ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ইন্টারনেটের দাম

মোস্তাফা জব্বার

অতিথি লেখক, টেক শহর

স্বাধীনতা উত্তরকালের সব সরকারের সঙ্গে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের প্রধানত পার্থক্য হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। দেশের ক্ষমতায় আসা অন্যসব সরকারই রাস্তাঘাট বানিয়েছে এবং শেখ হাসিনা যা করেছেন তার কিছু না কিছু করেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথা কেউ বলেনি বা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বো এমন কাজ কেউ করেনি। ফলে আমরা যারা এই সেস্নাগানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছি তারা বরাবরই শেখ হাসিনার কাছে অনেক বড় প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করি। আমরা মনে করি, তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন এবং যেসব জায়গায় ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটি আটকে যায় সেই জট তিনি খুলে দেবেন। সেজন্যই তার কাছে আমি ইন্টারনেটের জট খোলার দাবি পেশ করছি।

ইন্টারনেট মৌলিক অধিকার : ইন্টারনেট এমন একটি বিষয় যা দিয়ে ডিজিটাল রূপান্তরের সব কাজই করা হয়। আমি এ সভ্যতাকেই ইন্টারনেট সভ্যতা বলি। আমি মনে করি, মানুষের অন্ন, বস,্ত্র বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকারের মতোই ইন্টারনেট পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। আমি যদি পারতাম তবে সংবিধান সংশোধন করে মানুষের ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতাম। এ কাজটি শেখ হাসিনাও করতে পারেন। সংবিধানের নতুন একটি সংশোধনী এনে তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে ইন্টারনেটকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

ইন্টারনেটের গতি : ইন্টারনেটের আরেকটি বিষয় হচ্ছে এর গতি। বাংলাদেশে তিন কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী থাকলেও এর মাঝে পৌনে তিন কোটিই ইন্টারনেটের কোন গতি পায় না। এর ফলে ইন্টারনেটের প্রকৃত স্বাদ এ ব্যবহারকারীরা মোটেই গ্রহণ করতে পারে না। আমি লক্ষ্য করেছি যে, ঢাকা-চট্টগ্রাম বা আরও দুয়েকটি স্থানে ইন্টারনেটের গতি পাওয়া গেলেও দেশের অন্য স্থানে মোবাইলের ইন্টারনেট থাকায় সেখানে ব্যবহারকারী তার প্রয়োজনীয় গতি পায় না। বাস্তবতা হচ্ছে মোবাইল ফোনে ২জি বা ২.৫ জিতে যে গতি পাওয়া যায় তা কোনভাবেই ইন্টারনেটকে ভালোভাবে ব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত নয়। আমরা বহুদিন ধরেই বলে আসছিলাম যে, অন্তত থ্রিজি নেটওয়ার্ক যদি চালু করা যায় তবে ইন্টারনেটের গতি নিয়ে যে সমস্যা তার সমাধান হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনার সময়কালের প্রায় পুরোটাই টেলিকম মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি শুধু লাইসেন্স দিতেই খেয়ে ফেললো। তবুও যদি শেষ পর্যন্ত থ্রিজি লাইসেন্স প্রদান সফলতার সঙ্গে শেষ হয় এবং অপারেটররা সহসাই দ্রুতগতির থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালু করে তবে এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে।

ইন্টারনেটের দাম : বাংলাদেশের ইন্টারনেট প্রসারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় এর ব্যয়। আমরা এখন ৩-৪ কিলোবাইট গতির ইন্টারনেটের জন্য যে অর্থ ব্যয় করি সেটি দিয়ে উন্নত দেশ এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারত বা দক্ষিণ এশিয়ার আরও অনেক দেশেই এমবিপিএস গতি পাওয়া যায় । দুনিয়ার অনেক শহরের পুরোটাই বিনামূল্যে ওয়াইম্যাক্সের সুবিধা পায়। কার্যত দুনিয়ার কোন দেশেই এতো বেশি অর্থ দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয় না। এক সময় এই ব্যান্ডউইদথ-এর ব্যয় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা ছিল। বর্তমান সরকার একে ৪৮০০ টাকায় নামিয়েছে। এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু সরকারের এ খাতে প্রতি এমবিপিএস ২৫০ টাকার বেশি খরচ হয় না। ফলে প্রকৃত ব্যয়ের ২০ গুণ বেশি দামে ব্যান্ডউইদথ বিক্রি করার সরকারি প্রয়াস কোনভাবেই সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি সরকার এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের অনুরোধ বা বক্তব্যও শোনে না। অন্যদিকে সরকার ব্যান্ডউইদথের দাম কমালেও ব্যবহারকারী সেই সুবিধা পায় না।

