Maintance

গেইমের মাধ্যমে ইতিহাস পাঠের কারিগর পোর্টব্লিস

প্রকাশঃ ৩:২৬ অপরাহ্ন, নভেম্বর ১৯, ২০১৬ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৩:২৬ অপরাহ্ন, নভেম্বর ১৯, ২০১৬

দেশীয় উদ্যোক্তাদের যে কয়টি মোবাইল গেইম তরুণদের রোমাঞ্চিত করেছে তার মধ্যে অন্যতম ‘হিরোজ অব ৭১’। গেইমের মাধ্যমে ইতিহাস পাঠের এ চেষ্টার অগ্রপথিক পোর্টব্লিস। এ উদ্যোগের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন।

প্রথম গেইমের সফলতার পর তরুন এ উদ্যোক্তার দল মাঠে নামে এর সিক্যুয়াল তৈরিতে। ‘হিরোজ অব ৭১ : রিটেলিয়েশন’ নামের দ্বিতীয় গেইমটিও গেইমাররা বেশ পছন্দ করে। এটি কিশোর ও তরুন গেইমারদের মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ দুটো গেইমের ডাউনলোড সংখ্যা পাঁচ লাখের উপরে। প্রথমটিতে আগ্রহ বেশি দেশি গেইমারদের। দ্বিতীয়টি বিদেশি গেইমার টেনেছে বেশি।

অন্যসব উদ্যোগের চেয়ে পোর্টব্লিসের শুরুর গল্পটা একটু ভিন্ন। একটি গেইমিং প্রতিযোগিতার আয়োজনের সূত্র ধরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের তরুন শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকে গেইম তৈরির পোকা।

portbliss-techshohor

২০১১ সালে মাশা মুস্তাকিম যন্ত্র কৌশল বিভাগে পড়াশোনা করতেন। সে ও তার বন্ধুরা মিলে ওই বছর বুয়েটে একটি গেইমিং প্রতিযোগিতা আয়োজন করেন। সেই প্রতিযোগিতায় অনেকের আগ্রহ দেখে বিদেশি গেইমের বদলে নিজেদের গেইম দিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের স্বপ্ন দেখতে থাকেন।

মেধাবী এ তরুনদের হৃদয় ও মননে নিজেদের কিছু করার যে বীজ সে সময় বোনা হয়ে যায়, তারই সূত্র ধরে জন্ম নেয় পোর্টব্লিস নামের দারুণ এ উদ্যোগের। মাশা প্রতিভাবান আরও কয়েকজনকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে ফেলেন এ অসাধ্য সাধনে।

সেই উৎসাহ থেকেই ২০১৩ এর শুরুর দিকে মাশা ও তার দল ফ্রিল্যান্স মোবাইল গেইম তৈরি শুরু করেন। বলা যায় কিছুটা হাতেখড়ি হয় গেইম নির্মাণের।

বর্তমানে মাশা মুস্তাকিম পোর্টব্লিসের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন। শুরুর গল্প জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে বুয়েটের এক বড় ভাই শাফায়াত লতিফের সহায়তায় আনুষ্ঠানিকভাবে  পোর্টব্লিস যাত্রা করে। দেশের ইতিহাসকে ধরে রাখার মতো বিষয় দিয়ে তারা শুরু করতে চেয়েছিলেন। এ চিন্তা থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনতে ইতিহাসভিত্তিক অ্যাকশন গেইম তৈরির কাজ শুরু করেন তারা।

পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে থাকেন তারা। ২০১৫ সালের মে মাসে কাজ শুরু করেন। থিম, গল্প ও ইতিহাসকে সমন্বয় করে দীর্ঘ পরিকল্পনা শেষে গেইমের বাস্তব রূপ দেওয়ার কাজে তারা হাত দেন অক্টোবরে। এরপর বাকিটা নজরকাড়া সফলতার গল্প।

কাজ করেন দল বেঁধে
তবে পোর্টব্লিস তাদের ‘ফাংশনাল গেইম মেকিং টিম’ ২০১৫ সালের মার্চেই তৈরি করে ফেলে। ফ্রিল্যান্স গেইম তৈরির অর্থ যোগানদাতা অপ্রতিম শুরু থেকেই তাদের সাথে ছিলেন। মাশা জানান, তাদের সঙ্গে আরিফ ও আর্ট ডিপার্টমেন্টে পাপন কাজে যোগ দেন। যোগ দেন জুনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে অভিক ও জাওয়াদ।

এরপর এপ্রিলে যোগ দেন থ্রিডি আর্টিস্ট শাওন। সেপ্টেম্বরে যখন রাকিবুল আলম যোগ দিলেন, তখন তাদের দল আরও গতি পায়। নিজেদের দল গঠন নিয়ে মাশা বলেন, দুই সিনিয়র তাঞ্জিল ও জিসান তাদের সাথে থাকায় দলটি বেশ পূর্ণতা পায়। পুরো গেইমের গল্প লিখেছেন ওমর রশিদ চৌধুরী।

hero of-techoshor

এ ছাড়াও আরও অনেকে সরাসরি দলের সদস্য না হলেও গেইম তৈরির শুরুতে অবদান রেখেছেন বলেও জানান তরুন এ গেইম নির্মাতা। তাদের দলে মোট ১১ জন এখন সক্রিয়।

