HP Banner
Maintance

মাঝ রাস্তায় নষ্ট গাড়ি সারানোর উদ্যোগ 'যান্ত্রিক'

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮, ০৪:৩০ - আপডেটঃ ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮, ০৫:১৬

Symphony 2018

মাঝ রাস্তায় গাড়ি খারাপ হলে তা সারিয়ে দিতে মোবাইল অ্যাপ নির্ভর উদ্যোগ ‘যান্ত্রিক‘ এর শুরু করেন আল-ফারুক শুভ এবং তার টিম। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে উদ্ভাবনে উদ্যোগী হয়েছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পড়াশোনা করা শুভ। উদ্যোগটির আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

যান্ত্রিক কী?

যান্ত্রিক মূলত মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে ঢাকার ভেতরে কিংবা হাইওয়েগুলোতে গাড়ি কিংবা মোটর সাইকেল মেরামতের সেবা দেবার একটা প্লাটফর্ম।

মনে করুন আপনি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাচ্ছেন, হঠাৎ টাঙ্গাইলে গিয়ে গাড়ি খারাপ হয়ে গেলো। তখন অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজে সাহায্য পাঠানোর জন্য রিকুয়েস্ট পাঠানো যাবে এবং সেখানেই দ্রুততম সময়ে গাড়ি সারানোর টেকনিশিয়ান পৌঁছে দেবে যান্ত্রিক।

ঢাকার ভেতরে যেকোন রাস্তাতেও একই সেবা পাওয়া যাবে গাড়ি কিংবা মোটর সাইকেলের জন্য। এমনকি খুব শিগগিরই চট্টগ্রাম ও সিলেটেও সেবাটি পাওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে তা জেলা শহরে বিস্তৃত করা হবে। এটাকে ‘রোড সাইড হেল্প’ সার্ভিস বলছে যান্ত্রিক।

তবে রোডসাইড হেল্প ছাড়া আরো কিছু হোম সার্ভিস দিচ্ছে যান্ত্রিক।

শুরুর গল্প

২০১৭ সালের মার্চের এক ভর দুপুর। গুলশান থেকে উত্তরায় ফিরছিলেন আল-ফারুক শুভ। গাড়িটা নিজেই চালান তিনি। কিন্তু হঠাৎই গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় রাস্তার মধ্যে। তখনও গুলশান পার হতে পারেননি তিনি। উপায় কিছু ভেবে পাচ্ছিলেন না কি করবেন। ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে ফোন করেন এক পরিচিত টেকনিশিয়ানকে। তিনিও ব্যস্ত থাকায় আসতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন।

তবে অনেক সময় পার হবার পর এক ভদ্রলোক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে সেই যাত্রায় রক্ষা পান শুভ। কিন্তু মাথা থেকে সেই চিন্তা, সেই দৃশ্য কখনোই ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পড়ালেখা করা শুভর কাজ তখন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে। নিজেরই প্রতিষ্ঠান ‘স্মার্ট অ্যাসপেক্টস’ তখন নানা ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করতো বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য। কিন্তু সেই গাড়ি নষ্টের অস্বস্তি যেনো কাটাতেই পারছিলেন না শুভ।

সে কথা মনে হলেই কেমন যেন অসহায় লাগতো। আসলে আমাদের প্রতিনিয়তই এমন অবস্থার সম্মুখীণ হতে হয়, বলছিলেন শুভ। তখন থেকেই কাজ শুরু করেন নিজেদের সেই উদ্যোগ নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে জোরেশোরেই রিসার্চ শুরু করেন শুভ। একটি টিম গড়ে তোলেন। সেই দলটিই উদ্ভাবনী এই ধারণাকে পোক্ত করতে কাজ করেছে।