কেবলমাত্র ব্যান্ডউইদথের দাম নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে এর ওপর আরোপিত শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট। এটি প্রত্যাহার করার জন্য বছরের পর বছর অনুরোধ করা হলেও সেটি প্রত্যাহার করা হয়নি। এমনকি কমানও হয়নি। অর্থমন্ত্রী বারবার কথা দিয়েও সে কথা তিনি রাখেননি।

মাসিক কম্পিউটার জগৎ পত্রিকার জুলাই ‘১৩ সংখ্যায় ইন্টারনেটের ব্যয়বিষয়ক কিছু পরিসংখ্যান প্রদান করা হয়েছে। পাঠকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সেখান থেকে কিছু তথ্য আমি এখানে তুলে ধরছি। প্রথমত ব্যান্ডউইদথের কেনা দামের কথা বলা যায়। বাংলাদেশে ১ এমবিপিএস ব্যান্ডউইদথের দাম এখন ৪,৮০০ টাকা। কম্পিউটার জগতের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এটি ৭ ডলার বা ৫৬০ টাকা। যুক্তরাজ্যে ৩০এমবিপিএস আনলিমিটেড কেনা যেতে পারে মাত্র ৪ পাউন্ডে। 

অন্যদিকে ৪৮০০ টাকা দামে ব্যান্ডউইদথ কিনে গ্রামীণফোন ৪৩ হাজার থেকে ৬০ হাজারে, রবি ৩৮ হাজার থেকে ৫০ হাজারে, এয়ারটেল ৩৮ হাজার থেকে ৪৫ হাজারে, বাংলালিংক ৩৩ হাজার থেকে ৪০ হাজারে এবং টেলিটক ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজারে বিক্রি করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মোবাইল অপারেটরদের এসব প্যাকেজ সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কোন বক্তব্য নেই। এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, বিটিআরসি গ্রাহকদের স্বার্থ দেখার বদলে মোবাইল অপারটেরদের দালালি করছে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বিটিটিবি ও বেসরকারি ইন্টারনেট সেবাদানকারীরা সরকারের কাছ থেকে ৪ হাজার ৮শ’ টাকায় ব্যান্ডউইদথ কিনে ২ হাজার টাকায় ব্যান্ডউইদথ বিক্রি করছে। মোবাইল অপারেটররা কেন এমনটি করতে পারছে না সেটি আমরা বুঝতে অক্ষম।

মাত্র ৬৩৬ টাকা : আমরা হিসাব করে দেখেছি যে, সরকার এখন ব্যান্ডউইদথ বিক্রি করে যে রাজস্ব আয় করে সেই রাজস্ব বহাল রেখেই ব্যান্ডউইদথের দাম ৩শ’ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যান্ডউইদথের দাম ও ব্যবহারের একটি হিসাব দিচ্ছি। বর্তমানের দর ৪৮০০ টাকা প্রতি এমবিপিএস হিসেবে সরকার প্রতি মাসে প্রতি গিগাবিটে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ২শ’ টাকার রাজস্ব পায়। এর মানে হচ্ছে সরকার মোট ২২ জিবিপিএস ব্যবহৃত ব্যান্ডউইদথ থেকে ১০ কোটি ৮১ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ টাকার রাজস্ব পায়। একই পরিমাণ রাজস্ব যদি ১৬৬ জিবিপিএস থেকে পেতে হয় তবে এক এমবিপিএস ব্যান্ডউইদথ মাত্র ৬৩৬ টাকা ১৫ পয়সায় বিক্রি করতে পারে। এই হারটি ইন্টারনেটের জন্য আরও কমানো যায়। আমি ৩শ’ টাকায় প্রস্তাব করছি এজন্য যে, আন্তর্জাতিক ফোন কলের জন্য যে ব্যান্ডউইদথ ব্যবহৃত হবে সেটি কমানোর প্রয়োজন নেই। ফলে ফোন কল থেকে যে বাড়তি রাজস্ব পাওয়া যাবে তা থেকে ৩৩৬ টাকা ইন্টারনেটে কম নেয়া যায়। এক্ষেত্রে সরকারের একটিই লক্ষ্য থাকবে যাতে আমাদের কাছে থাকা পুরো ব্যান্ডউইদথটি ব্যবহৃত হয়। আমি নিশ্চিত যে, প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইদথের দাম ৩শ’ টাকায় নামিয়ে আনা হলে আমরা নিজেরাই পুরো ব্যান্ডউইদথ ব্যবহার করতে পারবো। সরকার যদি সরকারি খাতের ব্যান্ডউইদথের দাম ৩শ’ টাকায় নামিয়ে আনতে পারে তবে খুচরা পর্যায়ে ৫শ’ টাকায় নাািময়ে আনা যাবে।

