! ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াইম্যাক্সের লাইসেন্সের নিলাম হয় র্যা ডিসন হোটেলে। রিপোর্টার হিসেবে ওই নিলামে উপস্থিত ছিলাম। তাহলে কি এই সরকার দাবি করবে ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তারা ক্ষমতায় ছিল?

গত পাঁচ বছরে এই খাতে সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের সবচেয়ে বড় কোপটা পড়েছে কিন্তু ওয়াইম্যাক্সকে কেন্দ্র করে। প্রথমবার নিলামে অংশ নেওয়া একটি কোম্পানি যারা পরে লাইসেন্স না নিয়ে বরং জামানতের টাকা তুলে নিয়ে চলে যায়, তাদেরকে পাঁচ বছর পর আবার ডেকে এনে ২১৫ কোটি টাকার স্পেকট্রামের বদলে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার স্পেকট্রাম। পদ্মা সেতু, হলমার্কের চেয়ে এ দুর্নীতিই বা কম কিসের?

অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মন্ত্রীত্ব যাওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ওই ফাইলে স্বাক্ষর করেন তিনি।

পরের দাবি মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের। এ সরকার নাকি এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর চেয়ে মিথ্যাচার আর কি হতে পারে?

তাহলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের বিটিআরসি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম যে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়েনে স্যাটেলাইটের অরবিটাল স্লটের জন্যে আবেদন করলেন- সেটা কোন দেশের জন্য করেছিলেন? স্যাটেলাইট বিষয়ে আলোচনা যখন চলছে তখন ইত্তেফাকে আমার এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পর নাসাতে কাজ করা এক বাংলাদেশী, নাম হারুনুর রশীদ এ বিষয়ে প্রচন্ড আগ্রহ দেখান। পরে মঞ্জুরুল আলম এবং তখনকার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল মালেকের সঙ্গেও হারুনুর রশীদের বৈঠক হয়েছিল।

এই সামান্য কাজের কৃতিত্ব দাবি করছি না। তবে টাও ঠিক যে হারুনুর বাতলে দিয়েছিলেন কোথায় কিভাবে কার কাছে আবেদন করতে হবে। আর স্যাটেলাইটের ওপর এখনও যে সামান্য কাজ এগিয়েছে তা সেই আবেদনের ওপর ভর করে। মাঝখান দিয়ে এ খাতে আরও কিছু অনিয়ম হয়েছে; তার চেয়েও বেশি হয়েছে সময়ক্ষেপণ।
আর এখন রাশিয়ার একটি কোম্পানির কাছ থেকে অরবিটাল স্লট কেনার বিষয়ে নতুন উপাদান যুক্ত হওয়ায় বিলম্ব দীর্ঘায়িত হওয়া যেন অনিবার্য পরিণতি।

বিটিআরসির সে সময়ের পরিকল্পনা অনুসারে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার কথা। আর এখনকার পরিকল্পনা ২০১৬ সালের জুন। সেটিও যে আরও বছর কয়েক পিছিয়ে যাবে সেটা দেখাই যাচ্ছে।

রাশেদ খান মেনন আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স এবং আইআইজির লাইসেন্স দেওয়াকে সাফল্য হিসেবে দাবি করেছেন। কি হাস্যকর কথা?

মাত্র নয়টি আইজিডব্লিউ তো এক বছরের মধ্যে সরকারের আটশ কোটি টাকা লুটে নিল? তারপরেও এটি সাফল্যের? একটি কারণে এটি হতে পারে তা হলো আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কয়েকজন মেনন সাহেবদের ভাষায় যারা ‘লুটেরা’ তারা এই লুটপাটের নের্তৃত্ব দিয়েছেন। সে কারণেই লুটও এখন সাফল্যের বিষয়।

তবে এটি ঠিক এই সরকারের সময়ে মোবাইল ফোন খাত অন্তত সংখ্যায় বিকশিত হয়েছে। প্যানিট্রেশন বেড়েছে, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মূল্য কমেছে। আবার দেশীয় কিছু পিএসটিএনকে বন্ধ করে তাদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ধুলায় লুটিয়ে দেওয়ার সাফল্যও এই সরকারের আছে।

অনেক সমালোচনার পরও নতুন করে এটি দাবি তুলে রাখতে চাই নতুন সরকার প্রধানের কাছে। নতুন সরকার অন্যসব মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব যাকেই দেক না কেন, দয়া করে টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এমন কাউকে দেবেন যারা অন্তত ফেইসবুক জিনিসটা কি সেটা বোঝেন।

যারা টুইটার বোঝেন না, ইউটিউব আটকে রাখেন- তাদেরকে দিয়ে আর যাই হোক ডিজিটাল সরকার হবে না।

ট্যাগ

Related posts

*

*

Top