যেসব সেবা দিচ্ছে যান্ত্রিক

যান্ত্রিক অ্যাপের মাধ্যমে মূলত একাধিক সেবা পাওয়া যাবে। যার অন্যতম রোড সাইড হেল্প বা রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হলে টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে ঠিক করার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়াও অ্যাপটির মাধ্যমে কার ওয়াশ/পলিশ, গাড়ির সার্ভিসিংসহ আনুষঙ্গিক ছোটখাট কাজ ও সমস্যার সমাধান করা, ঘরের ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি মেরামত করা, প্লাম্বিংসহ হোম অ্যাপ্লায়েন্স সার্ভিসিং ও মেরামতের কাজে হোম সার্ভিস পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য এই সেবাগুলো আপাতত ঢাকার ভেতরে সীমাবদ্ধ।

যেভাবে কাজ করে যান্ত্রিক অ্যাপ

অ্যাপটি মোবাইলে ইনস্টল করার পর তা ওপেন করলে কোন ধরনের কাজ বা সমস্যা তা নির্বাচন করার কথা বলবে। এরপর সেখানে ক্লিক করে সাবমিট করলে একটি সার্ভিস অর্ডার তৈরি হয়ে যাবে, এবং যান্ত্রিকের কন্ট্রোল সেন্টারে নোটিফিকেশন চলে যাবে। আর তখন কাস্টমার সাপোর্ট টিম থেকে একটি ফোন কল যাবে গ্রাহকের মোবাইলে। এরপর অর্ডারটি কনফার্ম করা হবে এবং, কাছাকাছি অবস্থানরত দক্ষ একজন টেকনিশিয়ানকে সার্ভিসটি দেবার জন্য নিয়োগ করা হবে।

রোডসাইড হেল্প সার্ভিসের ক্ষেত্রে কন্ট্রোল সেন্টার থেকে গ্রাহকের অবস্থান নিখুঁত ভাবে ম্যাপে দেখা যাবে এবং নিকটবর্তী টেকনিশিয়ানদের অবস্থানও ম্যাপে দেখা যাবে। টেকনিশিয়ান নিয়োগ হবার পর গ্রাহক অ্যাপের ভেতরেই টেকনিশিয়ানের প্রোফাইল ও রিভিউ দেখতে পাবেন।

এরপর টেকনিশিয়ান তার কাজ শুরু করবেন। সর্বশেষ ধাপে গ্রাহক অ্যাপের মাধ্যমে নির্বাচন করবেন তার বিল কোন পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে চান। সে ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ কিংবা ক্যাশে মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা যাবে অ্যাপ কিংবা ওয়েব সাইট থেকে। এগুলো অ্যাপ ছাড়াও ওয়েব সাইট থেকেও করা সম্ভব।

এই প্রক্রিয়া শুধু রোড সাইড হেল্প নয়, বরং বাসা-বাড়ির হোম এপ্লায়েন্স, ইলেক্ট্রিক ও প্লাম্বিং সার্ভিসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

হতে হবে মেম্বার

রোড সাইড হেল্প পেতে হলে মেম্বার হতে হবে। এজন্য আগ্রহীদের মেম্বারশিপ নিতে হবে। অ্যাপ থেকে কিংবা ওয়েবসাইট থেকেই মেম্বারশিপ এর জন্য অর্ডার দেয়া যাবে। ক্রেডিট কার্ড এ অনলাইনে পেমেন্ট করার পর মেম্বারশিপ অটোমেটিক্যালি একটিভ হয়ে যাবে।

মেম্বারশিপ গাড়ির জন্য বছরে দুই হাজার ৯৯৫ টাকা এবং মোটর সাইকেলের জন্য বছরে এক হাজার ৪৯৫ টাকা।

মেম্বার কেন হতে হবে?

শুভ বলেন, সার্ভিসটি অন্যান্য সার্ভিসের মত নয়, যেখানে একজন গ্রাহকের বাসায় টেকনিশিয়ান পাঠাতে হয় এবং টেকনিশিয়ান ও গ্রাহকের সুবিধা অনুযায়ী একটি সময়ে সার্ভিসটি দেয়া হয়। এটি একটি ইমার্জেন্সি সার্ভিস, কারণ, একজন গ্রাহক রাস্তাঘাটের যেখানেই গাড়ি নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন, সেখানেই টেকনিশিয়ানকে পাঠাতে হয়, যখন সমস্যায় পড়েছেন, তখনই পাঠাতে হয়। মেম্বারদের বাইরে এই সার্ভিস দিতে গেলে এই ইমার্জেন্সি সার্ভিসের কোয়ালিটিটা ধরে রাখা সম্ভব হয় না।

