উড়োজাহাজের যোগাযোগ প্রযুক্তি

এস আই শরীফ, অতিথি লেখক: আকাশে চলন্ত অবস্থায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘এমএইচ-৩৭০’ উড়োজাহাজ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা জন্ম দিয়েছে নানা রহস্যের। উড়ালযানে এতো এতো প্রযুক্তির ব্যবহারের পরও কী এটা সম্ভব?

প্রশ্ন উঠছে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অগ্রগতি নিয়েও। উড়োহাজাজের যোগাযোগ প্রযুক্তি কেমন হয়, সেসব বিষয় জানাতে এ প্রতিবেদন।

আকাশ উন্মুক্ত হলেও উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য পথ পূর্বনির্ধারিত। ওপরে পাইলট উড়োজাহাজ চালালেও নিচ থেকে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এরূপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে কোনো বেসামরিক বিমান সাধারণত চলাচল করে না।

Malaysia-Airlines-MH370_techshohor

এ জন্য রয়েছে ‘ট্রাফিক কন্ট্রোল সার্ভিস’। যিনি এ নিয়ন্ত্রণকাজ করেন তাঁকে বলা হয় ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার’।

নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য নানা রকম কমিউনিকেশন, নেভিগেশন ও সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের কারণে কয়েক বছরে উড়োজাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে।

কমিউনিকেশন
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য বিমানচালক ও কন্ট্রোলারের মধ্যে সব সময় যোগাযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিচ থেকেই আকাশে থাকা উড়োজাহাজকে প্রয়োজনীয় তথ্য যেমন, স্টার্টআপ, ল্যান্ডিং ও টেকঅফ ক্লিয়ারেন্স, ফ্লাইট লেভেল অনুমোদন, আবহাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ভয়েস কমিউনিকেশনের মাধ্যমে কন্ট্রোলার চালককে প্রয়োজনীয় তথ্য দেন।

ভিএইচএফ ফ্রিকোয়েন্সি ১১৮ থেকে ১৩৭ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ক্যারিয়ারকে ভয়েস দিয়ে মডুলেশন করে রেডিও ওয়েভ ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে এ যোগাযোগ হয়ে থাকে।

এয়ারক্রাফটস কমিউনিকেশনস অ্যাড্রেসিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সিস্টেম, সংক্ষেপে একে বলা হয় এসিএআরএস। এ সিস্টেমের মাধ্যমেও বিভিন্ন নির্দেশনা আদান-প্রদান হয়।

মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের বিমানটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত এসিএআরএস থেকে পাঠানো বেশ কয়েকটি সংকেত স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। এসব সংকেত থেকে ধারনা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটি বেশ কয়েক ঘণ্টা ওড়ার পর ভারত মহাসাগরের আকাশে চলে গিয়েছিল।

নেভিগেশন
নেভিগেশনের মাধ্যমে আকাশে এয়ার রুট নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট করা এবং পাইলটের জন্য তার অবস্থান ও চলার দিক নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা হয়। অতীতে এয়ার নেভিগেশনের সব ব্যবস্থাই ছিল ভূমিকেন্দ্রিক। সিস্টেমগুলোতে চলতো রেডিও ওয়েভ ট্রান্সমিটার।

তবে উড়োজাহাজের ওড়ার পথ আঁকাবাঁকা হওয়ায় ভূমিভিত্তিক এ নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারে সমস্যার সৃষ্টি হয়। স্যাটেলাইট সিস্টেমভিত্তিক নেভিগেশনে এসব সমস্যা দূরে ঠেলা সম্ভব হয়েছে।

navigation_techshohor

জিএনএসএস শিরোনামে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন বা আইসিএও উড়োজাহাজ চলাচলে নেভিগেশনের জন্য ব্যবহৃত স্যাটেলাইট সিস্টেমের স্পেসিফিকেশন তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে জিএনএসএস একটি জেনেরিক টার্ম, এ নামে বাস্তবে কোনো সিস্টেম নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) এবং রাশিয়ার গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএলএনওএসএস) হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জিএনএসএস সিস্টেম। ইউরোপীয় দেশগুলো গ্যালিলিও নামে স্বতন্ত্র আরেকটি সিস্টেম তৈরি করেছে। চীন ও ভারতেরও পৃথক নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম আছে।

