সফটওয়্যার সেবায় ধ্রুবতারা হতে চায় ধ্রুবক

ভালো একটি চাকরি চাই- বেশিরভাগের এমন ভাবনার মাঝে ব্যতিক্রম দুই তরুণ। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস নিয়ে তাদের নতুন কিছু করার চিন্তা পরিণত হয়েছে এক সফল উদ্যোগে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন।

দেশে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে দক্ষতায় সেরাদের একজন মেহেদী হাসান খান। একই ভাবনার সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন সফটওয়্যারে বিশেষ পারদর্শী আশিক-উজ-জোহাকে। বুয়েটে প্রকৌশল শিক্ষা গ্রহণের সময়ই তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা রূপ নিয়েছে ধ্রুবক ইনফোটেক সার্ভিসেসে

তরুন এ দুই প্রকৌশলী নিজেরাই কিছু করতে চেয়েছিলেন। নিজেদের দেশেই সফটওয়্যারের বিকাশে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস প্লাটফর্মকে। তাদের সেই যৌথ প্রচেষ্টা এখন বাস্তব রূপ পেয়েছে।

Drubak-infotech-techshohor

মোবাইল প্ল্যাটফর্মে উভয়ের আগ্রহ ও দক্ষতার সুবাদে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, গেইমস, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের সেবা প্রদানে বেশ সুনাম করেছে তাদের প্রতিষ্ঠানটি।

বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করা আশিক ও মেহেদী মিলে ২০১৩ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠা করেন ধ্রুবক ইনফোটেক সার্ভিসেস লিমিটেড। চার বছর পর তাদের এ উদ্যোগ ক্রমে বড় হয়েছে। এখন তাদের সঙ্গে কাজ করছেন আরও আট প্রকৌশলী। দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি সহায়তা দিচ্ছেন।

সফটওয়্যার প্রকৌশলী আশিক ধ্রুবকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অপর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মেহেদী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন।

dhurok-all-rounder-techshohor

পিছন ফিরে দেখলে

সব উদ্যোগেরই পেছনে তাকালে সাধারণ হোক আর অসাধারণই হোক, একটা গল্প উঠে আসে। ধ্রুবকের রয়েছে তেমনি একটি গল্প। সাদামাটা হলেও তরুন এ দুই উদ্যোক্তার দৃঢ়তা, নিবিড় পরিশ্রম ও সংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে তাতে।

আশিক বলেন, বুয়েটে পড়ালেখার সময় তিন ও মেহেদী বেশিরভাগ ল্যাব, প্রজেক্ট, থিসিসগুলোতে একই গ্রুপে ছিলেন। সেই সুবাদে বন্ধুত্ব ও কাজকর্মের ব্যাপারে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।

পুরনো দিনের কথা তুলে ধরে তরুন এ উদ্যোক্তা জানান, তারা বিভিন্ন বিষয়, আইডিয়া নিয়ে আলাপ করতেন। পড়ালেখা শেষের দিকে থাকায় ক্যারিয়ারের চিন্তাটা সামনে চলে আসে। দুজনেই তখন নিজেরা কিছু করা যায় কিনা সে বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন। সেই ভাবনা রূপ নেয় পরিকল্পনায়, গড়ে ওঠে ধ্রুবক।

নিজের এ উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার দিনগুলো খুব সহজ ছিল না তাদের। এ সময়ে চোখের সামনে ‘ভালো’ চাকরির হাতছানিও ছিল। সেগুলো গ্রহণ করবেন, নাকি নিজেরা কিছু করে ভবিষ্যতে অন্যদের সেখানে চাকরি দেবেন- সে সিদ্ধান্ত নিতেও তাদের বেগ পেতে হয়েছে।

আশিকের ভাষায়, ‘আমাদের প্যাশন ছিল মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট। ছাত্র অবস্থায় ২০১১ সালে ফ্রিল্যান্স ডেভেলপার হিসেবে মার্কেটপ্লেসে কাজ করা শুরু করি। ২০১২-১৩ সালের দিকে তখন মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট ব্যাপারটায় এখনকার মত ক্রেজ ছিল না। মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টকে কেন্দ্র করে ক্যারিয়ার শুরু করতে চেয়েছি, তাই নিজেরাই কোম্পানি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই।’

বুয়েটে পড়ে ভালো চাকরির পিছনে না ছুটে তখন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে অনেকটাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন এ দুই উদ্যোক্তা। তবে সামাজিক অবমূল্যায়নের ভয়কে থোড়াই কেয়ার করে, নিজেদের পরিকল্পনায় থেকেছেন অটল।