সরকারের ভ্যাট রাজস্ব নিয়েও একটি হিসাব করা যায়। সরকার এখন যে ২২ জিবিপিএস ব্যান্ডউইদথ বিক্রি করে তাতে সাকুল্যে মাসে ১ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার ১৬০ টাকা ভ্যাট পায়। তবে এর সিংহভাগ টেলিকমিউনিকেশন খাতেই ব্যবহৃত হয়। ফলে যদি সরকার ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহারও করে তবে মাসে সরকারের ভ্যাট খাতে রাজস্ব হারাতে হতে পারে বড় জোর ৫০ লাখ টাকা। আমি ভাবতেই পারি না যে ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাকারী সরকার কেন মাসে ৫০ লাখ টাকার ভ্যাট প্রত্যাহার করতে পারে না।

স্মরণ করা দরকার, দুনিয়ার সব প-িতরাই মনে করেন যে, শতকরা ১০ ভাগ ব্রডব্যান্ড ব্যবহার বাড়লে জাতীয় আয়ে প্রভাব পড়ে শতকরা ২ ভাগ। আমরা ৫শ’ টাকায় ব্যান্ডউইদথের দাম নামিয়ে আনলে ২০১৪ সালেই ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী শতকরা ২০ ভাগ বাড়বে। এর ফলে শতকরা ৬ ভাগ জিডিপি ১০ ভাগে প্রবৃদ্ধি পাবে। সরকারের বিবেচনায় থাকা উচিত যে ১০ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা বেশি নাকি জিডিপির ৪ ভাগ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বেশি।

বিদেশের কাছে বিক্রি : বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত খবর ও বাংলাদেশি-ভারতীয় পত্রিকার খবরের সূত্র অনুসারে জানা গেছে, সরকার গত ৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে ১০০ গিগাবিট গতির ব্যান্ডউইদথ ভারতের কাছে ১ কোটি ডলারে বিক্রি করার চুক্তি করেছে। এই চুক্তি মোতাবেক ১০০ জিবির জন্য ভারত বছরে ৭৮ কোটি টাকা প্রদান করবে। আমরা হিসাব করে দেখেছি যে, এর ফলে বাংলাদেশ প্রতি গিগাবিট বছরে ৭৮ লাখ টাকা করে পাবে। এর ফলে মাসে মাসিক পাওয়া যাবে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মেগাবাইট হিসাবে এর দাম পড়বে ৬৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা। এতে বোঝা যায় যে, সরকার আমাদের ওপরে বর্ণিত হিসাবটিই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে।

আমরা সেজন্যই দাবি করতে পারি যে, ভারতে রপ্তানিতে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নির্ধারণ করতে কোন অসুবিধাই নেই। যদি সেটি না হয়ে দেশের জন্য ৪৮০০ টাকা ও বিদেশের জন্য ৫৩৪/৭৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয় তবে সেটি কোনভাবেই দেশের মানুষের কাম্য হতে পারে না।

সর্বশেষ : গত ২০ আগস্ট ২০১৩ বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ইন্টারনেটের দাম কমানো ও এর সঙ্গে যুক্ত জটিলতা নিরসন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী, আইসিটি মন্ত্রী ও টেলিকম মন্ত্রীর কাছেও এ আবেদনের কপি প্রদান করা হয়েছে। সরকার আবেদনটি বিবেচনা করে ইন্টারনেটের মহাসড়ক দেশের মানুষের জন্য অবারিত করে দেবে এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি এটি বিশ্বাস করি যে, এর ফলে প্রধানমন্ত্রী যেমন করে দেশের উপকার করবেন তেমনি তার রাজনৈতিক অর্জনও অনেক ভালো হবে। এর ফলে তিনি দেশের নতুন প্রজন্মের মানুষের প্রশংসা পাবেন।

গত ২৬ আগস্টের দৈনিক জনকণ্ঠের খবরে জানা গেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক পেজে ঘোষণা করেছেন যে আরেকবার জয়ী হলে তিনি ইন্টারনেটের দাম প্রতি এমবিপিএস ২০০ টাকা করবেন। এ খবরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা দাবি করছি যে, পরের বার জিতে এতে প্রতি এমবিপিএস যদি ২০০ টাকা করতে পারেন আপাতত বর্তমান মেয়াদে যে ক’মাস ক্ষমতায় আছেন তার মাঝেই প্রতি এমবিপিএস ৫শ’ টাকা করুন। এতে জিতে আসার সম্ভাবনা বাড়বে। কেননা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা একটু বেশি আস্থা নিয়ে নৌকায় ভোট দিতে পারবে।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যারের প্রণেতা]

*

*

Top