এ সিস্টেম যেভাবে কাজ করে
সিস্টেমটির স্পেস সেগমেন্ট মূলত ২৪টি স্যাটেলাইটের একটি কনস্টলেশন নিয়ে গঠিত। এতে ছয়টি অরবিট ও প্রতিটিতে চারটি করে স্যাটেলাইট রয়েছে। স্যাটেলাইটগুলো ১২ ঘণ্টায় একবার করে নিজ অরবিটে থেকে ক্রমাগতভাবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছে।

স্যাটেলাইটগুলোর অরবিট, অবস্থান ও গতি পৃথিবীর যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময়ে অন্তত চারটি স্যাটেলাইট আনুভূমিক দৃষ্টিবলয়ের ওপর অবস্থান করে। প্রতিটি স্যাটেলাইট ক্রমাগতভাবে নেভিগেশন ডেটা ফ্রেম ট্রান্সমিট করছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ডেটা ফ্রেম থেকে জিপিএস রিসিভার নিজ অবস্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা ও সময় নির্ধারণ করতে পারে।

সার্ভেইল্যান্স
উড়োজাহাজের পজিশন রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সবচেয়ে সরল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল করা হয়। এয়ারগ্রাউন্ড ভিএইচএফ ভয়েস রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে এ রিপোর্ট করা হয়। তবে রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে স্ক্রিন ডিসপ্লেতে একজন কন্ট্রোলার উড়োজাহাজের অবস্থানের বাস্তব ট্রাফিক ম্যাপ দেখতে পান।

উড়োজাহাজ চলাচল সার্ভেইল্যান্সের ক্ষেত্রে দু’ধরনের রাডার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। একটি প্রাইমারি সার্ভেইল্যান্স রাডার (পিএসআর) এবং অপরটি সেকেন্ডারি সার্ভেইল্যান্স রাডার (এসএসআর)।

মালয়েশিয়ার উড়োজাহাজটির ক্ষেত্রে কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ে যাওয়ার পথে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর তার সর্বশেষ অবস্থান রাডারে ধরা পড়ে। এরপর রাডার থেকে এটি উধাও হয়ে যায়। উড়োজাহাজটি রাডার থেকে উধাও হওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রহস্য দানা বাঁধছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাগরে কোনো রাডার কেন্দ্র নেই। কেননা রাডারের রেঞ্জ নিয়ে আজও সমস্যা আছে। ভূপৃষ্ঠের রাডার কেন্দ্রগুলো থেকে যে সংকেত পাঠানো হয়, তা উড়োজাহাহে প্রতিফলিত হয়ে আবার রাডারে ফিরে আসে এবং সেখানে গৃহীত ও নথিভুক্ত হয়। কাজেই উড়োজাহাজগুলো খোলা সমুদ্রে গেলে, সেগুলো রাডার থেকে হারিয়ে যায়। আবার উপকূলের কাছে এলে আবার রাডারে ধরা পড়ে।

রাডার কিভাবে কাজ করে?
রেডিও ডিটেক্টিং অ্যান্ড রেঞ্জিংকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘রাডার’। দূরের কোনো বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার জন্য সাধারণত রাডার ব্যবহার করা হয়। রাডারের সাহায্যে ঘন অন্ধকারেও দূরের বস্তুকে লক্ষ্য করা যায়। এ জন্য রাডার উড়োজাহাজের পাইলট কিংবা জাহাজের ক্যাপ্টেনের তৃতীয় নয়ন হিসেবে কাজ করে।

Radar_techshohor

রাডার যন্ত্র উড়োজাহাজে, জাহাজে এবং স্থলভাগের যে কোনো স্থানেই ব্যবহার করা যায়। স্থলভাগে বসানো রাডার যেমন বলে দিতে পারে আকাশে কোথাও শত্রু উড়োজাহাজের আগমন ঘটেছে কি না, তেমনি উড়োজাহাজে অবস্থিত রাডারও বলে দিতে পারে নিচে কোথায় বিমানবন্দরের অবস্থান।

