বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তির কাছাকাছি

মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ট্রিবিউন : মার্ক জুকারবার্গকে যারা জানেন না বা এটাও মানেন না যে, তিনিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি- তাদের জন্য এ লেখা নয়। এটি হচ্ছে এ লেখার ফুটনোট, যেটা আগেই দিয়ে দেওয়া হলো।

ঘটনাটা গত ২৪ ফেব্রুয়ারির। সবে শুরু হয়েছে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় আয়োজন ওয়ার্ল্ড মোবাইল কংগ্রেস। স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিতএবারের আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জুকারবার্গ। সব সময় খবরের অন্তরালে থাকতে আগ্রহী এ ব্যক্তিত্ব কংগ্রেসে অংশগ্রহণকারীদের সামনে আসবেন এটা ছিল বড় খবর।

বছর কয়েক ধরে ফেইসবুকের এ অধিকর্তা যোগাযোগের মাধ্যমের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানের পরও থেকে যাচ্ছিলেন আড়ালে-আবডালে। ফলে এবাররে কংগ্রেসে অংশ নেওয়া ৮০ হাজার প্রযুক্তিকর্মীর প্রত্যেকের মনে কোনো না কোনোভাবে নাড়া দিয়ে গেছেন জুকারবার্গ!

Sajal Zahid-TechShohor

শীর্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির সিইও সামনে আসবেন। সেটি বলা হয়েছিল কংগ্রেস শুরুর কয়েক দিন আগেই। কিন্তু তারপরেও একটি ধোয়াসা তৈরি করে রাখা হয়। কংগ্রেস শুরুর আগের বিকেলেও একবার খবর ছড়িয়ে পড়ে তিনি বার্সেলোনায় এসেছেন, কিন্তু সেমিনারে আসবেন না। খবরটি আশাহত করে অনেককেই।

সুদূর বাংলাদেশ থেকে সম্মলেন কাভার করতে যাওয়া এ গণমাধ্যমর্কমীর ক্ষুদ্র বাসনাতওে একটুখানি আঘাত লাগে। কিন্তু উদ্বোধনের পরপরই যখন নিশ্চিত হওয়া গেছে জুকারবার্গ থাকছেন। কাগজপত্রসহ সব জায়গায় তার নাম উঠে গেছে তখন আবার অন্যরকম উন্মাদনা।

সেদিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় এক ব্যক্তির এ সেমিনার পর্ব। তাকে ঘিরে আগে থেকে যে উন্মাদনা চোখে পড়েছে তা দেখে শংকা ছিল ভীড়ের। তাই তিন ঘন্টা আগে লাইনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

যখন চার নম্বর প্যাভিলিয়নের সেন্টার হলের সামনে মনেমনে ঠিক করা সময়েলাইনে এসে দাঁড়ালাম, কি অবাক কান্ড। দুই লাইন মিলিয়ে আমার সামনে তখন অন্তত চার থেকে পাঁচশ ব্যক্তি আগেই দাঁড়িয়ে গেছেন।

এদের অনেকেই নাকি আরও আগে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছেন। হল খুলতে দেরি হবে। তাই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার ধকল কাটাতে অনেকে আস্তে আস্তে বসতে শুরু করলেন। অনেকে ল্যাপটপ মাথায় দিয়ে শুয়েও রয়েছেন।

mobile congress_techshohor

সামনে শ’পাঁচেক ব্যক্তি থাকায় মনের মধ্যে ঘুরেফিরে সেই শঙ্কা উকিঝুঁকি দিচ্ছে। হলে জায়গা মিলবে তো? তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বস্তির খবর আসল হলের ধারণক্ষমতা দেড় হাজার।

আর কিছুটা সময় যেতে নিরাপত্তা কর্মীরা আর কাউকে লাইনে দাঁড়াতে দিলেন না। তার মানে তখনই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ব্যক্তি লাইনে দাঁড়িয়ে গেছেন।

এদিকে ল্যাপটপ, মোবাইলেওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে করতে চার্জও শূন্য প্রায়। কিন্তু মনের জোর, সে তো বাড়ছে। কিন্তু সময় যেন কাটছে না। হলে ঢুকেও অপেক্ষা। প্রতিটি মুহূর্ত, সেকেন্ড, মিনিট গুণতে গুণতে সেই কাঙ্খিত সময় এলো।

এ কংগ্রেসেই অন্য সব সেমিনারের প্রতিটিতে যেখানে অন্তত চার জন প্যানেল আলোচক ও একজন সঞ্চালক, সেখানে এ সেমিনারে জুকারবার্গ একাই।আয়োজকরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন; কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ যাদুকর থাকা মানে মানেই তীব্র আলোটা তাকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খায়। পাশের বাকি সবাই থাকেন অন্ধকারে।

