Maintance

যে কারণে এমবিলিয়ন্থ জয়ী বাংলাদেশি তিন প্রকল্প

প্রকাশঃ ১০:২৯ পূর্বাহ্ন, জুলাই ৩০, ২০১৬ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১:১৫ অপরাহ্ন, জুলাই ৩০, ২০১৬

তুসিন আহমেদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : সম্প্রতি মোবাইল খাতের উদ্ভাবন নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ার্ড ‘এমবিলিয়ন্থ’ জিতেছে বাংলাদেশের তিন প্রকল্প। দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া এমবিলিয়ন্থ অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল মোবাইল উদ্যোগগুলোকে স্বীকৃতি জানানো হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয় এমবিলিয়ন্থ অ্যাওয়ার্ড ২০১৬।

জনবসতি এবং নগরায়ণ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) উদ্যোগের ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি সার্ভিসেস’ প্রকল্প। বিজনেস অ্যান্ড কমার্স বিভাগে দেশে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে গড়ে ওঠা দেশীয় মার্কেটপ্লেস অ্যাপবাজার এবং সরকার ও নাগরিক সম্পৃক্ততা বিভাগে ভ্যাট চেকার অ্যাপ্লিকেশন যা সরকারের কোষাগারে জনগণের দেওয়া ভ্যাট জমা পড়ছে কিনা তা জানার মোবাইল অ্যাপ এই পুরস্কার পেয়েছে।

এই উদ্যোগগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরতেই এই প্রতিবেদন।

অ্যাপ বাজার
স্রোতের বিরপীতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো দেশীয় অ্যাপ্লিকেশন মার্কেটপ্লেস অ্যাপবাজার। সাম্প্রতি উদ্যোগটির ঝুলিতে যুক্ত হয় এমবিলিয়ন্ ২০১৬ পুরস্কার। এম-বিজনেস অ্যান্ড কমার্স বিভাগে প্রথম হয় এই উদ্যোগটি।

স্মার্টফোনকে আরও স্মার্ট করে তোলে অ্যাপ্লিকেশন। অ্যাপ ছাড়া স্মার্টফোন অর্থহীন। এই ক্ষেত্রে অ্যাপ ডাউনলোডের জন্য দেশের মধ্যে নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্ম অ্যাপবাজার। পেপাল বা মাস্টার কার্ডের ঝামেলা ছাড়াই দেশীয় পেমেন্ট পদ্ধতিতে এখান থেকে অ্যাপ কেনা যায়।

গুগলের প্লেস্টোর থেকে পেইড অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করতে গিয়ে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। আবার দেশীয় ডেভেলপারদের তৈরি অ্যাপ প্লেস্টোর বা অ্যাপস্টোরে বিক্রির পর অর্থ উদ্ধার করতে গিয়েও পড়তে হয় বিপাকে। এসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতেই অ্যাপবাজার কাজ করে যাচ্ছে।

appbajar-techshohor

অ্যাপবাজার মূলত প্লেস্টোর বা অ্যাপস্টোরের আদলে তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো ডেভেলপার এতে অ্যাপ্লিকেশন আপলোড করতে পারেন এবং গ্রাহকরা তা ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারছেন। এতে থাকছে নিজস্ব ওয়ালেট, গিফট সিস্টেম এবং বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ।

বর্তমানে অ্যাপ বাজারে ১ হাজার ৪৪৭ অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে এবং তা ৮ হাজারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। দেশীয় এই প্লার্টফর্মে মোট নিবন্ধন ব্যবহারকারী রয়েছে ৯ হাজার ১৮১।

অ্যাপবাজারের প্রধান নিবার্হী শফিউল আলম এ জয়ের বিষয়ে বলেন, আমি আশা করিনি যে আমরা বিজয়ী হবো। কারণ ১৬ প্রতিযোগির সবাই ভাল ছিল। কিন্তু তাঁরা এম-বিজনেস অ্যান্ড কমার্স বিভাগে আমাদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। এ বিজয় বাংলাদেশের জন্য উৎসর্গ করছি।

তিনি আরও বলেন, সাত মাসের একটা প্রকল্প নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় উপস্থাপন করতে পারাটা সত্যি অসাধারণ।

Symphony 2018

ভ্যাট চেকার
প্রতিদিন রেস্টুরেন্টে খেতে কিংবা শপিং মলে নানা কেনাকাটা করতে গেলে দেখা যায় বিল দেয়ার সময় অতিরিক্ত কিছু টাকা ভ্যাট হিসেবে দিতে হচ্ছে। কিন্তু এই ভ্যাটের টাকা কি সরকারের কোষাগারে পৌছায়? নাকি জনগণকে বোকা বানিয়ে অতিরিক্ত এই টাকা চলে যায় প্রতিষ্ঠানটির পকেটে। অনেক প্রতিষ্ঠান ভুয়া মূসক নিবন্ধন নম্বর দেখিয়ে ভ্যাট নিচ্ছে গ্রাহকদের কাছ থেকে। তবে চাইলে হাতে থাকা অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহার করে ভুয়া মূসক নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করা যায়। তেমনি একটি অ্যাপ্লিকেশন হলো ‘ভ্যাট চেকার’। আর এই অ্যাপ্লিকেশনটি চমৎকার এই কাজের জন্য এমবিলিয়ন্থ ২০১৬’তে জিতে নিয়েছে সরকার ও নাগরিক সম্পৃক্ততা বিভাগে প্রথম পুরস্কার।

অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমনির্ভর এই অ্যাপ্লিকেশনটি তৈরি করেছেন ডেভেলপার জোবায়ের হোসাইন এবং তূর্য। পুরস্কার আনতে ভারতে যান জোবায়ের হোসাইন। এই জয় সম্পর্কে তিনি জানান, এমবিলিয়ন্থ প্রযুক্তি বিশ্বের বেশ বড়মাপের একটি পুরস্কার। প্রথমে যখন চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনায়ন পেয়েছি বেশ ভালো লেগেছিলো। কিন্তু আমরা ছিলাম স্টার্টআপ, এই প্রতিযোগিতায় আমাদের সাথে অনেক বড় ধরনের কর্পোরের্ট প্রতিষ্ঠান ছিলো। তবে আশা ছিলো আমরা পুরস্কার পাব। শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটা পেয়ে ভালো লাগাছে। আমাদের আত্নবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।

vatchaker-techshohor

সরকার ও নাগরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কারণে মূলত ভ্যাট চেকারকে পুরস্কার করা দেওয়া হয়। বর্তমানে এই অ্যাপ্লিকেশনটির ৫০ হাজারের অধিক ব্যবহারকারী রয়েছেন। এর বেশি ভাগ তরুণ। রেস্টুরেন্টে খেতে কিংবা শপিং মলে গেলে তারা অ্যাপটি ব্যবহার করে ধরিয়ে দিচ্ছেন মূসক ঠিকভাবে পরিশোধ না করা প্রতিষ্ঠানটিকে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে। এই অ্যাপে শত শত অভিযোগ জমা পড়ছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে চলছে অভিযান। সনাক্ত হচ্ছে মূসক ফাঁকি দেওয়া প্রতিষ্ঠান। ফলে সরকার অতিরিক্ত লোকবল ছাড়াই অপরাধীদের ধরতে পারছেন। অ্যাপটি সরাসরি নাগরিকদের সাথে সরকারের অপরাধী সনাক্তকরণে ভূমিকা রাখছে। এই সকল দিকগুলো বিবেচনা করে এই পুরস্কার দেওয়া হয় বলে জানায় জোবায়ের।

vatchaker-techshohor

অ্যাপ্লিকেশনটির সাহায্যে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য বা সেবা কেনার পর প্রাপ্ত রশিদে দেওয়া বিআইএন বা মূসক নিবন্ধন নম্বরটি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা যায়। অ্যাপ্লিকেশনটি ইনস্টল করে, তারপর অ্যাপটি চালু করে বিআইএন নম্বর দেওয়া স্থানে রশিদে থাকা নম্বরটি দিতে হবে। এরপর ‘চেক’ বাটনে ক্লিক করতে হবে। যদি এই প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সঠিকভাবে করা হয়ে থাকে তাহলে তা প্রদর্শিত হবে।

যদি নিবন্ধন করা না থাকে তাহলে কোনো তথ্য দেখাবে না অ্যাপটিতে। ভুয়া এই সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি অ্যাপটির সাহায্যেই অভিযোগ দেওয়া যাবে। এর জন্য প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নম্বর ও রসিদের ছবি তুলে তা পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। অ্যাপটি প্রদত্ত বিআইএন নাম্বার এর মাধ্যমে সরাসরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করবে। এছাড়া অ্যাপটির মাধ্যমে ভ্যাট সংক্রান্ত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য, বিভিন্ন প্রশ্ন এবং উত্তর, ভ্যাট প্রদানের নিয়ম, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ইত্যাদি সম্পর্কেও জানা যাবে।

বাংলাদেশ ইমারজেন্সি সার্ভিসেস
যেকোনো প্রয়োজন কিংবা বিপদের সময় জরুরী ভিত্তিতে যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। হাতের কাছে যোগাযোগের নম্বর না থাকার ফলে পড়তে হয় নানা বিপদে। ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। ডিজিটালের এই যুগে সমস্যাটি থেকে অ্যাপের মাধ্যমে মুক্তি দিচ্ছে ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি সার্ভিসেস’ নামক অ্যাপ্লিকেশন। জনবসতি এবং নগরায়ণ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) উদ্যোগের এই প্রকল্পটি।

‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি সার্ভিসেস’ একটি অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ, যার মাধ্যমে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সহজে অফলাইন থেকেই তাদের নিকটস্থ পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর হালনাগাদকৃত যোগাযোগ নম্বর ও ঠিকানা পেতে পারবে এবং তাদের মোবাইল ফোন থেকে সরাসরি কল করতে পারবে। এছাড়াও ব্যবহারকারীরা অনলাইন মোডে গিয়ে নিকটস্থ এসকল স্থাপনার ম্যাপ লোকেশন দেখতে পারবে। সারাদেশে বর্তমানে লক্ষাধিক ব্যবহারকারী করেছে অ্যাপটির।

mbilthon-techshohor

এটুআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অ্যাপটির কনটেন্টের মান, জনগনের জীবনে এর প্রভাব, টেকসইকরণের সুযোগ, সহজ ব্যবহার এবং অভিগম্যতা বিষয়গুলো বিবেচনা করে এই পুরস্কার পায় অ্যাপ্লিকেশনটি।

এক নজরে এবারের এমবিলিয়ন্থ অ্যাওয়ার্ড
এবারে অ্যাওয়ার্ডের জন্য ৩ শতাধিক প্রকল্প আবেদন করে। এর মধ্য থেকে দশটি ক্যাটাগরিতে ৬৯টি প্রকল্প চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়। বাংলাদেশ থেকে ছয়টি প্রকল্প চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় যায়, যেখানে থেকে ৩টি প্রকল্প অ্যাওয়ার্ড পায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ১৫টি প্রতিষ্ঠান ও শ্রীলংকা থেকে ৫ টি প্রকল্প পুরস্কার পেয়েছে।

*

*

Related posts/