প্লেস্টেশন ফোর বনাম এক্সবক্স ওয়ান : নতুন প্রজন্মের লড়াই

শাহরিয়ার হৃদয়, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : দীর্ঘ আট বছর পর আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে কনসোল গেইমিংয়ের বাজার। এ খাতের দুই বিশ্ব প্রতিদ্বন্দ্বী সনি ও মাইক্রোসফট পরপর আনছে পরবর্তী প্রজন্মের গেইমিং কনসোল- প্লেস্টেশন ফোর ও এক্সবক্স ওয়ান।

গেইমাররা তো বটেই, নতুন এ ডিভাইস নিয়ে নড়েচড়ে বসেছেন বাঘা বাঘা প্রযুক্তি সমালোচকরা। তাদের মতে, আট বছর আগে এ দুটির উত্তরসূরীরা যখন বাজারে এসেছিল তারপর বদলে গেছে অনেক প্রেক্ষাপট। তাই শুধু গেইমিং নয়, ভবিষ্যতের বিনোদন পণ্যের বাজারে এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।

play station 4 vs xboxone_techshohor

সনির পিএসফোর বিক্রি শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। বেশিরভাগ রিভিউতে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে এর উন্নত ও চলচ্চিত্রধর্মী গ্রাফিক্স। নতুনভাবে ডিজাইন করা কন্ট্রোলারকে আগের চেয়ে অনেক ‘স্মার্ট’ ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন গেইমাররা। কনসোলটির ব্যবহার পদ্ধতিতে আগের প্লেস্টেশন থ্রির চেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সব মিলিয়ে ভোক্তা-সমালোচকদের প্রত্যাশা অনেকটাই মেটাতে পেরেছে সনি- এমনটা মনে হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে।

কিন্তু যতই প্রত্যাশা মিটুক না কেন, শান্তিতে ঘুমানোর উপায় নেই জাপানি প্রতিষ্ঠান সনির! কারণ আর দু’দিনের মধ্যেই প্লেস্টেশন ফোরের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী এক্সবক্স ওয়ানকে মুক্তি দেবে টেকজায়ান্ট মাইক্রোসফট। এর দাম পিএসফোরের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও বিশেষ বিশেষ ফিচারের দিক দিয়ে সেটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাজারে আসা সনির প্লেস্টেশনের দাম ৫০০ ডলারের কাছাকাছি। অন্যদিকে এক্সবক্স অফিসের দাম ধরা হতে পারে ৪০০ ডলারের মতো।

আবার ওয়ানের সঙ্গে বান্ডেল হিসেবে পাওয়া যাবে মাইক্রোসফটের বিখ্যাত মোশন সেন্সর কাইনেক্ট- যা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে উন্নত ও নিখুঁত। আরও কিছু দারুণ ফিচারের মাধ্যমে এটি স্মার্টটিভি বা টপ বক্সের মতো লিভিংরুমের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠবে বলে আশা করছে মাইক্রোসফট।

Playstation-4_techshohor

এ ছাড়া বর্তমানে প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষে থাকা সনি ও মাইক্রোসফট- উভয়ের জন্যই কনসোল দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সনি যেমন তাদের টেলিভিশনের বিক্রি নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে, মাইক্রোসফটও তেমনি পিছিয়ে পড়েছে স্মার্টফোন আর ট্যাবলেটের যুদ্ধে। তাই গেইমিং বিশ্বে নিজেদের সেরা অবস্থানটা ধরে রাখতে দুই কোম্পানিই এখন মরিয়া।

দুই কনসোলের আগমনকে সামনে রেখে প্রযুক্তি বিশ্বের কয়েক বিশেষজ্ঞের মত প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা। টেকশহরের পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

ব্রায়ান ক্রিসেন্ট (বিখ্যাত গেইম ওয়েবসাইট পলিগনের সম্পাদক)

চলতি মাস থেকে শুরু হচ্ছে নতুন প্রজন্মের গেইমিং। প্লেস্টেশন ফোর বা এক্সবক্স ওয়ান কিনব কিনা, এটা কিন্তু এখন আর গেইমারদের প্রশ্ন নয়! বরং তারা জানতে চান- কোনটা কিনব?

গেইমারদের এ প্রশ্নের জবাব দিতে গত কয়েকবছর মনপ্রাণ দিয়ে খেটেছে সনি ও মাইক্রোসফট। নতুন প্রযুক্তি, শক্তিশালী সিস্টেম, খেলার নতুন পদ্ধতি নিয়ে এসেছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের দুটি কনসোলকে কিন্তু শুধু এসব বৈশিষ্ট্য দিয়ে আলাদা করার সুযোগ নেই; বরং তাদের মাঝে স্পষ্ট কিছু পার্থক্য রয়েছে।

প্লেস্টেশন ফোরকে যেখানে বলা যায় একটি শতভাগ গেইমিং মেশিন, সেখানে এক্সবক্স ওয়ান একটি নতুন ধরনের বিনোদন পণ্য, যা টিভি চ্যানেল দেখা থেকে শুরু করে গেইম খেলা পর্যন্ত সবখানেই কাজে লাগবে।

x box one_techshohor

ড্যানিয়েল কাপলান (স্টকহোমভিত্তিক ডেভেলপার মোজাংয়ের কর্মকর্তা, যারা বিখ্যাত গেইম মাইনক্রাফট তৈরি করেছে)

মাইক্রোসফট ও সনির নতুন প্ল্যাটফর্ম ইন্ডি (স্মার্টফোনে খেলার উপযোগী ছোট গেইম) বান্ধব বলে তারা জানিয়েছে। ব্যাপারটা সত্যিই তাই হলে বেশ ইন্টারেস্টিং।

