ধনী ব্যবসায়ীদের গরীব সমিতি বিসিএস

আল আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : হাজার কোটি টাকার তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) আর্থিক দৈন্যতা দীর্ঘদিনের। দেশের ব্যবসায়ীদের অন্য অ্যাসোসিয়েশন বা সমিতিগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও বিসিএসের তহবিলের অবস্থা করুণ।

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দুই যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তহবিলের আকার মাত্র দুই কোটি টাকার একটু বেশি। যেখানে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বায়রাসহ বিভিন্ন খাতের অ্যাসোসিয়েশন বা সমিতির তহবিল অর্ধশত কোটি টাকা থেকে শত কোটি টাকার কাছাকাছি।

এ প্রসঙ্গে বিসিএস সভাপতি মোস্তাফা জব্বার টেকশহরডটকমকে বলেন, “যে যাই বলুক অর্থই ফ্যাক্টর। অর্থ না থাকলে সমিতি ঠিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, দুর্বল থাকে।”

BCS ICT World 2014 Meet the press-TechShohor

প্রবীণ এ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বলেন, সংগঠনের নিজস্ব কোনো তহবিল ছিল না। বরং মাইনাস অবস্থা থেকে শুরু করতে হয়েছে। এখন দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার সময় দুই কোটি টাকারও বেশি তহবিল রেখে যাচ্ছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজস্ব তহবিল সংকট থাকায় বিসিএসের নানা কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতাই একমাত্র ভরসা। সদস্যদের কল্যাণে বা বিপদে সহায়তার জন্য বিসিএসের ভূমিকা নামমাত্র। সম্প্রতি সদস্যদের জন্য একটি কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়েছে। কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবারকে এ তহবিল থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে বর্তমান কমিটি প্রস্তাব করেছে।

সদস্যরা বলেন, আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে বছর জুড়ে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিতে পারত এ সমিতি। সভা, সেমিনার, কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরও অবদান রাখতে পারত। অন্য সংগঠনগুলোর বছরজুড়ে বিভিন্ন কার্যক্রম থাকলেও বিসিএস অনেক পিছিয়ে। শুধু মেলা আয়োজনের মধ্যে সংগঠনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হওয়ায় অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেন।

বিসিএসের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব এবং সাইবার কমিউনিকেশনস লিমিটেডের সিইও নাজমুল আলম ভূঁইয়া বলেন, সদস্যদের জন্য অনেক কিছু করা থাকলেও সেভাবে কিছু করা হয়নি। সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়লে তাদের পাশে আগে দাড়ানোর মতো আর্থিক অবস্থা সমিতির ছিল না। সম্প্রতি একটি কল্যাণ তহবিল গঠন করা হলেও এটির পরিধি আরও বাড়ানো দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংগঠনের তহবিল সমৃদ্ধ থাকলে এটির মতো আরও অনেক কাজ করা যেত বলে মনে করেন নাজমুল।

প্রযুক্তিপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ব্র্যান্ডের চেয়ারম্যান এএসএম আব্দুল ফাত্তাহ বলেন, বিসিএসের বর্তমান ভূমিকা যথেষ্ট নয়। শেষ দুই মেয়াদে কার্যক্রম যতটুকু হওয়া দরকার ছিল তা হয়নি। কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংগঠন হিসাবে আমরা চাঁদা দিচ্ছি এবং মেলাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা দিচ্ছি। তবে সেভাবে তহবিল গড়ে তোলা যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডাটা সলিউশনস লিমিটেডের সিইও এবং ইস্টার্ন প্লাজা বিসিএস ল্যাপটপ বাজারের সভাপতি আব্দুল মোমিন খান বলেন, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িকভাবে বিপদে পড়েছেন এমন সদস্যদের উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা বিসিএস করতে পারে না। তহবিল সংকটই এর প্রধান কারণ।

এ সংগঠক বলেন, সম্প্রতি কল্যাণ ফান্ড নামে একটি তহবিল হয়েছে। তবে তা কোনো সদস্যের মৃত্যুর পর তার পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য। ব্যবসায়িক কোনো সহযোগিতা বিষয়ক নয়। সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে একটা নিয়মের মধ্যে এ সহায়তা করা যেত।

তিনি বলেন, বিসিএসর মাকের্টগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর অবস্থা ভালো নয়। ইস্টার্ন প্লাজা মার্কেটটিকে পরিচিত করতে যে অর্থ দরকার সেটুকুই আমরা পাইনি।

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সদস্যদের নিয়ে বছর জুড়ে কার্যক্রম চালাতে না পারায় সংগঠনের বিষয়ে সাধারণ সদস্যদের আগ্রহ কম। যার প্রমাণ দেখা যায় ২০১২ ও ২০১৩ সালের বিসিএসের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম)।

২০১২ সালে নেতারাসহ উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৫২ জন সদস্য। আর ২০১৩ সালে উপস্থিত ছিলেন ১৮০ জন।  যেখানে বর্তমানে সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ৯৮৭। আর সর্বমোট সদস্য ১ হাজার ২৬৫ জন।

বিসিএসের ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আর্থিক হিসাব বিবরণীতে দেখা যায়, গত এক বছরে বিভিন্ন খাত থেকে সর্বমোট আয় হয়েছে ৭৮ লাখ ২৩ হাজার ২১০ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ৫৫ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯৭ টাকা। এর আগের বছরগুলোতেও আয়-ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি। ফলে বছর শেষে তহবিলের আকার খুব বেশি বাড়ছে না।

ধনী সদস্যদের বৃহৎ এ সংগঠনের তহবিলের গরিবি হাল দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের মতে বিসিএসের সদস্য হিসাবে কম্পিউটার সোর্স, ফ্লোরা লিমিটেড, ড্যাফোডিল, গ্লোবাল ব্রান্ড, স্মার্ট টেকনোলজিসহ দেশের অনেক ধনী  কোম্পানি থাকলেও সংগঠনের কার্যক্রমে এর কোনো প্রতিফলন নেই। এ জন্য নেতাদের নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেন সদস্যরা।

Related posts

*

*

Top