মাত্র ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ হলে ঢুকল আলোর ঝলকানিতে। কি অপরুপ মুগ্ধতায় দেখছি জুকারবার্গ নামের একটি মানব সন্তানকে যে কিনা শত কোটি মানুষকে টেনে নিয়ে গেছে একটি ছাতার তলে, যার নাম ফেইসবুক।

এ ছাতা তো সাম্যও এনে দিয়েছে। ঢাকার গলির ছেলেটিও দাবি করতে পারে, অন্তত একটি জায়গায় বিশ্বের আরেক ক্ষমতাধর বারাক ওবামার সঙ্গে একই প্লাটফর্মে আছে সে। প্লাটফর্মটির নাম ফেইসবুক।

লাইনের সামনের দিকে থাকায় বসার জায়গাও পেয়েগেছি সামনের দিকেই। পৃথিবী বদলে দেওয়া সেই তরুণের থেকে মাত্র দশ ফুট দূরুত্বে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনছি। যেন প্রতিটি শব্দ আটকে যাচ্ছে মস্তিস্কের পর্দায়।

আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম নোট নেব। মোবাইলে রেকর্ড নেব। অপেক্ষার প্রহরেই ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে ফেলেছি। তাই নোট নিতে শুরু করলাম। কিন্তু পরক্ষণে ভাঙল ভ্রম। আরে এ আমি কি করছি। নোট তো মাথায় থাকবে।

এর চেয়ে শুনছি নীচু স্বরে অথচ কী তেজদ্বীপ্ত কন্ঠে আমার চেয়েও দশ বছরের একটি ছোট এক ছোকড়া কথা বলছে। আর সবাই তা বেদবাক্য বলে গিলে যাচ্ছে।

zukerberg_barcelona_techshohor

তার বলার ধরণ, রশিকতা – সব কিছুর মধ্যেই আশ্চর্য এক ক্ষমতা। যেন আরও কাছে টেনে নেয়। দশ ফুটের দূরত্বকে করে দেয় দশ ইঞ্চি। মার্কিন মুলুক থেকে ভারত-বাংলাদেশ-এশিয়া সবই তার কাছে তখন এক। সবাই যেন ফেইসবুক জাতি।

জানালেন, বিশ্বের পাঁচশ কোটি মানুষকে স্বল্প সময়ের মধ্যে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনার কথা। আহা কি অপরূপ মানবিকতা! থাক না পেছনে ব্যবসা। কিন্তু এতগুলো ইন্টারনেট বঞ্চিত মানুষকে নিয়ে আসতে চাইছেন জ্ঞানের দুনিয়ায় সেও তো কম কথা নয়!

ওয়ার্ল্ড মোবাইল কংগ্রেসে আসার আগের সপ্তাহে বাংলাদেশের বাজেটের অর্ধেকের চেয়েও বেশি মূল্যে কিনেছেন হোয়াটসঅ্যাপ। জানালেন, এ অ্যাপ নিয়ে তার পরিকল্পনার কথাও। এখন হোয়াটসঅ্যাপে কেবল এসএমএস আছে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে যুক্ত হবে বিনামূল্যে ভয়েসও।

বক্তৃতার ফাঁকে ইন্টারনেটের মূল্য কমানোর পথও বাতলে দেন জুকারবার্গ। তিনি বলেন, তিনটি উপায়ে ইন্টারনেটের মূল্য কমানো সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট যন্ত্রপাতির মূল্য কমানো, ডেটার কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সেটা করতে পারলে অল্প দিনের মধ্যে যেমন শত কোটি নতুন গ্রাহক যোগ করা সম্ভব হবে, তেমনি ইন্টারনেটের মূল্যও আসবে কমে; পরিস্কার মত জুকারবার্গের।

বারবার নানা প্রশ্নের মাধ্যমে ঘুরে ফিরে একটা কথাই বললেন, আনকানেকডেট পিপলকে কানেক্ট করাই তার জীবনের মূল ব্রত।বক্তৃতার শেষে প্রশ্নও নিলেন কয়েকটা। প্রশ্ন করতে হাজারো হাত উঠলেও সুযোগ পেলেন কয়েক জন। প্রশ্ন কর্তার সঙ্গে করলেন রসিকতাও।

দেড় ঘন্টার সেমিনার তখন শেষ। মনে হলো, ১৫ মিনিটও হয়নি। কিন্তু সেমিনার থেকে ফিরে আসার পথে মনেমনে একটাই চেয়েছি, এগিয়ে যাও জুকারবার্গ। আনকানেকডেটকে কানেক্ট করতেই হবে। আমেরিকা আর বাংলাদেশের মাঝখানের হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব দশ ফুটের মধ্যে আনার এই একটা পথই তো এখন খোলা।

Related posts

*

*

Top