এমন যদি হয় যে পিএসফোর বা এক্সবক্স ওয়ানের জন্য গেইম তৈরি করতে আলাদা বিশেষ কোনো কনসোল লাগবে, তা ইন্ডি ডেভেলপারদের জন্য আরও হতাশাজনক। এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগ না নেওয়াই ভালো। অবশ্য মাইক্রোসফট জানিয়েছে, এখনই না হলেও তারা এক্সবক্স ওয়ান কনসোলের মাধ্যমেই গেইম তৈরি করার কিট চালু করবে পরবর্তীতে।

আনন্দ শিম্পি (অন্যতম শীর্ষ হার্ডওয়্যার রিভিউ সাইট আনন্দটেকের প্রতিষ্ঠাতা)

প্রথমবারের মতো এক্সবক্স ও প্লেস্টেশনের হার্ডওয়্যার প্রায় একইরকম- তাদের পার্থক্য পারফর্ম্যান্সে, শক্তিতে নয়।

প্লেস্টেশন ফোরের গ্রাফিক্স হর্সপাওয়ার এক্সবক্স ওয়ানের চেয়ে অনেক বেশি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সনির গ্রাফিক্স চিপে যেখানে ১১৫২টি কোর আছে, সেখানে মাইক্রোসফটের আছে ৭৬৮টি। মাইক্রোসফটের কোরগুলোর গতি কিছুটা বেশি হলেও গ্রাফিক্স পারফর্ম্যান্সের দিক দিয়ে অন্তত ৪০% এগিয়ে থাকবে সনি।

প্রশ্ন হলো, এর ফলে কি সব মিলিয়ে গেইমিং অভিজ্ঞতা আগের চেয়ে ভালো হবে কিনা। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে দুই কনসোলে পার্থক্য রয়েছে এবং পিএসফোরই বেশি প্রাধান্য পাবে। তবে এক্সবক্সের শক্তি রয়েছে এক্সবক্স লাইভ, ডেভেলপার বান্ধব পরিবেশ, কাউনেক্ট সেন্সর, স্ট্রিমিংয়ের মতো যুগপোযগী সুবিধাগুলোতে।

তাই বলতে হবে, সনি একটি দ্রুতগতির গেইমিং মেশিন তৈরি করেছে, কিন্তু মাইক্রোসফটের মেশিন বেশিসংখ্যক ক্রেতাকে আকৃষ্ট করবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে। দুই প্ল্যাটফর্মেরই ভিন্ন ভিন্ন উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

game console_techshohor

মার্গারেট রবার্টসন (নিউইয়র্কের গেইম ডেভেলপার হাইডঅ্যান্ডসিকের প্রেসিডেন্ট ও এজ নামে গেইম ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক)

পিএসথ্রি এবং এক্সবক্স ৩৬০ যখন বেরিয়েছিল, তখন কোনো আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড ছিল না। ছিল না ফার্মভিল, জিংগা, টেম্পল রান, প্ল্যান্টস ভার্সেস জোম্বিজ। গেইমিং বিশ্বের পুরোভাগে ছিল মাইক্রোসফট, নিনটেন্ডো ও সনি। এবং খেলার মাধ্যম হিসেবে ছিল টিভি। অনেকের কাছেই খেলার এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য ছিল না, বিশেষ করে নারী ও বয়স্কদের।

টিভিতে গেইম খেলার অভিজ্ঞতাটা একটু আলাদা। সবাই দেখতে পাবে আপনি কি খেলছেন। দীর্ঘ সময় ধরে আরামে খেলতে পারবেন, বড় স্ক্রিন ও শক্তিশালী স্পিকার বড়সড় এক জগতে নিয়ে যাবে আপনাকে।

কিন্তু এখন গেইম খেলার প্যাটার্নে বিরাট এক পরিবর্তন এসেছে। বড় বড় কনসোল যারা তৈরি করত, অ্যাপল তাদের জায়গা দখল করেছে। আমরা এখন ‘প্রাইভেট’ গেইম খেলতে অভ্যস্ত; যা ছোট, সূক্ষ্ম ও হম্বিতম্বি বিহীন, আর্কেড কিংবা পাজ্‌ল ধর্মী। নারী ও বয়স্করাও কিন্তু এসব গেইম খেলে থাকেন! তাই নতুন কনসোলগুলো বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে লড়াইতে নামবে।

মাইকেল ফ্রেঞ্চ (ভিডিও গেইম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সম্পৃক্তদের ম্যাগাজিন এমসিভির প্রকাশক)

নানা ধরনের গেইমিং ডিভাইসে পূর্ণ এখনকার বাজার। তাই নতুন কোনো ডিভাইসের সাফল্যের জন্য অবশ্যই অন্যদের মার্কেট শেয়ার হারাতে হবে। কিন্তু আমি মনে করি, এ প্রতিযোগিতায় সব না হলেও অনেকগুলো ডিভাইস বা প্ল্যাটফর্ম টিকে থাকবে।

কনসোলে বর্তমানে তিনটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে- সনি, নিনটেন্ডো ও মাইক্রোসফট। এক্সবক্স ওয়ান ও পিএসফোরের মূল আকর্ষণ হবে কল অফ ডিউটি বা গ্র্যান্ড থেফট অটোর মতো বড় পরিসরের অ্যাকশনধর্মী গেইমগুলো। বিশেষ করে সম্প্রতি জিটিএ ফাইভের অকল্পনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে এ ধরনের গেইমের এখনও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নতুন কনসোলগুলোর সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের বড় কিছু গেইমও মুক্তি পাবে।

– বিবিসি অবলম্বনে

Related posts

*

*

Top