বর্তমান অবস্থা
পোর্টব্লিসের তৈরি সর্বশেষ গেইম থেকে প্রতি মাসে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বিজ্ঞাপনবাবদ আয় আসছে। নতুন থিম নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ‘হিরোজ অব ৭১’ গেইমটিকে আরও সমৃদ্ধ করার কাজও করছেন তারা। টিমকে আরও গতিশীল করতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কিছুদিন আগেও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে বিনিয়োগকারী খুঁজছিলেন মাশা ও তার দল। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ‘কানেক্টিং স্টার্টআপের’ সেরা দশে স্থান করে নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আর্থিক প্রনোদনাসহ এক বছরের জন্য বিনামূল্যে রাজধানীর জনতা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে জায়গা পায় পোর্টব্লিস। আর্থিক সংকট কেটে যাওয়ায় তারা এখন কাজ করছেন নিজেদের উদ্যোগকে বৈশ্বিক পরসরে নিয়ে যাওয়ার।

heros of 71-techsohor

গেইম নিয়ে কেন এমন উদ্যোগ
অনেক আইডিয়া নিয়েই এখন কাজ করছেন তরুনরা। গেইম নিয়ে তাদের এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে মাশা জানান, গেইম ডেভেলপমেন্টের কাজটি তাদের টিমের সকলের প্রথম ভালোবাসা। তাদের মনোজগতের বড় অংশ জুড়েই রয়েছে কাজটি। অনেক ছোটবেলা থেকেই গেইম নিয়ে কিছু না কিছু ভেবেছেন। তীব্র এ আগ্রহ থেকেই তারা গেইমে ডুবে থাকতে চেয়েছেন।

পোর্টব্লিসের প্রধান নির্বাহী বলেন, যখন পেশা বেছে নেওয়ার সময় আসলো, তখন বুঝলাম এটা থেকে মানুষ জীবিকাও নির্বাহ করতে পারে। এরপর থেকে সকলে মিলে একটু একটু করে এগুতে থাকি।

ছোট বেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের গেইম নিয়ে মেতে থাকতেন মাশা। বাংলাদেশি হিসেবে দেশীয় প্রেক্ষাপটের গেইমের অভাববোধ করতেন প্রায়ই। সেই ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

অনেকেই এখন কাজ করছেন দেশীয় গেইম নিয়ে উল্লেখ করে তরুন এ গেইম নির্মাতা বলেন, তবে এখনও খুব ভালো কিছু কেউ করতে পারেননি। তারা দেশের মানুষকে আরও ভালো কিছু উপহার দিতে চান।

গেইমের বিশ্ববাজার ধরতে পরিকল্পনা
বিশ্বে গেইমের চাহিদা যেমন বাড়ছে, প্রতিযোগীতাও সেই হারে বাড়ছে। প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ডেভেলপার খুব কম সময়ে অসম্ভব রকমের ভালো গেইম তৈরি করছেন।

এ চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পাশাপাশি গেইমের ব্যবসায় ভালো করতে মার্কেটিং খুবই বড় ব্যাপার বলে জানান মাশা। লাখো গেইমের মধ্যে গেইমারদের কাছে নিজেদের গেইম আলাদাভাবে পৌঁছে দেওয়াটা বেশ দূরহ ব্যাপার।

তারা আশা সম্ভাবনাময় গেইম নির্মাতা এ দলটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হবেন।

heros-of-71-techshohor

নতুনদের যা জানা দরকার
নতুন অনেক ডেভেলপার এখন গেইম ডেভেলপড করতে নেমেছেন। তাদের শুরুর আগে জানতে হবে ভালো মানের গেইম বানাতে না পারলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা সম্ভব হবে না।  এ বিষয়ে সফল এ গেইম নির্মাতা বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের কারণে গেইম বানানো একদিক থেকে যেমন অনেক সহজ, তেমনি উন্নত মানের গেইম বানানো ও সেটিকে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা ঠিক ততটাই কঠিন।

মাশা বলেন, তাই গেইম তৈরির ক্ষেত্রে অবশ্যই ডেভেলপারদেরকে বুঝতে হবে এটি অন্য ১০ সফটওয়্যার তৈরির মতো নয়। একটা সিনেমা, নাটক, কার্টুন বানানোর কষ্টের সঙ্গে টেকনিক্যাল কাজের কষ্ট এখানে যুক্ত হয়। অনেক ধৈর্য নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সাথে প্রচুর ও ভিন্ন ধর্মীসব গেইম সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। তার মতে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত শিখে ফেলার আগ্রহ রাখতে হবে। এসবের সমন্বিত ফলস্বরূপ তৈরি হবে দারুণ এ গেইম, যা তাক লাগিয়ে দেবে সবাইকে।

যোগাযোগ
১০২, বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড
হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫।
http://portbliss.org/

*

*