থ্রিজি এখনো দূরের তারা

টেলিটকের মাধ্যমে ১৪ অক্টোবর থেকে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে থ্রিজি। তবে এখনো অন্য অপারেটররা পায়নি এ সেবা। ঘোষণা দিয়েও কয়েক দফা পিছিয়েছে নিলামের দিন। এ সরকারের আমলে বেসরকারি অপারেটরদের প্রতিযোগিতামূলক থ্রিজি সেবা মিলছে না, এটা এখন ধরেই নেওয়া যায়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন কাজী হাফিজ

তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রিজি) মোবাইল সেবার লাইসেন্স নিলামের সর্বশেষ নির্ধারিত সময় আগামী ২ সেপ্টেম্বর সেটা যদি ঠিকও থাকে তাহলে বাংলাদেশের সব জেলায় এ সেবা পঁেৌছবে ২০১৬ সালের অক্টোবর নাগাদ। আর বিভাগীয় শহরগুলোতে পঁেৌছবে আগামী বছরের জুলাইয়ে। অর্থাত্ এ সরকার আমলে বেসরকারি অপারেটরদের প্রতিযোগিতামূলক থ্রিজি সেবা মিলছে না। আবার সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে অন্যতম বাধা হয়ে আছে দ্রুত থ্রিজি সেবা চালু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা।

 শুধুই পেছাচ্ছে দিন
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রথমে থ্রিজি নিলামের সময় নির্ধারণ করেছিল গত ২৪ জুন। পরে তা নির্ধারণ করা হয় ৩১ জুলাই। সম্প্রতি এ সময়ও পাল্টানো হয়েছে। প্রস্তুতি শেষ না হওয়ায় এবং মোবাইল অপারেটরদের বিভিন্ন দাবি-আপত্তি ও কিছু সমস্যার কারণে সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২ সেপ্টেম্বর। এ সময়ও ঠিক থাকবে কি না তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। গত ৯ জুন ঘোষিত বিটিআরসি পরিবর্তিত সময়সূচি অনুসারে এ নিলামের জন্য আগ্রহী অপারেটরদের আবেদনের শেষ সময় আগামী ১০ জুলাই।

থ্রিজি নিলাম পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কানি্ত বোস বলেন, Èসরকার দ্রুত এ নিলাম অনুষ্ঠানে আগ্রহী। কিন্তু আমরা এখনো পর্যন্ত এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ও দেশি পরামর্শক নিয়োগ করতে পারিনি। এ ছাড়া আগের নির্ধারিত ৩১ জুলাই তারিখটি ছিল রোজার মধ্যে। এ অবস্থায় সময় বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।’

বিটিআরসি সূত্র জানায়, থ্রিজি লাইসেন্সের নীতিমালা অনুসারে এর নিলামের জন্য একটি বিদেশি ও একটি স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে সাড়া মেলেনি। এরপর প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ব্যক্তির আবেদন চাওয়া হয়। তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত ৫ জুন আবারও একজন স্থানীয় পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে ১৯ জুনের মধ্যে আবেদন চাওয়া হয়। এতে চারজনের কাছ থেকে সাড়া মিলেছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে অন্যতম বাধা দ্রুত থ্রিজি সেবা চালু হওয়া নিয়ে এই অনিশ্চয়তা। গত ১৩ জুন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে হয়ে যাওয়া সেমিনার Èডিজিটাল বাংলাদেশ : স্টেকহোল্ডার্স ডিমান্ড’-এ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, থ্রিজি দ্রুত চালু না হলে সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট বা ব্রডব্যান্ড সেবা পঁেৌছানো সম্ভব হবে না।

নীতিমালায় যা বলা হয়েছে
থ্রিজি মোবাইল ফোনসেবার লাইসেন্সের নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে লাইসেন্স প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে অপারেটরদের দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে এ সেবা চালু করতে হবে। নতুন অপারেটরের ক্ষেত্রে এ সময়সীমা হবে সর্বোচ্চ ১৫ মাস। নিলাম অনুষ্ঠানের পরবর্তী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে স্পেকট্রামের ৬০ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে এ লাইসেন্স নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ২ সেপ্টেম্বর নিলাম হলে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য আরো এক মাস সময় পাচ্ছে অপারেটররা। ৯ মাসের বা ১৫ মাসের ওই সময় গণনা শুরু হবে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে।

নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, অপারেটরদের দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের ৩০ শতাংশ জেলায় এ সেবা চালু করতে হবে লাইসেন্স পাওয়ার ১৮ মাসের মধ্যে। নতুন অপারেটরের জন্য এ সময় ২৪ মাস। আর তৃতীয় পর্যায়ে দেশের সব জেলায় ৩৬ মাস বা তিন বছরের মধ্যে এ সেবা চালু করতে হবে।

আগ্রহী মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, লাইসেন্স পাওয়ার পরই তারা থ্রিজির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র-সরঞ্জাম আমদানির অনুমতি পাবেন। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছা থাকলেও লাইসেন্স প্রাপ্তির পরপরই এ সেবা চালু করা সম্ভব হবে না।

