বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা : আমরা কি প্রস্তুত?

আশরাফুল আলম জয়, সফটওয়্যার স্থপতি, সিঙ্গাপুর :  আগামী পাঁচ বছরে সফটওয়্যার খাতে বছরে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন বেসিস । আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট হিসাবে নিলে এ লক্ষ্য বাস্তবসম্মত কিনা এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুললেও ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখতে চাই।

কথায় আছে, লক্ষ্য স্থির করার মাধ্যমেই লক্ষ্যপূরণের একটা বড় শর্ত পূরণ হয়ে যায়। অপার সম্ভাবনার সফটওয়্যার শিল্পে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে পাঁচ বছরের এ লক্ষ্যমাত্রার কয়েকগুন ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

প্রথমেই আসা যাক কিছু হিসেব-নিকেশে। এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আসলে কত টাকা? এ মুহূর্তের মুদ্রা দর অনুযায়ী টাকার অংকটি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। নিঃসন্দেহে অনেক বড় অংক, যেটা পুরো দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। 

Ashraf-Alam-TechShohor

ঠিক আছে, ভালো কথা! এবার বাস্তবে ফিরে আসা যাক। এক বিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে হলে গড়পড়তা এক হাজার ডলার বাজেটের ১ মিলিয়ন বা দশ লাখ প্রজেক্ট ভালোভাবে শেষ করতে হবে। একেকটি প্রজেক্ট একেক জন ডেভেলপার গড়ে এক মাসে শেষ করতে পারলে এ লক্ষ্য পূরণ করতে আমাদের দরকার হবে প্রায় এক লাখ ডেভেলপার। গড়পড়তা প্রজেক্টের বাজেট আরও কম হলে দরকার হবে এর চাইতেও বেশি ডেভেলপার। সফটওয়্যার শিল্পের সাথে যুক্ত অন্যান্য জনশক্তির কথা বাদই দিলাম। বাস্তবতা চিন্তা করলে এ বিশাল সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা খুবই কঠিন হবে (যদিও একেবারে অসম্ভব নয়) । কাজেই কেবলমাত্র ছোট আকারের প্রজেক্ট হিসেব করলে বছরে এক বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা মোটেও বাস্তব সম্মত হবে না।

এবার তাহলে আরেকটা হিসেব করি। এক বিলিয়ন ডলার উপার্জন করলে হলে গড়পড়তা এক মিলিয়ন ডলার বাজেটের এক হাজার প্রজেক্ট ভালো ভাবে শেষ করতে হবে। এ আকারের একেকটি প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করতে গড়ে পাঁচ জন দক্ষ মানুষের ছয় মাস সময় লাগলে, বছরে এক হাজার প্রজেক্টের জন্যে আমাদের দরকার হবে মাত্র আড়াই হাজার ফুল টাইম জনশক্তি।

তবে বাস্তবিক পক্ষে বড় আকারের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ছোট, মাঝারি এবং বড় বিভিন্ন মাপের কাজের জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। ছোট এবং মাঝারি আকারের সফটওয়্যারের কাজে আমাদের দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই সফলতা দেখিয়েছে। তবে বড় আকারের প্রজেক্টগুলোর জন্যে প্রয়োজন কঠিন প্রস্তুতির।

বড় আকারের প্রজেক্ট পেতে হলে দরকার ভালো মার্কেটিং এবং আন্তর্জাতিক সুনাম। তবে সত্যি বলতে কি, এ ধরণের প্রজেক্ট নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আন্তর্জাতিক বাজারে মিলিয়ন ডলার কাজের অর্ডার পাওয়া খুব একটা কঠিন না, কারণ এ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবি পাওয়া সাড়া বিশ্বে দুর্লভ। কিন্তু এ ধরণের কাজ সামলানোর প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে বিফল হলে শুধু দেশের সুনাম নষ্ট হবে না, সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাসুল দিতে হবে চড়া অংকের জরিমানা, কারণ বড় অংকের লেনদেন বলে ক্লায়েন্টরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে এ ধরণের প্রজেক্টে অনেক ধরণের আইনি শর্ত জুড়ে দিয়ে চুক্তি করে থাকে।

এ ধরণের প্রজেক্টের কাজের মান আক্ষরিক অর্থেই অনেক উঁচু মাপের হতে হবে। প্রযুক্তির যথোপযুক্ত প্রয়োগে সিস্টেমটি এমনভাবে ডিজাইন এবং ডেভেলপ করতে হবে যেন সিস্টেমটি খুব কম সংখ্যক মানুষের সাহায্যেই চলতে পারে বছরের পর বছর। এ ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার হচ্ছে, বিগ ডেটা, ক্লাউড, প্যারালাল কম্পিউটিংসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগ, যেটা অর্জন করতে একেকজন মেধাবী ডেভেলপারের কয়েক বছরের একনিষ্ঠ সাধনার প্রয়োজন।