রাডার স্টেশন এক ধরনের মিনি সাইজের বেতার কিংবা টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্রের মতো। এ কেন্দ্র থেকে আকাশে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করা হয়। যখন এ বেতার তরঙ্গ আকাশে কোনো কঠিন বস্তুতে আঘাত করে তখন প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এ প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গই ধরা পড়ে রাডারের গ্রাহকযন্ত্রে।

রাডারের গ্রাহকযন্ত্রের অংশটি অনেকটা টেলিভিশনের মতো। এখানে প্রত্যাবর্তনকারী তরঙ্গের আলোর সংকেতই পর্দায় ভেসে ওঠে আলোর বিন্দুরূপে। রাডারের এ তরঙ্গ খুবই দ্রুত ছুটে যায় এবং দূরের বস্তুতে আঘাত করে আবার ফিরে আসে এবং আলোর বিন্দু হয়ে পর্দায় ভেসে ওঠে। এ প্রক্রিয়াটি চোখের পলকে হয়।

রাডারের পর্দার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছে একটি অপেক্ষাকৃত বড় আলোর বিন্দু। বড় আলোর বিন্দুটি হলো নিজের অবস্থান। এর চারপাশে যদি কোনো আলোর বিন্দু ফুটে ওঠে তাহলে ধরে নিতে হবে ওখানে বা কতটা দূরে আছে নির্দিষ্ট বস্তুটা। রাডারের পর্দার নম্বর ও অক্ষরই বলে দিতে পারে বস্তুটির অবস্থান কোথায়, কোন দিকে আছে এবং কত দূরে আছে।

ব্ল্যাক বক্স নিয়ে কয়েকটি কথা
উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবস্থায় উড্ডয়নকালের যাবতীয় তথ্য রেকর্ডের ডিভাইস হচ্ছে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার। উড্ডয়নকালে ককপিটের সব রকম কথাবার্তা ও শব্দ রেকর্ডের ডিভাইস হচ্ছে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার। এ ডিভাইসগুলোর অন্য নাম ‘ব্ল্যাক বক্স’। উড্ডয়নকালে বিমানের acceleration, airspeed, altitude, flap settings, outside temperature, cabin temperature and pressure, engine performance-সহ প্রায় ১০০ ধরনের তথ্য রেকর্ডফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার।

black-box-techshohor

এ ছাড়া ককপিটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে মাইক্রোফোন বসানো থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে সব ধরনের শব্দ রেকর্ড করে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার। বিশেষ করে যখন কোনো বিমান বিধ্বস্ত হয় তখন বিমানটির দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য ওই বিমানের ব্ল্যাক বক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ব্ল্যাক বক্সগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে উচ্চমাত্রার তাপ ও চাপ এর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এটি সাধারণত লাল অথবা কমলা রঙের হয়ে থাকে, যাতে বিধ্বস্ত বিমানের ধংসাবশেষ থেকে বক্সগুলো সহজে শনাক্ত করা যায়।

সর্বশেষ নেক্সটজেন প্রযুক্তি
বিমান চলাচলে নেক্সটজেন প্রযুক্তি আসার পর এর যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কমিউনিকেশন, নেভিগেশন ও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমে যোগ হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি। নেক্সটজেন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এর মধ্যেও জিপিএস ও অন্য সব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কেন এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ‘উধাও’ উড়োজাহাজটির অবস্থান জানা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে?

নাকি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এটি। আশঙ্কার কারণ, ওই উড়োজাহাজেই ছিলেন গায়েব প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় জড়িত ২০ বিজ্ঞানী। এখন শুধুই অপেক্ষা, কবে খোঁজ পাওয়া যাবে ২৩৯ জন যাত্রীসহ উধাও উড়োজাহাজটির।

Related posts

*

*

Top