বিসিএসে ভাগাভাগির নেতৃত্ব চান না সদস্যরা

আল আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : সংগঠনের শীর্ষ পদ ভাগাভাগি করে নেতৃত্ব দেওয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতিতে (বিসিএস)। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সর্ববৃহৎ এ সংগঠনে বিরল এ ঘটনার দেখা মেলে বর্তমান কমিটির মেয়াদকালে। আগামী মেয়াদেও এ প্রবণতা বজায় থাকতে পারে বলে গুঞ্জন ব্যবসায়ীদের মুখে মুখে।

নির্বাচনকে ঘিরে সংগঠনের একক নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে। ভোটারদের মতে, শীর্ষ পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে নেতারা সংগঠনের এবং এ খাতের উন্নয়নকে ছাপিয়ে ক্ষমতার অংশ হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এর মাধ্যমে সংগঠনকে ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলে তা বিসিএসের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ ভোটাররা।

BCS Election-TechShohor

চলতি ২০১২-২০১৩ মেয়াদে সভাপতি হয়েছেন তিন জন। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মো. ফয়েজউল্লাহ খান। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন সহ-সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম। তিনি পাঁচ মাস সভাপতি থাকেন। এরপর কমিটিতে পরিচালক পদে থাকা মোস্তাফা জব্বারকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। যিনি এখন পর্যন্ত এই পদে রয়েছেন।

গতবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে আগেই এমন সন্ধি করা হয়েছিল বলে ভোটাররা জানান। অনেক সদস্য বলেছেন, সেবার নির্বাচনের সময় এমন গুঞ্জন শুনলেও তারা সেটি বিশ্বাস করতে চাননি। পরে এটি বাস্তব হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন অনেকে।

সদস্যদের মতে, সংগঠনের সভাপতি হিসাবে একটি মেয়াদে একজনেরই দায়িত্ব পালন করা উচিত। যিনি তার নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। অথচ তারা আগেই যদি ঠিক করে রাখেন এ পদটি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করবেন, তবে তা সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।

ভাগাভাগির কমিটির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন বর্তমান মেয়াদে সর্বশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফা জাব্বার। তিনি বলেন, ‘আগের নির্বাচনে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল এক জন এক বছর করে সভাপতি থাকবেন। প্রথম বছর ফয়জুল্লাহ খান সভাপতি থাকলেন। এরপর দায়িত্ব নিলেন মো.মঈনুল ইসলাম। এ পর্যায়ে আমরা দেখলাম সমিতির কাজ ঠিকভাবে হচ্ছে না। পরে কমিটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দিল।’

ক্ষমতার এ চর্চাটা একটি সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে প্রবীণ এ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বলেন, এতে কাজের গতি মারাত্বকভাবে ব্যাহত হয়। সত্যিকারভাবে ভোটাররা ঠকছে, তারা একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছে। পদ ভাগাভাগির এ সংস্কৃতির কারণে যোগ্য ব্যক্তিরা বিসিএস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা নির্বাচনে আসছে না। কারণ নেতৃত্ব নিয়ে এ ধরণের সমঝোতা ও গ্রুপিংয়ের কারণে তারা জিততে পারে না।

বর্তমান সভাপতি বলেন, ‘এ থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবাসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইকে বহুবার বলেছি। নির্বাচন পদ্ধতিটির সংস্কারের জন্য, যেখানে এ সুযোগ থাকবে না।’

সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৮৭ সাল থেকে প্রায় এক যুগ বিসিএসের নেতৃত্বে থাকা আব্দুল্লাহ এইচ কাফী এ প্রসঙ্গে টেকশহরডটকমকে  বলেন, ‘এটি আমাদের দুর্ভাগ্য। এ কারণে সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি। এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর যে এখন পদের ভাগাভাগি হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট বা মহাসচিব হওয়াটাই যেন মূল উদ্দ্যেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা সংগঠনকে ধীরে ধীরে খারাপ অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