শুধু মেম্বারদের এই সার্ভিস দেবার মাধ্যমে এই নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এবং, সার্ভিসের কোয়ালিটিটুকু ধরে রাখা যায়।

শুভ জানান, সার্ভিসটি দেবার জন্য সারা দেশে বিশাল নেটওয়ার্ক করতে হয়েছে, যাতে একটা বড় খরচ প্রয়োজন। তাই মেম্বারশিপ করা থাকলে আমরা সহজেই সেবা দিতে পারবো।

সার্ভিস চার্জ কেমন?

রোড সাইড হেল্প নিতে হলে গ্রাহকের সার্ভিস চার্জ ৪৯৫ টাকা থেকে শুরু হবে, কিন্তু সমস্যার ধরণ অনুযায়ী সার্ভিস চার্জ বেশি হতে পারে। সার্ভিস চার্জ কোন কারণে কাস্টমার অন দ্য স্পট পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে শর্ত সাপেক্ষে যান্ত্রিক সেটি পরিশোধ করবে, যেটি পরবর্তী সময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে নেবে যান্ত্রিক।

যান্ত্রিকের সার্ভিস সারা দেশে

ঢাকা ছাড়াও যান্ত্রিক তাদের সেবা দিচ্ছে দেশের হাইওয়েগুলোতে। এজন্য ইতোমধ্যে সাত শতাধিক মোটর ওয়ার্কশপের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে যান্ত্রিক। যাতে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ওয়ার্কশপ। এসব ওয়ার্কশপে কয়েক হাজার টেকনিশিয়ান রয়েছে যারা তাৎক্ষণিক এই সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছে বলে যান্ত্রিকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আল ফারুক শুভ টেকশহর ডটকমকে জানান।

কাজ করছে দশ জনের টেক টিম

যান্ত্রিকের সেবা সবার দ্বারে পৌঁছে দিতে ব্যাক এন্ডে কাজ করে চলেছেন শুভর নেতৃত্ব দশ জনের একটি দল। যারা সফটওয়্যার, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এবং কাস্টমার সাপোর্টের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান শুভ। এ ছাড়াও মাঠ পর্যায়ে আরেকটি বড় টিম কাজ করে যাচ্ছে মার্কেটিংয়ে। তবে কাজের গতির সঙ্গে দলও বড় হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সবকিছু বাংলায়

গ্রাহকদের সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে যান্ত্রিকের লোগো, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সবকিছু সাজানো হয়েছে বাংলায়। শুভ বলেন, মাতৃভাষাতেই গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বোঝাপড়াটা সবচেয়ে ভালো হয়, কাজেই আমরা ভেবে চিন্তে নিজেদের ভাষাটাই ব্যবহার করেছি। এতে করে গ্রাহকরাও স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন।

সেরা উদ্যোগ হিসেবেই দেখতে চান

দেশে প্রতিদিনই নানা ধরনের উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম হচ্ছে। সেগুলোর অনেকই কখনো বাইরের আলো-হাওয়া পাওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে। সেদিক থেকে যান্ত্রিক অনেকটা ইউনিক উদ্যোগ, আর এটিকে দেশের সেরা উদ্যোগ হিসেবেই দেখতে চান বলে বলেন শুভ। এজন্য তাদের দল কাজও করে যাচ্ছে। তবে পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষ করে পুরোদমে উদ্যোগটি শুরু করতে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রদবদল হচ্ছে নানা দিক।

ওয়েবসাইট ও অ্যাপ

zantrik.com এই ওয়েবসাইটটিতে সেবাগুলো নেওয়া যাবে। এ ছাড়াও গুগল প্লে স্টোর কিংবা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর থেকে Zantrik নামে পাওয়া যাবে অ্যাপটি।

অফিসের ঠিকানা

বাসা-১৮, রোড-১, সেক্টর-৫, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

*

*