ঢাকার রাস্তায় সোলার গাড়ির স্বপ্ন দেখাচ্ছে সান রাশ

হাসান শাহরিয়ার হৃদয়, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : এখনকার বাজারে গাড়ি পোষা খুব সহজ নয়। চড়ামূল্য দিয়ে কেনার পর তেল বা গ্যাসের ব্যয় নিত্য গা জ্বালায়। যদি কেমন হতো যদি গাড়ি চালাতে এ উচ্চ দরের জ্বালানির প্রয়োজন না হয়। সারাদিন গাড়িতে চলার পর অবশিষ্ট জ্বালানির পরিমাণের খোঁজ নিতে না হয। পরের দিনে জ্বালানির পরিকল্পনা করতে না হয়।

এ খাতে বিপুল ব্যয়ের কারণে দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প ব্যয়ের জ্বালানির খোঁজে রয়েছেন গবেষকরা। পানি দিয়ে গাড়ি চালানোর কথাও উঠেছে বিভিন্ন সময়। তবে তা কাজের কিছু হয়নি। এরপর সৌরশক্তি চালিত গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা চলতে থাকে। সফলতাও আসে দ্রুত। উন্নত দেশগুলোতে এখন চাহিদা বাড়ছে সৌরশক্তিচালিত গাড়ির।

solar car_techshohor

এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে এতদিন ছিল বাংলাদেশ। অথচ আমাদের জ্বালানি সংকট প্রতি বছর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এ অবস্থায় ঢাকার রাস্তায় সৌরশক্তিচালিত গাড়ি নামানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের একটি দল সান রাশ। তারা তৈরি করেছেন দেশের প্রথম চার চাকার সোলার গাড়ি। এ গাড়ি নিয়ে তারা ভারতে অনুষ্ঠিতব্য এক গাড়ির প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেবেন।

গাড়িটি লম্বায় ৯ ফিট ও চওড়ায় ৪ দশমিক ৬ ফিট। উচ্চতা ৪ ফিট ৭ ইঞ্চি, ওজন ১৪০ কেজি। আপাতত এতে একটি আসন থাকলেও সহজেই চার আসনে পরিণত করা যাবে।

বাংলাদেশে এর আগে সোলার চালিত ছোট ও শখের যানবাহন তৈরি হলেও পূর্ণাঙ্গ গাড়ি এ প্রথম। এর বিশেষত্ব কি জানতে চাইলে সান রাশের সদস্যরা জানান, এটি যে কোন সাধারণ গাড়ির মতোই দেশের সড়কগুলোয় চলতে পারবে।

নির্মাতাদের অন্যতম লক্ষ্য গাড়িটি থেকে যতবেশি সম্ভব এফিশিয়েন্সি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সাধারণত সোলার প্যানেল সূর্যের আলো সবটুকু কাজে লাগাতে পারে না। কিংবা সরাসরি সূর্যের আলো না পেলে শক্তিও কমে যায়।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য প্যানেলগুলো মুভেবল করে তৈরি করা হয়েছে। যেদিকে আলো থাকবে সেগুলো নিজে নিজে সেদিকে ফিরে যাবে। সোলার প্যানেলের সংখ্যা চারটি, প্রতিটির ক্ষমতা ১৫০ ওয়াট করে মোট ৬০০ ওয়াট।

solar car_techshohor_1

গাড়িটি বর্তমানে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার স্পিডে চলতে পারে। তবে এটি বাড়ানোর কাজ চলছে। গাড়ি স্থির হয়ে থাকার সময় এর ব্যাটারি চার্জ হয়।

গাড়িতে ব্যবহার করা ব্যাটারি ৪৮ ভোল্টের। তবে গাড়ি গতিশীল থাকা অবস্থায় ব্যাটারির উপর নির্ভর করে না, তখন সূর্যের আলোক শক্তিকে সোলার প্যানেল দিয়ে সরাসরি মোটরে পৌঁছে যায়। ৬০০ ওয়াটের এ ডিসি মোটরই ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে। এজন্য একে সাধারণ ইলেকট্রিক গাড়ি না বলে একটি পরিপূর্ণ সোলার গাড়ি বলা যায়।