বড় আকারের কাজের জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করার একটা উপায় হচ্ছে, প্রত্যেক প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করে আরেকটু বড় আকারের প্রজেক্ট নিয়ে ক্রমান্বয়ে বৃহত্তর পরিসরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকা। সমস্যা একটাই এ প্রক্রিয়াটি খুবই ধীর গতির। কারণ প্রত্যেক প্রজেক্ট শেষে নিজেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী চাহিদার মাপে পরবর্তি বড় মাপের কাজ খুঁজে পাওয়া আসলেই দুষ্কর।

আরেকটা সহজ কিন্তু খুবই কার্যকরী উপায় হচ্ছে, নিজেদের জন্যে সফটওয়্যার বানানো! আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইতোমধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তির নানা প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে এটা আসলে খুবই সীমিত। আমাদের দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল সফটওয়্যার শিল্পের প্রসারে ভূমিকাই নয়, নিজেদের কাজ-কর্মের গতি ও দক্ষতা বাড়িয়ে তুলতে পারে কয়েকশ’গুন পর্যন্ত!

হ্যাঁ, মুদ্রণপ্রমাদ নয়, সঠিকভাবে তৈরি একটি ইনফরমেশন সিস্টেম কাজ-কর্মের গতি ও দক্ষতার মান বাড়িয়ে তুলতে পারে কয়েকশ’গুন পর্যন্ত। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো, বিশেষ করে, আদালত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, পরিবহন খাতগুলোতে এ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত দক্ষতা ও সচ্ছতা সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর।

বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বসবাস করছি বলে আমার জানার সুযোগ হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির আকাশচুম্বি উন্নতির পেছনে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যপক ভূমিকা। আগ্রহীরা পড়তে পারেন রাস্ট্রটির স্থপতি লী কুয়ান ইয়েউর আত্মজীবনী “From Third World to First : The Singapore Story: 1965-2000“, বইটি।

দেশীয় সফটয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে পরীক্ষামূলকভাবে নানা ধরণের প্রজেক্ট করতে পারে। দক্ষ কিছু প্রকৌশলীর সাহায্যে কোন সহযোগী প্রতিষ্ঠান (যেমন, বেসিস) এ কাজটা এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে, যেটা এক বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আক্ষরিক অর্থেই বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।

নিরীক্ষার ভিত্তিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় আকারের কাজ করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ভোক্তা দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম খরচে মূল্যবান আইটি সেবা পেতে পারে।

দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচ্ছতা ও সততার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কথা প্রায়শই শোনা যায়, যেটা আমাদের সফটওয়্যার শিল্পের উন্নতির অন্যতম প্রধান বাঁধা। দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দক্ষতা অনুযায়ী বন্টন ও দিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব-স্থানে যথেষ্ট সৎ, মেধাবী ও দক্ষ মানুষের প্রয়োজন সবচাইতে বেশি।

তথ্য-প্রযুক্তির সবচাইতে বড় সৌন্দর্য হলো, উন্নত মানের আয়ের জন্যে দুর্নীতির প্রয়োজন হয় না, এ কথাটি একজন  পেশাজীবির ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমন সত্য সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি নয়, যথোপযুক্ত উপায়ে দক্ষ লোকবলে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করাতে পারলে বৈধ উপায়েই অনেক লাভবান হতে পারে প্রতিটি দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান।

এর একটা বড় কারণ হচ্ছে মোটামুটি মানের একটা কম্পিউটার আর একটা ভালো ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়া আর তেমন কোনো কাঁচামালের দরকার হয় না। যেখানে অন্য যে কোনো শিল্পে দরকার লক্ষ-কোটি টাকার বিনিয়োগ। সফটওয়্যার শিল্পে বাকী যা দরকার, তা হলো এ শিল্পে যারা জড়িত থাকবে তাদের আন্তরিকতা আর পরিশ্রম। মেধা নির্ভর এ শিল্পটিকে ভিত্তি করে পৃথিবিতে শত শত প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। তারা পারলে, আমরাও পারবো, যদি সদিচ্ছা থাকে।

লেখক সম্পর্কে

সিঙ্গাপুর প্রবাসী সফটওয়্যার স্থপতি আশরাফুল আলম জয় উচ্চ সক্ষমতার (High Performance) ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটার সফটওয়্যার ডিজাইন ও তৈরি বিষয়ে একজন সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ। এক দশকের পেশাগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তিনি। রয়েছে অনেক সফলতার গল্প।

আশরাফুল আলম জয় গাম্বায়া (Gumbuya) নামের পরবর্তী প্রজন্মের ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যার প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমানে সেখানে অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত ইন্টারনেট অভিজ্ঞতার আলোকে সামনে আসা জটিল সব সমস্যার সমাধান যেমন আইডেনটিটি, ডাটা সেগরেগেশন, ডাটা ইন্টারকানেক্টিভিটি, মোবিলিটি ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি কমিউনিটিতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসাবে ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আশরাফুল আলমকে ছয় বার মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল (এএসপি.নেট) পুরস্কার দিয়েছে।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে ২০০৩ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আশরাফুল আলম জয়।

 

Related posts

*

*

Top