অপারেটরদের সমস্যা
গ্রামীণফোন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও টেলিনর এশিয়ার প্রধান সিগভে ব্রেক্কে গত ২ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেন, স্পেকট্রামের জন্য ভ্যাট রিবেটের বিষয়টি স্পষ্ট এবং টুজি ও থ্রিজি লাইসেন্সের কিছু শর্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আমরা থ্রিজি নিলামে যাচ্ছি না। আমরা থ্রিজি নিলামের বিষয়ে আমাদের অবস্থানের কথা সরকারের সংশি্লষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করেই জানিয়েছি।

সিগভে ব্রেক্কে গত ২৮ মে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে জানান, গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে Èএনেক্স-৯’-এ গ্রামীণফোনের মালিকানা বিষয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপন ও সুপারিশ করা হয়েছে তা প্রত্যাহার করা না হলে থ্রিজিসহ অন্যান্য খাতে তাদের বিনিয়োগ ঝঁুকিপূর্ণ হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুনের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য গ্রামীণ ব্যাংক  কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ সমস্যার সমাধান হবে।

গ্রামীণফোন ছাড়াও বাংলালিংকের পক্ষ থেকে এ অপারেটরের প্রধান অংশীদার ভিমপলকমের এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলের বাণিজ্য শাখার প্রধান আহমেদ আবু দোমা গত ১৯ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে আয়েজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, টুজি লাইসেন্সের ভ্যাট-সংক্রান্ত আপত্তিকর ইসু্যর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা থ্রিজিতে বিনিয়োগের ভরসা পাচ্ছেন না।

বিটিআরসি সূত্র জানায়, গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের এই অবস্থান ছাড়াও দেশের অপর দুটি মোবাইল ফোন অপারেটরের শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়াও বিলম্বের অন্যতম কারণ। সম্প্রতি রবি আজিয়াটা লিমিটেড তাদের অংশীদার জাপানের এনটিটি ডোকোমোর ২২ শতাংশ এবং এয়ারটেল তাদের অংশীদার ওয়ারিদের বাকি ৩০ শতাংশ মালিকানা গ্রহণ করেছে। বিষয়টি বিটিআরসিতে আইনসম্মত করার প্রক্রিয়া চলমান।

থ্রিজি নিয়ে আগের ঘোষণা
বাংলাদেশে ২০০৮ সালে এরিকসন থ্রিজি মোবাইল ফোন সেবার পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং ওই বছরের ১০ আগস্ট রাজধানীর একটি হোটেলে এর কার্যকারিতার সফল উদ্বোধন করে। ২০০৮ সালের বিটিআরসি চেয়ারম্যান তত্কালীন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মনজুরুল আলম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০০৯ সালের মার্চ মাসে এ প্রযুক্তি বাংলাদেশে চালু হয়ে যাবে। কিন্তু তার আগেই তিনি বিটিআরসি থেকে বিদায় নেন। এরপর বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থ্রিজি চালুর একাধিক সময়সীমা ঘোষণা করে। গত বছর বিটিআরসি থেকে থ্রিজির খসড়া নীতিমালায় ৩ সেপ্টেম্বর এ নিলামের তারিখ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়। কিন্তু ওই নীতিমালা চূড়ান্ত করতেই প্রস্তাবিত সময় পেরিয়ে যায়।

এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত নীতিমালায় নিলামের তারিখ নির্ধারণ করা হয় আগামী ২৪ জুন। এ নীতিমালা অনুসারে মোট পঁাচটি অপারেটরকে থ্রিজি লাইসেন্স দেওয়া হবে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের জন্য একটি লাইসেন্স বরাদ্দ থাকছে। অপর চারটির মধ্যে দেশের বেসরকারি পঁাচ মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে তিনটি এবং নতুন একটি অপারেটরকে এ লাইসেন্স দেওয়া হবে। গত বছর বিটিআরসির প্রস্তাব ছিল, নতুন অপারেটরকে থ্রিজির সঙ্গে ৩০ শতাংশ টাকা ছাড় দিয়ে টুজি লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তা না হলে নতুন কোনো অপারেটর থ্রিজি নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী হবে না। কিন্তু চূড়ান্ত নীতিমালায় এ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বিটিআরসির সঙ্গে থ্রিজির নিলাম পূর্ব বৈঠকে কোনো নতুন অপারেটর অংশ নেয়নি নতুন কোনো অপারেটর এ নিলামে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

মাঠে একা টেলিটক
এ অবস্থায় দেশে আরো দীর্ঘসময় একমাত্র সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটকের পরীক্ষামূলক থ্রিজি সেবা চালু থাকছে বলে সংশি্লষ্টদের ধারণা। গত ১৪ অক্টোবর টেলিটকের থ্রিজি সেবা চালু হয়।

বর্তমানে প্রায় দুই লাখ গ্রাহক এ সেবা নিচ্ছে বলে টেলিটক কর্মকর্তাদের দাবি। তঁাদের প্রত্যাশা, থ্রিজি নিলাম বিলম্বিত হওয়ার কারণে এ সেবার জন্য অন্য অপারেটরের গ্রাহকরা আর অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত টেলিটকের দিকেই ঝুঁকবে। টেলিটকের জিএম (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) মো. হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠের কাছে নিজের এ আশাবাদের কথা জানান।

*

*

Top