২০ জনের বড়সড় একটি দল নিয়ে গাড়ি তৈরির কাজে নের্তৃত্ব দিয়েছেন শাহরিয়ার মাহমুদ। তিনি ও তার সহযোগীদের প্রায় সবাই মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। দু’জন আছেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তারুণ্যে ভরপুর এ দলের নাম সান রাশ।

শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষিক নাজিয়া বিনতে মুনির এবং ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক আবু রায়হান মোহাম্মদ সিদ্দিক। মেকানিক্যাল বিভাগের প্রধান কর্নেল মো. লুতফর রহমান দলের পরামর্শক।

গাড়ি তৈরি পেছনের গল্প জানালেন টিমের ভাইস-ক্যাপ্টেন ফরহাদ হোসেন শুভ। তিনি জানান,  আগামী মার্চ মাসে ভারতের পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিত হবে ইলেকট্রিক সোলার ভেহিকল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৪।

এবারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশ নিচ্ছে সান রাশ। শুভ এ দলে যুক্ত থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশে ইভেন্টটির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

জানা যায়, প্রতিযোগিতার শর্ত ছিল মাত্র এক লাখ টাকার (৬০ হাজার রুপি) মধ্যে একটি পরিপূর্ণ গাড়ি তৈরি করা। যেটি সূর্যের আলোতে, অর্থাৎ সোলারে চলবে ও পরিবেশবান্ধব হবে। দুই ধাপ পার হয়ে প্রতিযোগীদের দলগুলোকে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে হবে। এর স্লোগান ‘গ্রিন ইভেন্ট ফর গ্রিন ফিউচার’।

পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিতব্য প্রতিযোগিতার মানদণ্ড বজায় রেখে রেখে সান রাশ সম্পূর্ণ সোলারভিত্তিক বৈদ্যুতিক গাড়ি বানিয়েছে। নির্মাতাদের অভিমত, এ গাড়িকে ইচ্ছা করলে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া যাবে। সুখবর হলো, গত ১৮ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রথম রাউন্ড কোনো বিঘ্ন ছাড়াই পার করেছে সান রাশ। এবার চূড়ান্ত পর্ব, যার জন্য গাড়ি নিয়ে পাঞ্জাব যেতে হবে।

শুধু প্রতিযোগিতা নয়, তার চেয়ে বড় লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছেন গাড়ির নির্মাতারা। তারা জানান, বাংলাদেশের জন্য খুবই উপযোগী একটি গাড়ি হতে পারে এটি।

solar car_techshohor-2

নির্মাতারা জানান, এক আসনের এক গাড়িকে সহজেই চার আসনে পরিণত করা যাবে। এতে যে কোনো ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে এটি। তেল বা গ্যাস নিয়ে, অর্থাৎ জ্বালানি নিয়ে মোটেই চিন্তা করতে হবে না। এমনকি বিদ্যুৎ খরচ করে চার্জও দিতে হবে না। অর্থ যেমন সাশ্রয় হবে, তেমনি পরিবেশের উপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কি রকম সময় লেগেছে বা কি কি প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হয়েছে জানতে চাইলে সান রাশের ডিজাইনার জাবিদ ইশতিয়াক বলেন, বাজার ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় সব জিনিস একত্রিত করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। তারপরও বিভিন্ন পার্টস তারা মনমতো না পাওয়ায় গাড়ির ডিজাইনে সবটুকু পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পারেননি।

ইশতিয়াক আরও বলেন, ‘এ ধরনের কারিগরি কাজে দেরিতে হলেও শুরু হচ্ছে দেশে। কিন্তু তা-ও সীমাবদ্ধতা পিছু ছাড়ছে না। বাইরের দেশে যেখানে অনেক হিসাব-নিকাশ করে আগে গাড়ি ডিজাইন করা হয়, সেখানে আমরা আগে খোঁজ করেছি দেশে কোন কোন পার্টস পাওয়া যেতে পারে। তার ভিত্তিতে ডিজাইন করেছি।’

প্রথম রাউন্ড পার করে নতুন উদ্যমে চূড়ান্ত পর্বের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তবে যেহেতু গাড়ি নিয়ে পাঞ্জাবে যাওয়ার ঝক্কি রয়েছে, তাই খরচের দিকটাও ভাবতে হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে খরচের সিংহভাগ বহন করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে সাহায্য করবে বলে তারা আশা করছেন।

প্রতিযোগিতার ওয়েবসাইট- http://esvc2014.in/index.html

*

*

Top