আশিক বলেন, বড় সমর্থনটাই পেয়েছি পরিবার থেকে। ক্যারিয়ারের শুরুতে এ রকম একটা সিদ্ধান্তে পরিবারের সমর্থন অনেক বড় ব্যাপার। ছাত্র অবস্থায় জমানো সামান্য কিছু টাকা নিয়ে স্নাতকের পরই বনশ্রীতে একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে ধ্রুবক ইনফোটেক সার্ভিসেস যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০১৪ সালের শেষের দিকে অফিস মেরুল বাড্ডাতে বাণিজ্যিক ভবনে চলে আসে।

প্রতিষ্ঠানটিতে এখন আটজন কর্মী কাজ করছেন। যাদের বেশিরভাগই কম্পিউটার প্রকৌশলী।

যে ধরনের কাজ করে ধ্রুবক
ধ্রুবক মূলত সপটওয়্যার ডেভলপমেন্ট সেবা প্রদান করে। তাদের প্রতিষ্ঠান গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের আইওএস অপারেটিং সিস্টেমের জন্য মোবাইল অ্যাপ ও আনুষঙ্গিক সিস্টেম ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে বিশেষভাবে পারদর্শী।

এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি পিএইচপি (লারাভেল, কোড-ইগনাইটর) এবং জাভাস্ক্রিপ্ট (নোড জেএস, অ্যাঙ্গুলার জেএস) ফ্রেমওয়ার্কগুলোতে ওয়েবসাইট ও ওয়েবঅ্যাপ বানায়।

dhrubok-techshohor-office

গ্রাহক কারা
ধ্রুবক থেকে সেবা গ্রহণের তালিকায় দেশি-বিদেশি টেক-স্টার্টআপ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোই উল্লেখযোগ্য বলে বলেন আশিক-উজ-জোহা। তিনি বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো স্টার্টআপ হিসেবে শুরু করে ব্যবসায়িক দিকটি ভালো নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা করতে পারলেও, প্রযুক্তিগত দিক থেকে কিছুটা দুর্বল। তাদের সেবা দেওয়া একটা লক্ষ্য ধ্রুবকের।

ধ্রুবক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার ধরন, গ্রাহকের চাহিদা ও সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে যথোপযুক্ত সার্ভার সিস্টেম, রেস্ট(REST) এপিআই, মোবাইল অ্যাপ, ম্যানেজমেন্ট ও অ্যানালাইটিক সিস্টেম নির্মাণে সহায়তা করে ।

প্রতিবন্ধকতা

ধ্রুবক ইনফোটেক সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠার পরে গত চার বছরে অনেক প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়েছে বলে বলেন আশিক।

প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ, যোগ্য ও সঠিক মননের সফটওয়্যার প্রকৌশলী খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ভালো সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। একজন প্রোগ্রামারকে প্রতিনিয়ত নিজের জ্ঞানের পরিধি, ব্যাপ্তি ও গভীরতা বৃদ্ধি করতে হয়; নতুন প্রযুক্তি, ল্যাংগুয়েজ ও প্রক্রিয়ায় নিজের পারদর্শিতা বৃদ্ধি করতে হয়। কিন্তু এমন সুপরিকল্পিত প্রকৌশলীর অভাব বোধ করেছেন তারা।

এ ছাড়াও বড় একটা সমস্যা ছিল পেমেন্ট গেটওয়ে। তাদের বেশিরভাগ গ্রাহক বিদেশি কোম্পানি ও নাগরিক হওয়ায় অধিকাংশ আয় আসে বিদেশ থেকে বিশেষ করে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। সেই অর্থ নিয়ে আসতে পেমেন্ট গেটওয়ে নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পোহাতে হয়েছে অনেক হয়রাণি।

ভবিষৎ পরিকল্পনা
তাদের স্বপ্ন ধ্রুবকে দেশে ও দেশের বাইরে সফটওয়্যার তৈরি ও সেবায় একটি ব্র্যান্ড ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের অনেকটাই কম্পিউটার ভিশন, মেশিন লার্নিং ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কেন্দ্রিক। সেই লক্ষ্যে তারা ধ্রুবকে এসব প্রযুক্তিতে দক্ষ ও পারদর্শী জনবল তৈরিতে কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটি মোবাইলকেন্দ্রিক বুদ্ধিমান সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে দেশি ও আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চায়।

যোগাযোগ
সেঞ্চুরি সেন্টার (ফ্লোর ৮)
খ ২২৫ প্রগতি সরণী
মেরুল বাড্ডা
ঢাকা ১২১২
ওয়েবসাইট: www.dhrubokinfotech.com
ফেইসবুক পেইজ

Related posts

*

*

Top