Maintance

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলার দাপুটে হওয়ার মিশন শুরু

প্রকাশঃ ১০:২৫ অপরাহ্ন, জুন ১০, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৪:৩৫ অপরাহ্ন, জুন ১২, ২০১৭

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : বাংলায় চিঠি লিখলেন। আর সে চিঠি পড়ে আপনার মনের কথা বুঝে ফেলছে ডিভাইস। ইন্টারনেট বা ওয়েবে বাংলা কথামালার ভেতরে থাকা আবেগ-অনুভূতিগুলোও ধরে ফেলবে এদেশেরই তৈরি করা সফটওয়্যার।

বাংলা বানান ও ব্যাকরণে ভুল করেও আর হবে না ভুল। একজন নির্ভুল পরীক্ষক সারাক্ষণ সঙ্গী হয়ে থাকবে আপনার লেখাজোখায়। গুগলে দাঁতভাঙ্গা অনুবাদ নয়, পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন ভাষার বই বা কনটেন্টটি আপনার প্রয়োজনে নিমিষেই ঝরঝরে বাংলায় অনুবাদ হয়ে মেলে থাকবে আপনার ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে।

আবার বাকহীনদের ভাষা বুঝবেন কীভাবে ? ইশারা ভাষাও জানেন না। এখানেও সমাধান, ইশারা রূপান্তর হয়ে শুনতে পাবেন শ্রুতিমুধুর বাংলা।

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষাকে নিয়ে এমন আরও উদ্যোগ বাস্তবায়নে শুরু হয়েছে যজ্ঞ। আর উদ্যোগটা সরকারের।

প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক শুরু ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম : 

চলতি বছরের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন পায় গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ শীর্ষক প্রকল্প। ৩ জানুয়ারি অনুমোদন দেয়া ১৫৯ কোটি ২ লাখ টাকার প্রকল্পটিতে এখন কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা রয়েছে ২০১৬ সালের জুন হতে ২০১৯ এর জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে সাধারণ ও অল্পশিক্ষিত মানুষও তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আসছেন। এতে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ব্যবহার সকলের জন্য সহজ হবে।

এছাড়া গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাকে শীর্ষ পর্যায়ে নেয়া, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়ক বাংলা ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রমিতকরণ, বাংলা কম্পিউটিংয়ে বিভিন্ন টুলস, প্রযুক্তি ও বিষয়বস্তুর উন্নয়ন এবং জরিপ, সমীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম করা হবে।

একনেক অনুমোদনের এক মাস পরই ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়। ১৫ মে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি প্রথম সভায় বসে। স্টিয়ারিং কমিটি সভা করে ২৪ মে।

প্রকল্পে যা এখন দৃশ্যমান :

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ইতোমধ্যে নিয়োগ পেয়েছেন ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ। সঙ্গে ডেপুটি হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ রাশেদ ওয়াশেফ।

প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। সরাসরি পদ্ধতিতে দুইজন অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং একজন হিসাবরক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।

সাতটি পদে কনসালট্যান্ট নিয়োগের মূল্যায়ন ইতোমধ্যে সম্পন্ন। এগুলোর প্রাক চুক্তি নেগোসিয়েশনও করা হয়েছে, যা এখন অনুমোদনের অপেক্ষায়। মূলধন খাতে আসবাবপত্র কিনতে কার্যাদেশ দেয়া শেষ। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন চলছে।

বর্তমানে বিসিসি ভবনের ৯ তলায় প্রকল্পটির কার্যালয় থাকলেও ভবনের ১৪ তলার উত্তরাংশে এর জন্য ২৫০০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির স্থায়ী ঠিকানা হবে সেখানেই।

অগ্রগতিতে যা হচ্ছে :

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (বিসিসি) সফটওয়্যারের স্পেসিফিকেশন ও মূল্যমান নিরূপণে বৈঠকে বসে প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটি।

