এক ফ্রিল্যান্সারের বিশ্বমানে পৌঁছানোর গল্প জুমশেপার

সফটওয়্যার নিয়ে একটি লেখা যে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিতে পারে তার উদাহরণ জুমশেপার। এক ফ্রিল্যান্সারের উদ্যোক্তায় পরিণত হওয়া ও বিশ্বমানের টেমপ্লেট তৈরির প্রতিষ্ঠানের বেড়ে ওঠার গল্পও এটি। জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ

কুমিল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা স্বউদ্যোগী এক তরুণের নাম কাউছার আহমেদ। দেশের প্রথম জুমলা টেম্পলেট ক্লাব জুমশেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তিনি। প্রথমদিকে জুমলানির্ভর ওয়েব টেমপ্লেট তৈরি করে বিক্রি করতেন। এখনও সে কাজটির পাশাপাশি অন্য সেবাও দিচ্ছেন।

kowshar ahmed-zoomshaper-TechShohorবর্তমানে জুমলার পাশাপাশি ওয়ার্ডপ্রেস নিয়েও কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠানটি। চেষ্টা করছেন জুমশেপারকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ওয়েব টেম্পলেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবে তৈরি ও বড় একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য।

জুমশেপারের টেমপ্লেট বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওয়েবসাইটে ব্যবহার হচ্ছে।

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, সফটওয়্যার কোম্পানি ও নিউজপেপার জুমশেপারের টেমপ্লেট ব্যবহার করছে।

একটা ওয়েবসাইটের কনটেন্টগুলো প্রদর্শন করতে যে টুল ব্যবহার করা হয় তাই টেমপ্লেট।

জুমশেপার বিভিন্ন ধরণের ওয়েবসাইটের জন্য টেমপ্লেট ডেভেলপ করে থাকে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানটি ভালো সুনাম কুড়িয়েছে।

কুমিল্লার প্রত্যন্ত গ্রাম গোবিন্দাপুরে জন্মগ্রহণ করেন কাউছার। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিতে (বর্তমানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ) ভর্তি হন। প্রথম থেকে টিউশনি করতেন। তবে তার জীবন বদলে দেয় সফটওয়্যার বিষয়ক একটি লেখা।

দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝি সময় হঠাৎ একটি জাতীয় দৈনিকের প্রযুক্তি পাতায় সামিউল ইসলাম নামের একজনের বানানো একটা সফটওয়ারের খবর পড়েন। এ খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের মোবাইল বিক্রি করে সাড়ে সাত হাজার টাকায় একটা পুরাতন কম্পিউটার কেনেন।

শুরু হয় তার প্রোগ্রামিং শেখা ও অনুশীলন। প্রথমে নীলক্ষেত থেকে বই কিনে ও সাইবার ক্যাফের ইন্টারনেট থেকে সোর্স কোড ডাউনলোড করে চর্চা করতেন। এভাবে ৬-৭ মাস পরে ছোট একটা ডেক্সটপ সফটওয়্যার তৈরি করেন উইন্ডোজ প্লাটফর্মের জন্য। তার এ খবরটিও ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে ফোন করে তাকে অনেক শুভেচ্ছা জানায়। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক পরিশ্রম করে প্রায় দেড় বছর সময় ধরে একটা মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করেন। তবে সে চেষ্টা খুব বেশি সফল হয়নি।

কিন্তু এতে দমে না গিয়ে আবারও নতুন করে ওই সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু করেন। এবার তার চেষ্টা ছিল আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার তৈরির। বিশ্বমানের কাজ করতে সুন্দর ইন্টারফেস লাগবে, তাই ডিজাইনও শিখে নিলেন। সফটওয়্যার রিলিজ দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইট লাগবে। তাই এইচটিএমএল ও সিএসএস দিয়ে কিভাবে ওয়েবসাইট তৈরি করতে হয় সেটিও শিখলেন।

এরপর উন্মুক্ত করলেন সফটওয়্যারের দ্বিতীয় সংস্করণ। এ কাজে ডুবে থাকার মূল্যও দিতে হলো অন্যভাবে। এর মধ্যে টিউশনি চলে গেল। সকালের কিছু ক্লাস মিস হওয়ায় ফাইনাল পরীক্ষায় অংশও নিতে দিল না কলেজ কর্তৃপক্ষ।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পারভেজ নামের এক বড় ভাইয়ের (বর্তমানে থিম এক্সপার্টের প্রধান নির্বাহী) সহায়তায় ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারেন। Joomlancers.com নামের এক সাইটে বিড করে তিন দিনের মাথায় প্রথম কাজ পেয়ে গেলেন।