এশিয়ান-ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশনের (এসোসিও) বর্তমান চেয়ারম্যান ও জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের সত্ত্বাধিকারী কাফি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সত্য বলতে কি সমিতির জন্য যারা আন্তরিক, ভালো মানুষ এবং এ খাতের উন্নয়নে যারা ভূমিকা রাখতে পারতেন তারা এখন দূরে সরে গেছে। এ নীতিহীন জায়গায় আমরা বিব্রতবোধ করি।

হতাশ এ প্রবীণ সংগঠক বলেন, ‘নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছি। কখনও কোনোভাবে বেনিফিটেড হওয়ার কথা কল্পনায়ও আনিনি। আর এখন সমিতি যেন সরকারি- বেসরকারি খাত থেকে ব্যক্তিগত বেনিফিট আদায়ের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তার অভিযোগ, নেতা হওয়ার জন্য সমিতিতে এখন পকেট ভোটার বানানো হয়। এ কারণে ৩০ ভাগ ভোটারের অস্তিত্বই নেই। ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় নির্বাচিত হতে পদ ভাগাভাগি করতে জোট বাধতে হয় তাদের।

এইচ কাফি বলেন, আগের বারতো সভাপতি পদে ভাগাভাগি হয়েছে। এবার  শুনেছি সভাপতি ও মহাসচিব উভয় পদে ভাগাভাগি হচ্ছে। সমিতি নিয়ে ছেলেখেলা ও অপমানজনক কার্যক্রম শুরু হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সাধারণ সদ্যসরা প্রভাবশালীদের ক্ষমতার ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে। এতে এ খাতটি ভাবমূর্তি সংকটেও পড়েছে।

ইস্টার্ন প্লাস বিসিএস ল্যাপটপবাজারের সভাপতি এবং ডাটা সলিউশনস লিমিটেডের সিইও আব্দুল মোমিন খানও এ বিষয় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি টেকশহরডটকমকে বলেন, ‘বিসিএস নেতাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এখানে বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো চলেন। রয়েছে নানা উপদল।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে অংশ নেওয়া মোমিন বলেন, ‘বর্তমান কমিটিতেও ক্ষমতার ভাগাভাগি হয়েছে। একই মেয়াদে সভাপতি হয়েছেন তিন জন। শুনেছি আসছে নির্বাচনেও এ পদ নিয়ে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে। আমি প্রার্থী হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে কিছু না বলাই ভালো।’

আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সিএনসি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের সিইও ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকারও সামনের কমিটিতে দুটি পদের ভাগাভাগির বিষয়টি শুনেছেন উল্লেখ করে বলেন, চলতি মেয়াদে তিন জন সভাপতি হয়েছেন। এটা সদস্যরা ভালভাবে নেয়নি। এটি সংগঠনের জন্য শুভকর কিছু নয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিএস কম্পিউটার সিটির (আইডিবি) একাধিক ব্যবসায়ী শীর্ষ পদ ভাগাভাগির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, সংগঠনের চেয়ে যেন সভাপতির পদে যাওয়া যেন নির্বাচিত পরিচালকদের প্রধান পছন্দ। আসন্ন নির্বাচনেও এমন খবরের গুজব শুনেছেন জানিয়ে তারা এটি সমিতির জন্য অশনি সংকেত বলে উল্লেখ করেন।

বিসিএসের বর্তমান মহাসচিব এবং ইপসিলন সিস্টেমস অ্যান্ড সলিউশন লিমিটেডের সিইও মো. শাহিদ-উল-মুনীর টেকশহরডটকমকে বলেন, এক মেয়াদে তিন জন সভাপতি হলে একটু সমস্যাতো হবেই। তবে পরিচালক থেকে সভাপতি হওয়ায় তারা সবাই যোগ্য বলে খুব একটা ঝামেলা হয় না। এমন হয়নি যে, এক সভাপতি একটা কাজ শুরু করেছেন। আর পরের জন এসে তা বন্ধ করে দিয়েছেন।

সাধারণ সদস্যদের ক্ষোভ প্রসঙ্গে মুনীর বলেন, তাদের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি। সে অনুযায়ী প্রাপ্তি কম হওয়ায় অনেকে হয়ত হতাশ।

Related posts

*

*

Top