বিসিসির নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার সরকারের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠিত হয়। সভায় একটি কারিগরি কর্মশালা করে প্রকল্পের টুলসগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে বলে টেকশহরডটকমকে জানান প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার।

২০ জুনে ওই কর্মশালা করার কথা রয়েছে।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রকল্পটির মেয়াদ হিসাবে ইতোমধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সামনে আছে আরও দুই বছর। কাজটি বিশাল, ব্যাপক। সময়টা খুবই কম। তবে কাজটি শুরু করে সফলতা অর্জন করা গেলে সময় বাড়ানো হয়তো তেমন কঠিন কাজ হবে না।

বিশেষজ্ঞ কমিটির এই সদস্য মনে করছেন, বিশ্বের অন্য ভাষাগুলোর তূলনায় আমাদের ভাষার প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধিকরণ আদৌ না হবার ফলে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একমাত্র সুযোগ যার ভিত্তিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সারা বিশ্ব জয় করবে।

বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আরও রয়েছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ডঃ জিনাত ইমতিয়াজ আলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিনিধি সুশান্ত কুমার সরকার, বুয়েটের প্রতিনিধি মোঃ মনিরুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির প্রতিনিধি অপরেশ কুমার ব্যানার্জি ও প্রকল্প পরিচালক।

যেসবের জন্য এত আয়োজন :

১. বাংলা করপাস বা ভাষাংশ
২. বাংলা ওসিআর
৩.বাংলা স্পিচ টু টেক্সট এবং টেক্সট টু স্পিচ
৪. ন্যাশনাল কিবোর্ডের আধুনিকায়ন
৫. স্টাইল গাইড
৬. বাংলা ফন্টের ইন্টার-অপারেবিলিটি ইঞ্জিন
৭. বাংলা ভাষায় কমন লোকাল ডেটা রিপোজিটোরি (সিএলডিআর)
৮. বাংলা বানান ও ব্যাকরণ শুদ্ধিকরণ বা এক্সামিনার
৯. বাংলা মেশিন ট্রান্সলেটর ডেভেলপমেন্ট
১০. স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার
১১. প্রতিবন্দ্বীদের জন্য সফটওয়্যার, ডিজিটাল ইশারা ভাষা
১২. সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস টুলস উন্নয়ন
১৩. বাংলার জন্য বহুভাষিক সার্ভিস প্লাটফর্ম
১৪. সাইট অনুবাদ
১৫. নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভাষার প্রমীত কিবোর্ড
১৬. বাংলার আন্তর্জাতিক ফোনেটিক অ্যালফাবেট উন্নয়ন।

প্রশ্ন আছে সক্ষমতারও :

মোস্তাফা জব্বার মনে করেন এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ । এতদিন তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার উন্নয়নে অর্থ সংস্থানের শঙ্কা থাকলেও এখন সবাই ভাবছেন এই কাজগুলো সম্পন্ন হবে কেমন করে।

বাংলার ভাষাবিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিজ্ঞানী উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রকল্পের সফলতার দৃঢ় আশাবাদ জানিয়ে তিনি টেকশহরডটকমকে বলেন, ভাষার জন্য রক্ত দেয়া জাতি হিসেবে আমরা কোনোভাবেই এটিকে ব্যর্থ হতে দিতে পারিনা।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলা ভাষার এই টুলসগুলো উন্নয়ন করার জন্য সক্ষমতা অনুসন্ধানের তথ্য দিয়ে এই তথ্যপ্রযুক্তিবিদ জানান, বাংলা নিয়ে কাজ কেবল আমাদেরই করার বিষয় নয়। এরই মাঝে অ্যাপল, মাইক্রোসফট, গুগল ও ফেইসবুকের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলা নিয়ে কাজ করছে। তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সন্দেহাতীত বলেই তাদের উন্নয়ন করা প্রযুক্তিগুলো যদি সরকার সংগ্রহ করতে পারে তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রকল্পটিতে সহায়তা পাওয়া যাবে।

*

*

Related posts/