Zoomshaper Team-TechShohor

পিএসডি থেকে জুমলা টেম্পলেট কনভার্সনের ৩০ ডলারের একটা ছোট প্রজেক্ট ছিল এটি। ছোট হলেও তা শেষ করতে কাউছারের ৩ দিন সময় লেগে যায়। ৮ রেটিং পান কাজটিতে। এরপর সত্যিকার অর্থেই আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় দেড় বছরের মতো ফ্রিল্যান্সিং করেন

জুমশেপারের যাত্রা
২০১০ এর জুনে নতুন কিছু করার চিন্তা থেকে ‘জুমশেপার’ প্রতিষ্ঠা করেন কাউছার। এটি শুরুর চার দিনের মাথায় প্রথম থিম বিক্রি হয় ২৫ ডলারে। এরপর নিয়মিত থিম বিক্রি হতে থাকে। ২০১১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত একাই কাজ করেন।

ওই মাসে দুই জনকে কাজের সহযোগিতার জন্য নিয়োগ দেন এবং বাসায় কাজ করতে থাকেন। ২০১২ সালের এপ্রিলে মাল্টিপ্লান সেন্টারে ৬ জনকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জুমশেপারের অফিস নেন। সে সময়ের ২ লাখ টাকার বিনিয়োগ থেকে এখন প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বর্তমান পেক্ষাপট
বর্তমানে জুমশেপারে ডিজাইনার ও ডেভেলপারের সংখ্যা ১০ জন। সবাই চেষ্টা করেন আনন্দের মধ্য দিয়ে কাজ করতে। কাজের পাশাপাশি অফিসে পিংপং খেলার ব্যবস্থাও আছে।

প্রতি মাসে একটা করে জুমলা টেমপ্লেট অথবা ওয়ার্ডপ্রেস থিম নিজেদের ওয়েবসাইটে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ওয়েবসাইট থেকে আগ্রহীরা পছন্দমত টেমপ্লেট কিংবা থিম কিনে নেন। টেমপ্লেটগুলোর দাম ৪৯ ডলার থেকে শুরু করে ৬৯৯ ডলার পর্যন্ত।

Zoomshaper website-TechShohor

এ ছাড়া বেশ কিছু বিনামূল্যের টেমপ্লেট রয়েছে। হেলিক্স ফ্রেমওয়ার্ক নামে একটা থিম ফ্রেমওয়ার্ক আছে, যা দিয়ে খুব সহজে জুমলা ও ওয়ার্ডপ্রেস সাইট ডেভেলপ করা যায়। একই সঙ্গে তারা জুমলার বিভিন্ন এক্সটেনশন ডেভেলপ করে দেন।

প্রচারণা
মূলত বিনামূল্যের পণ্য দেওয়ার মাধ্যমে প্রচারণা বাড়ানোর কাজ করে জুমশেপার। প্রতি মাসে বিনামূল্যে কিছু পণ্য ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে সেগুলো জনপ্রিয় সাইটগুলোতে ছাড়া হয়। ওই সাইটগুলো থেকে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা আসে।

এ ছাড়া ই-মেইল মার্কেটিং ও নিউজ লেটার পাঠিয়ে নিজেদের প্রচারণার কথা জানান কাউসার। একই সঙ্গে ফেইসবুক, টুইটার, গুগলপ্লাসে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এবং নিয়মিত ব্লগ পোস্টের প্রচার ও প্রসারের কাজ চলছে।

ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তায় কাজ করছে জুমশেপার
কাউছার মনে করেন, ফ্রিল্যান্সিং এবং ওয়েব ডিজাইন বেকার সমস্যা সমাধানে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে তারা নিজেরাও কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের তরুণরা যাতে ফ্রিল্যান্সিং এবং ওয়েব ডিজাইনিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে সেজন্য সভা, সেমিনারে স্পন্সর করে প্রতিষ্ঠানটি। নিজেরাও বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে।

বিশ্বের সেরা টেমপ্লেট কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
কোম্পানির বর্তমান অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট কাউছার। তবে আগামীতে জুমশেপারকে বিশ্বের সেরা টেমপ্লেট কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। পাশাপাশি চান অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে।

নতুনদের জন্য পরামর্শ
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তা হতে বেশি মূলধনের প্রয়োজন নেই। যারা ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের জন্য পরিশ্রমী ও ধৈর্য্যশীল হওয়ার পরামর্শ কাউসারের।

তার মতে, বাধা আসলেও থেমে গেলে চলবে না। যেহেতু আয়ের কোনো সংক্ষিপ্ত উপায় নেই, তাই যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের আগে তা ভালোভাবে জানার চেষ্টা করতে হবে।

যোগাযোগ
জুমশেপার
৬/১৪, ব্লক-এ, লালমাটিয়া, ঢাকা।
ইমেইলঃ coffe@joomshaper.com
ওয়েবসাইট : http://www.joomshaper.com

Related posts

*

*

Top